রাজনীতিতে বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষমতা

শেখ আনোয়ার

সম্পাদকীয়

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আসলে সেসব কোম্পানি, যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যবসা চালায়। বিদেশি কোম্পানির সহযোগিতায় কোনো

2022-10-21T10:52:08+00:00
2022-10-21T10:52:08+00:00
 
  শনিবার, ৬ জুন ২০২৬,
২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
রাজনীতিতে বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষমতা
শেখ আনোয়ার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০২২, ১০:৫২ এএম   (ভিজিট : ২৩৩১)
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আসলে সেসব কোম্পানি, যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যবসা চালায়। বিদেশি কোম্পানির সহযোগিতায় কোনো দেশীয় কোম্পানি কার্যক্রম যৌথভাবে পরিচলনা করলেও তাকে বহুজাতিক কোম্পানি বলা হয়। এসব কোম্পানি যে দেশে ব্যবসা করে সে দেশের কাঁচামাল ব্যবহার করে। 

গবেষকরা বলছেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ধনী-দরিদ্র রাষ্ট্রের মানুষের জীবনে কমবেশি প্রভাব ফেলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বায়নের প্রভাবে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচলন হয়। এক কথায় পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার দিকে ধাবিত হতে থাকে। এদের মাধ্যমে পুঁজিপ্রবাহ বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী অবাধ পুঁজিপ্রবাহের ফলে এবং পুঁজিপ্রবাহের মাধ্যমে পৃথিবীতে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের বিকাশ সম্ভব হয়েছে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাব কমে যাচ্ছে এবং ক্রমাগত চাপে পড়ে যাচ্ছে। 

গবেষকরা স্বীকার করেন, বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে। বেশি সমস্যা করছে বহুজাতিক কোম্পানি।  তবে গবেষণায় দেখা যায়, বাস্তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর লড়াইটা মূলত অসম। যেখানে একটি উন্নয়নশীল দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে বহুজাতিক কোম্পানি, যার লাভ যাচ্ছে মূলত উন্নত বিশ্বে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের অর্থনৈতিক ভিত এতটাই বেশি শক্তিশালী করেছে যে, তারা দেশীয় শক্তিগুলোকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছে। 

বিশ্বায়নের ফলে মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দেশের বাজারে ভিনদেশি পণ্যবাজারের প্রচলনের মাধ্যমে তারা বাণ্যিজ্যকে সফলভাবে পরিচালনা করে চলেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। বহুজাতিক পণ্যের মাত্রাতিরিক্ত বিকাশের ফলে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই শিল্পের বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশি শিল্প আজ হুমকির সম্মুখীন। অন্যদিকে বহুজাতিক পণ্যের ব্যবসা-বাজার রমরমা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণই কেবল বহুজাতিক কোম্পানির কাজ নয়। বর্তমানে বহুজাতিক রাজনৈতিক খবরদারি করার মধ্য দিয়ে তারা তাদের ব্যবসায়িক ভিত্তি আরও সুসংহত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত। এ প্রচেষ্টাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে বহুজাতিক কোম্পনিগুলো যুদ্ধের উসকানি দেওয়া, গুপ্তচর বৃত্তিতে জড়ায়, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এমনকি দেশে-দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্তেও লিপ্ত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, এসব কাজে তারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। যেমন হন্ডুরাসের মতো ছোট্ট একটা দেশে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির মতো বড় একটি কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না তা কী করে হয়? 

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অতি বৃহৎ টেলিযোগাযোগ কোম্পানির অন্যতম আমেরিকান টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাম কোম্পানি প্রতিবেশী ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নিউইয়র্ক শাখাকে কোম্পানির নিট মুনাফার প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ করত বলে খবরে প্রকাশ, যা পরে ভারতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়। বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে আর অর্থ সাহায্য দেবে না বলে ওই বহুজাতিক কোম্পানি সাফ জানিয়ে দেয়। বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের একটি প্রদেশে বিষাক্ত পদার্থযুক্ত নুডলস খেয়ে মানুষ মারা যাওয়া, শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে ২০১৫ সালের দিকে। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি ম্যাকডোনাল্ডের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের সংবাদ পাওয়া যায়নি। অতএব বলা যায় ভারতের মতো বৃহৎ পরাশক্তিও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে। 

এ কথা কে না জানেন, এডলফ হিটলারকে আর্থিক সহায়তা দেয় জেনারেল মোটর্স। ইরাকে সাদ্দামবিরোধী যুদ্ধের পেছনে সমরাস্ত্র ব্যবসায়ী এবং খনিজ তেলের ব্যবসায়ীদের ভূমিকা এখন পানির মতো স্বচ্ছ। ইরান কর্তৃক ১৯৫১ সালে তেল শিল্পে রাষ্ট্রীয়করণের পর শীর্ষস্থানীয় তেল ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। এমনকি শ্রীলঙ্কা এবং পেরুতে রাষ্ট্রীয়করণ নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসায়ীরা স্বার্থ সংকুচিত হয়। ফলে ওই দুটো দেশে মার্কিন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্ব বিনিয়োগ রিপোর্টের পরিসংখ্যানে প্রকাশ, আশির দশক থেকে বিশ্বের বাহাত্তর দেশে বহুজাতিক কোম্পানির থাবা থেকে দেশীয় শিল্প তথা জাতীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বাঁচাতে যেসব আইন প্রণয়ন করে, তার মধ্যে ছয়শটি আইন তাদের চাপে বাতিল কিংবা এদিক-ওদিক করতে হয়েছে। বিভিন্ন দেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের অর্থ সাহায্য দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ কাজ করে। 

কে না জানেন, নিকারাগুয়ার কন্টা বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে শুধু যে শাসনক্ষমতার অধিষ্ঠিতরা এ ধরনের অর্থের জোগান দেয় তা কিন্তু নয়। বরং প্রয়োজনে বিরোধী দলভুক্ত গোষ্ঠীকেও অর্থের জোগান দেয়। বর্তমানে আইএস জঙ্গিদের সাহায্য করার কাজে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। 

বিষয়গুলো আল কায়েদা ও তালেবান লাইমলাইটে এনেছে। অতি সম্প্রতি খবরে এসেছে, ইসলামিক স্টেটসহ অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীকে সিরিয়ায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য অর্থ দিয়েছিল ফ্রান্সের সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাফার্জ সিমেন্ট। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে আইএসের হাতে ৬০ লাখ ডলারের মতো অর্থ তুলে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ১৮ অক্টোবর ২০২২ স্থানীয় সময় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিন শহরের একটি আদালত লাফার্জ সিমেন্ট প্রতিষ্ঠানটিকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করেন। তাই এখন আমাদের ভাবার সময় হয়েছে বর্তমান বিশ্বায়নের এ সময়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে একটি দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ বিশ্বায়নের নতুন প্রযুক্তিতে উদার বাণিজ্য নীতি গ্রহণে বাধ্য হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রথমে ভালো যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায়। সম্প্রতি অ্যাকশনএইড প্রকাশিত ‘অপচুক্তি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায় : বাংলাদেশ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর কর আরোপের ক্ষমতা হারাচ্ছে, যার মূল কারণ দেশে নিয়ন্ত্রণমূলক ১৮টি চুক্তি। 

বহুজাতিক কোম্পানি শিল্প স্থাপনের এগিয়ে আসে বিপুল নিয়োগের সম্ভাবনা দেখা দেয় এবং মূলধন ভান্ডার গড়ে ওঠার সুযোগও থাকে। রফতানিমুখী শিল্প স্থাপন প্রেক্ষিতে লেনদেন ভারসাম্যের উন্নয়ন যদি ঘটে তাতে বহুজাতিক শিল্প গ্রহণযোগ্য হতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে যথা-তথা বিনোদন কেন্দ্র, হোটেল পার্ক, বিপণন ক্ষেত্র, সুপার মার্কেট স্থাপন, রেস্টুুরেন্ট বা হোটেল স্থাপন দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বাধিকার অক্ষুণ্ন্ন রাখতে শর্তসাপেক্ষে নির্বাচিত কিছু বহুজাতিক কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও খর্ব করার অন্য কোনো বিকল্প নেই। বহুজাতিক কোম্পানি যত সমাজসেবাই করুক না কেন, এদেরকে বন্ধু ভাবাটা ঠিক হবে না। 

-লেখক ও গবেষক


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: