হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা আজ আর কারও অজানা নয়। সারা বিশ্বকে জিম্মি করে রেখেছিল যে করোনাভাইরাস, তার থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ারও সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায় ছিল সঠিক নিয়ম মেনে হাত ধোয়া। কোনো প্রকার প্রতিষেধক আবিষ্কার হওয়ার আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার করে জানিয়েছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার উপায় এবং প্রয়োজনীয়তা। মহামারির ওই দুঃসময়ে তাই হাত ধোয়ার গুরুত্ব পেয়েছিল এক ভিন্ন মাত্রা। শুধু করোনাভাইরাস নয়, হাতে লেগে থাকা রোগজীবাণু ভালোভাবে না ধুয়ে ফেললে তা চোখ, মুখ অথবা নাকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ঘটাতে পারে কলেরা, ডায়রিয়াসহ পাকস্থলী অথবা শ্বাসতন্ত্রের নানা ধরনের রোগ।
মানবজাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর মধ্যে হাত ধোয়া একটি। ২০০ বছর আগেও মানুষ জানত না যে শরীরের সবচেয়ে সক্রিয় অঙ্গ এই হাতের মাধ্যমে ছড়াতে পারে রোগজীবাণু এবং তা হতে পারে মানুষের মৃত্যুর কারণ। সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো এই অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যিনি আমাদের জানান, তাকে এই তথ্য জানানোর অপরাধে হারাতে হয়েছিল চিকিৎসকের চাকরি। সেই মহান মনীষীর নাম ইগনাজ ফিলিপ সেমেলওয়েজ। ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালের হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক ডাক্তার ইগনাজ সেমেলওয়েজকে তাই হাত ধোয়ার জনক বলা হয়। সালটা ১৯৪৬। ইউরোপ-আমেরিকার হাসপাতালে সন্তান জন্মদানকারী মায়েরা আক্রান্ত হচ্ছেন চাইল্ডবেড ফেভারে। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মা সন্তান জন্মের পরপরই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছেন। ভিয়েনার এমনই একটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে চাকরি করতেন ডাক্তার ইগনাজ সেমেলওয়েজ। সব রকম সতর্কতা অবলম্বন করেও যখন কমানো যাচ্ছিল না মাতৃমৃত্যুর হার, ডাক্তার তখন ভিন্ন রাস্তায় হাঁটলেন।
তিনি লক্ষ করলেন মেডিকেল ছাত্রদের উপস্থিতি যেসব প্রসব ঘরে বেশি, সেখানে মাতৃমৃত্যুর হার ধাত্রীদের উপস্থিতিতে প্রসব করানোর ঘরের তুলনায় তিনগুণ বেশি। এর কারণ হলো মেডিকেল ছাত্ররা লাশকাটা ঘর থেকে যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন না হয়েই প্রসব ঘরে হাজির হতেন। ধারণা করা হলো এরাই হয়তো কোনো জীবাণু বহন করে নিয়ে আসে, যা সন্তান জন্মদানের সময় প্রসূতির শরীরে প্রবেশ করে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তার সেমেলওয়েজ ডাক্তারদের বললেন, ক্লোরিনযুক্ত পানিতে হাত ধুয়ে তারপর গর্ভবতী নারীদের কাছে যেতে। ফলাফলও পাওয়া গেল হাতেনাতে। এই পদক্ষেপ নেওয়ার পর মৃত্যুহার নেমে এলো ১ শতাংশে। এমন যুগান্তকারী আবিষ্কারে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচলেও, ডাক্তাররা ভীষণ অপমানিত বোধ করতে লাগলেন। রোগীর মৃত্যুর জন্য তারা দায়ী, এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না তারা। ফলস্বরূপ ডাক্তার সেমেলওয়েজকে হারাতে হলো হাসপাতালের চাকরি, আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হলো বুদাপেস্টে। সেখানেই মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানী।
১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব আবিষ্কার হওয়ার পরপরই মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু অনেক বেড়ে যায়। ২০০৬ সালের এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, নিয়মিত হাত ধোয়ার ফলে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনাও ৬ থেকে ৪৪ শতাংশ কমে যেতে পারে। আজ ১৫ অক্টোবর। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বব্যাপী ‘গ্লোবাল হ্যান্ড ওয়াশিং ডে’ পালন করা হয়। হাত ধোয়াকে জীবনযাপনের অংশ করে নেওয়া অর্থাৎ অভ্যস্ত করানোর লক্ষ্যে পালন হয়ে আসছে দিবসটি। হাত ধোয়ার সুফল সম্পর্কে মানুষকে জানানো এ দিবস পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০০৮ সালের ১৫ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোমে প্রথমবারের মতো এই দিনটি পালন করা হয়। পরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তারিখটি প্রতি বছর পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০০৮ সাল ছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থার আন্তর্জাতিক বর্ষ। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের মূল লক্ষ্য হলো সমাজে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার একটি সাধারণ সংস্কৃতির সমর্থন ও প্রচলন করা, প্রতিটি দেশে হাত ধোয়ার বিষয়ে নজর দেওয়া, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
এবারের হাত ধোয়া দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ইউনাইট ফর ইউনিভার্সাল হ্যান্ড হাইজিন’ অর্থাৎ ‘সারা বিশ্বে হাত পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য একতাবদ্ধ হও’। করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে এই দিবসটির উদযাপন পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি মানুষ হাত ধোয়া দিবস পালন করে। ২০১৪ সালে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসে ভারতের মধ্যপ্রদেশে ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৪২৫ শিশু একসঙ্গে হাত ধুয়ে একটা বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এর স্বীকৃতি দেয়।
বিশ্বে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া। ইউনিসেফ জানাচ্ছে, বছরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় আট লাখ আট হাজার ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চার লাখ ৪০ হাজারের বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু মারা যাচ্ছে। তবে পারিবারিক সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও শিশুদের হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ার মাধ্যমে ডায়রিয়া সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ এবং নিউমোনিয়া সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। জরিপে জানা যায় বাংলাদেশের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষের হাত ধোয়ার প্রকৃত নিয়ম জানা নেই। এ দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ শুধু পানি দিয়েই হাত ধুতে অভ্যস্ত। অথচ জীবাণুনাশক দিয়ে হাত পরিষ্কার রাখাই বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে বাঁচার কার্যকর উপায়। যে সময়গুলোতে আমরা জীবাণুর সংস্পর্শে আসি এবং হাতের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে, তখনই ঘন ঘন হাত ধুতে হয়। খাবার তৈরির আগে ও পরে, টয়লেট ব্যবহারের আগে ও পরে, অসুস্থ রোগীকে সেবা করার আগে ও পরে, প্রতিবার নাক ঝাড়া, কাশি বা হাঁচি দেওয়ার পরে, পোষা প্রাণী স্পর্শ করার পরে, শিশুর ডায়াপার পরিষ্কার করার পরে হাত ধুতে হবে। শুধু এই সময়গুলোতে নয়, কোনো রকম জীবাণুর সংস্পর্শে আসার সুযোগ তৈরি হলেই জীবাণুনাশক দিয়ে বারবার হাত ধুয়ে হাতকে জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, জীবাণু ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করার জন্য কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া বা হাত পরিষ্কার করার জন্য কমপক্ষে ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত একটি হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়াও সঠিক উপায়ে হাত ধোয়ার জন্য পাঁচটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে- পরিষ্কার পানি দ্বারা হাত ভেজাতে হবে এবং হাতে সাবান লাগাতে হবে, সাবান দিয়ে ঘষে হাতে ফেনা তৈরি করতে হবে। হাতের পেছন দিক, আঙুল এবং নখের মাঝেও পরিষ্কার করতে হবে। অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য হাত সাবানের ফেনা দিয়ে ঘষতে হবে। পরিষ্কার প্রবহমান পানি দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। তারপর একটি পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে হাত মুছে নিতে হবে। শুধু পানি দিয়ে হাত ধোয়া সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায় নয়। এ ক্ষেত্রে যেকোনো জীবাণুনাশকের প্রয়োজন। অধিকাংশ পরিস্থিতিতে জীবাণু থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া। ক্ষারযুক্ত সাবান বা তরল সাবান উভয়ই এ ক্ষেত্রে কার্যকর। সাবান ও পানি পাওয়া না গেলে একটি অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল থাকে। বাংলাদেশের জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৪ অনুসারে, বাংলাদেশের মাত্র ২৮ শতাংশ পরিবার হাত ধোয়ার জন্য জীবাণুনাশক ব্যবহার করে।
নিয়মিত হাত ধোয়ার ফলে বছরে ১০ লাখ মানুষের ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু প্রতিহত করা যেতে পারে। ১৬ শতাংশ মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগের ঝুঁকি কমতে পারে। মাত্র ২০ সেকেন্ডের একটি সহজ কাজের মাধ্যমে যদি এত মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়, তবে এই কাজটি সম্পর্কে সর্বোচ্চ প্রচার হওয়া উচিত। আপাতদৃষ্টিতে করোনা মহামারি থেকে মুক্তি পেলেও এই ঘন ঘন হাত ধোয়ার অভ্যাস যেন আমাদের হারিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসে পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করার বার্তা ছড়িয়ে যাক সবার মাঝে।
লেখক ও উদ্যোক্তা