ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়

রফিক রাফি

জাতীয়

জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় দেশের অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎহীন ছিল ৪ থেকে ৮ ঘণ্টার অধিক সময়। এ সময় রাজধানী

2022-10-05T10:19:04+00:00
2022-10-05T10:19:04+00:00
 
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
জাতীয়
ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়
রফিক রাফি
প্রকাশ: বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০২২, ১০:১৯ এএম   (ভিজিট : ২৯৩)
জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় দেশের অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎহীন ছিল ৪ থেকে ৮ ঘণ্টার অধিক সময়। এ সময় রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ বেশ কিছু এলাকা ব্ল্যাকআউট হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। অফিস, আদালত, বিমানবন্দর, হাসপাতাল, কল-কারখানা, রেলের টিকেট ক্রয়, বস্ত্র খাতের উৎপাদন ও সেবায় বিঘ্ন ঘটে।

প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন দেশের বেশিরভাগ জেলা
পাম্পে তেল কেনার হিড়িক
২০১৪ সালেও ঘটেছিল গ্রিড বিপর্যয়
২০১৭ সালের ২ মে ৩২ জেলা বিদ্যুৎহীন ছিল
এক বছরে একাধিক গ্রিড বিপর্যয় অস্বাভাবিক : বিশেষজ্ঞ

বিকল্প উপায়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি তেল কিনতে পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন মানুষ। দোকানগুলোতে মোমবাতি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। অনেকে দোকানে গিয়ে মোমবাতি না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসেন। বিদ্যুৎ না থাকায় চরম পানি সঙ্কট দেখা দেয়। অনেক এলাকায় গ্যাসের সঙ্কটও দেখা দেয়। কী কারণে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় দেখা দেয়, তা জানাতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়।

মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৫ মিনিটে জাতীয় গ্রিডের ইস্টার্ন গ্রিড ফেল করায় এ ব্ল্যাকআউট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাত সাড়ে ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, মঙ্গলবার বিকাল ৫টার পর থেকে কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। 

পর্যায়ক্রমে সব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এর আগে মঙ্গলবার রাত ১২টার মধ্যে সব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানান পিডিবির পরিচালক (জনসংযোগ) শামীম হাসান।

পাওয়ার গ্রিডের এক কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রিড বিপর্যয় হলে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তার প্রতিটি ম্যানুয়ালি চালু করতে হয়। এ জন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এটি আবার বেশ কষ্টসাধ্য এ কারণে যে, বন্ধ কেন্দ্র চালু করতেও বিদ্যুৎ লাগে। সে জন্য চালু করতে বিদ্যুৎ লাগে না, এমন কেন্দ্র আগে উৎপাদনে নিয়ে আসতে হয় বা দেশে চালু আছে এমন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে অন্য কেন্দ্র চালু করতে হয়। এভাবে প্রতিটি কেন্দ্রই আলাদা আলাদা চালু করার পর তার আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করতে হয়। ম্যানুয়ালি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করার যে প্রক্রিয়া তাতে নরসিংদীর ঘোড়াশাল ও গাজীপুরের টঙ্গীর কেন্দ্র বিকালের মধ্যেই উৎপাদনে এসেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের উপ-প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মীর আসলাম উদ্দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জানানÑটাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর (আংশিক), ঢাকা (আংশিক), চট্টগ্রাম (প্রায় রিকভার), সিলেট (আংশিক) নারায়ণগঞ্জ (আংশিক) এলাকায় বিদ্যুৎ এসেছে। তিনি জানান, ঢাকায় লোড বেশি লাগবে। তাই ঢাকায় ধীরে বিদ্যুৎ আসবে। সিস্টেমের স্ট্যাবিলিটি মোটামুটি সন্তোষজনক না হলে ঢাকায় হেভি লোডে রিস্টোর ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাওসার আমির আলী বলেন, ‘বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর এয়ারপোর্ট ও উত্তরা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। টঙ্গীতে আংশিক, মিরপুর ডিওএইচএস, গুলশানের আংশিক, বসুন্ধরা ও ডিপলোম্যাটিক জোনে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা হয়েছে।’

অন্যদিকে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান জানানÑশ্যামপুর, ধানমন্ডি, সিদ্ধিরগঞ্জ, কল্যাণপুর, মানিকনগরে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হয়েছে। অন্যান্য এলাকায় দ্রুত চালু হবে বলে আশা করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানা কারণে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় হতে পারে। বছরে একবার হলে ঠিক আছে; কিন্তু বেশি হলে বুঝতে হবে কোনো ত্রুটি আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিদ্যুৎব্যবস্থায় গ্রিড একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অঙ্গ। গ্রিড বন্ধ হয়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটার অনেক কারণ আছে। মঙ্গলবার জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪ সালে জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় তা ঠেকাতে উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তাই এমন বিপর্যয় হওয়ার কথা না। তদন্তে প্রকৃত কারণ উঠে আসবে।’

জানতে চাইলে পাওয়ার সেল বিভাগের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) কেন এ ঘটনা ঘটেছে সেটি এখনও আমরা জানতে পারিনি। তদন্ত করার আগে এটি বলা সম্ভব নয়। তবে ফ্রিকোয়েন্সিতে গরমিল হলেই এটি হতে পারে। ফ্রিকোয়েন্সিতে গরমিল নানা কারণে হয়। কোথাও সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে বা হুট করে কোথাও থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এমন হতে পারে। গ্রিডলাইনের কোনো একটি অংশ কোথাও বিকল হয়ে গেলেও এটি হতে পারে।’

এর আগেও হয়েছে জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়
বিদ্যুৎসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিড বন্ধ (ট্রিপ) হয়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় একেবারে বিরল নয়। ১৯৯০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অসংখ্যবার নানা মাত্রায় ঘটনাটি ঘটেছে। ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর সারা দেশে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছিল। যে মাত্রায় বিপর্যয় হয় তা অতীতের সব জানা রেকর্ড ভঙ্গ করে দেয়। তখন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে একাধিক রিপোর্টে বলা হয়, ভেড়ামারায় জাতীয় গ্রিডে বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে সংযোগস্থলে ওই ত্রুটি থেকেই বিভ্রাটের শুরু। প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লাগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে। 

২০১৭ সালের ৩ মে আকস্মিক গ্রিড বিপর্যয়ে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমের ৩২টি জেলা কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল। চলতি বছরের ৬ সেপ্টেম্বরেও জাতীয় গ্রিডের আরেকটি সঞ্চালন লাইনের বিভ্রাটে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল বিভাগসহ দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ৪০ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, ‘জাতীয় গ্রিড ট্রিপ করার কারণে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলের বড় একটি এলাকায় আজ (মঙ্গলবার) দুপুর ২টা ৪ মিনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। দেশের অর্ধেক এলাকায় বিদ্যুৎহীন দশা শুরুর চার ঘণ্টা পর টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, মানিকগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল হয়। এ জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।’

বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে বঙ্গভবনের বিদ্যুৎ লাইনের সঙ্গে যুক্ত মানিকনগর সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ পুনরায় চালু করা গেছে বলে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তরফে জানানো হয়।

পিজিসিবির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা এবিএম বদরুদ্দোজা সুমন মঙ্গলবার রাত ৯টায় সময়ের আলোকে জানান, গ্রিডে যে ত্রুটি হয়েছিল তা সমাধান করা হয়েছে। গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম জোনের প্রায় পুরোটা ও সিলেট জোনের পুরোটায় বিদ্যুৎ চলে এসেছে। কুমিল্লা জোন ও ঢাকা জোনের কিছু অংশ বাকি আছে।

তদন্ত কমিটি গঠন
জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। এর মধ্যে একটি কমিটি গঠন করবে বিদ্যুৎ বিভাগ। অন্যটি করা হবে তৃতীয় পক্ষ থেকে। দুটি কমিটি বিভ্রাটের কারণ খুঁজে বের করবে। এ ছাড়া জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে পিজিসিবি।

/জেডও


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: