বাংলাদেশের পর্যটন শহর কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে হঠাৎ দেখা দিয়েছে আগ্রাসী ভাঙন। ফলে পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই সমুদ্র সৈকতটি প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে তার চিরচেনা রূপ। সমুদ্রের অস্বাভাবিক ঢেউয়ে ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে লাবণী, সুগন্ধা ও বালিয়াড়ি সৈকত। ভাঙনের মুখে রয়েছে সৈকতের ছাতা ও ঝিনুক মার্কেট।
আকস্মিক তীব্র এই ভাঙনে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পর্যটন এলাকার সরকারি-বেসরকারি বহু স্থাপনা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও প্রাকৃতিক জৈব প্রতিরোধব্যবস্থা ধ্বংস করে অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণেই দিন দিন ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
সম্প্রতি লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারের ঢেউয়ের তোড়ে সাগরে হারিয়ে গেছে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টের বিস্তীর্ণ ঝাউবন। তলিয়ে গেছে শহরের কলাতলী ও শুকনাছড়ি তীরের অন্তত ১৫টি বসতবাড়ি। এখনও ভাঙনের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে শহর ও শহরের বাইরে অবস্থিত সরকারি-বেসরকারি বহু স্থাপনা। এ ছাড়া নাজিরারটেক থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত আরও ১ কিলোমিটার সৈকত সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সৈকতে বালুভর্তি জিও টিউব বসিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার জানান, ভাঙনের স্থায়ী প্রতিরোধে ৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের দরিয়ানগর পয়েন্ট সৈকত থেকে নাজিরারটেক-এয়ারপোর্ট হয়ে নুনিয়াছড়া পর্যন্ত ১২ কিমি দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
পরিবেশবিজ্ঞানী ড. আনসারুল করিম জানান, বাঁধ নির্মাণের ৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের সৈকতে জিও ব্যাগ স্থাপন করে ভাঙন ঠেকানোর প্রচেষ্টা একটি নিষ্ফল ও অপচয়মূলক কাজ। প্রয়োজনে বাঁধের টাকা থেকে স্থাপনা নির্মাণকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়া হলে সৈকত আবার পুনর্গঠিত হবে, যেটা কলাতলী সাবমেরিন কেবল পয়েন্টে দেখা গেছে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ও সমুদ্রবিজ্ঞানী বেলাল হায়দার পারভেজ জানান, যেখানে ঝাউগাছ কিংবা ইট-কংক্রিটের পাকা স্থাপনা রয়েছে, সৈকতের সেখানেই কেবল ভেঙেছে। আর যে সৈকতে সাগরলতা ও কেয়া-নিশ্চিন্দার বন রয়েছে, সেখানে মোটেই ভাঙেনি। বরং জলোচ্ছ্বাসে বালু ও আবর্জনা জমা হয়ে সাগরলতার বালিয়াড়িগুলো আরও উঁচু হয়েছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ওই উদ্ভিদগুলোর ভূমিকা সুস্পষ্ট করে দেয়।
এ ছাড়া সৈকতের মাটির ক্ষয়রোধের জন্য ইকো-সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার শামুক-ঝিনুকের প্রজননও নির্বিঘ্ন করতে হবে। শামুক-ঝিনুক সৈকতে পানির নিচে এমন কাঠামো তৈরি করতে পারে, যে কাঠামো বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ও ভাঙতে পারে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, ‘পরিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকায় সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও তিন বছর আগে দেওয়া উচ্চ আদালতের রায় এখনও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’
বিশ্বের দীর্ঘ সৈকতের শহর কক্সবাজার শুধু চিত্তবিনোদনের প্রাণকেন্দ্র নয়, বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর স্থানও। কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়াতে রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। অথচ সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভরা সৈকত হুমকির মুখে। দেশের জাতীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কক্সবাজার সৈকত রক্ষার দাবি সবার। সমুদ্র সৈকত ঘিরে নানা কার্যক্রমে হাজারো কর্মসংস্থান হয়েছে।
সমুদ্র সৈকত ধ্বংস হলে দেশের পর্যটন শিল্প ধ্বংসের পাশাপাশি এসব কর্মজীবীর জীবনেও বিপর্যয় নেমে আসবে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ভাঙনরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। সমুদ্র সৈকত রক্ষায় পরিবেশবিজ্ঞানী, সমুদ্রবিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের সমন্বিতভাবে শক্তিশালী ও টেকসই উপায় বের করতে হবে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত রক্ষায় সমুদ্রের স্রোত ও ঢেউয়ের প্রকৃতি ও ভূ-গঠনকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে জৈব-প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। সে মোতাবেক কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। সমুদ্রের ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প মোটেই ফলপ্রসূ হবে না। শুধু অর্থের অপচয় হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কক্সবাজার সমুদ সৈকতকে প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সৈকত সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পর্যটকদের বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে। তা না হলে আগামীতে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
/জেডও