প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দামে কাজ নেওয়ার সময়ই আশঙ্কা করা হয়েছিল এবার নিম্নমানের কাগজে বই ছাপতে পারেন মুদ্রণকারীদের অনেকে। দেশে কাগজ সংকট এ শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এখন বছরের শেষ সময়ে এসে সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে অনেক মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান। কাগজের উজ্জ্বলতায় ছাড় দিলেও সংকটের অজুহাতে নিম্নমানের কাগজ, ছাপা আর সেলাইয়ে পাঠ্যবই পাবে শিক্ষার্থীরা।
নিউজপ্রিন্ট কাগজের ছাপা বইয়ের অনেক পৃষ্ঠায় কালি লেপ্টে আছে। পাঠ্যবইয়ে স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে অযত্নের ছাপ। অন্যদিকে সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছানোই এখন একমাত্র লক্ষ্য মনে করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি, মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ও মুদ্রণকারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিন রাজধানীর বাংলাবাজার, শনির আখড়া, কাজলা, মাতুয়াইল এলাকায় বিভিন্ন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, শেষ সময়ে পাঠ্যবই নিয়ে ব্যস্ততায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বইয়ের গুণগত মান বিশেষ করে কাগজ, ছাপার রং ও বাঁধাইয়ে নিম্নমানের বিষয়টি খুব সহজেই চোখে পড়ে। বই হাতে নিলেই বিগত বছরের সঙ্গে বিস্তর ফারাক চোখে পড়বে। প্রতিটি বইয়ে বেশ কিছু সংখ্যক পৃষ্ঠায় নির্ধারিত মানের কাগজের চেয়ে নিম্নমানের কাগজ দিয়ে ছাপা হয়েছে।
শর্ত অনুযায়ী, ৬০ জিএসএমের (প্রতি বর্গমিটার কাগজের ওজন ৬০ গ্রাম) কাগজ দিয়ে ছাপার কথা থাকলেও এসব বইয়ের অনেকগুলোতে ৪০-৫০ জিএসএমের কাগজে ছাপা হচ্ছে। উজ্জ্বলতার ছাড়ের সুযোগে নিউজপ্রিন্টের কাগজেও বই ছাপা হয়েছে। মাতুয়াইলের ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেসে ছাপা বইয়ে ব্যবহৃত কাগজের কোনো উজ্জ্বলতা নেই। নিউজপ্রিন্টে ছাপা হয়েছে বই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ প্রেসের এক কর্মকর্তা বলেন, এ বছর কাগজের বড় সংকট রয়েছে। ভালো মানের কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ইনস্পেকশন এজেন্সি ও এনসিটিবির পরিদর্শকদের অনুমোদন নেওয়ার পর সেসব কাগজ বই ছাপানোর জন্য দেওয়া হচ্ছে। এ এলাকার বেশিরভাগ প্রেসেই নিউজপ্রিন্টের কাগজের বই দেখা যায়।
মানিকগঞ্জের একটি উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অধিকাংশ বই উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পৌঁছানো হয়েছে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো সমস্যা সমাধানে শুক্র ও শনিবার বই সরবরাহের কাজ অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের বইয়ের মান নিম্নমুখী। অনেক বইয়ের কাগজ, ছাপা এবং সেলাই ভালো নয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিনামূল্যের বই সেলাই ও বাঁধাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিতে বলা হয়েছে উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের।
শেষ সময়ে সরকারের লক্ষ্য থাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুদ্রণকারীদের কাছ থেকে বই আদায় করা। এমন অবস্থায় নিম্নমানের কাগজে বই দেওয়ার অপতৎপরতা চালাচ্ছে একশ্রেণির মুদ্রণকারী। সরবরাহ করা বইয়ের মধ্যে কিছু সংখ্যক বই মানসম্মত নয় বলে মাঠ পর্যায় থেকে জানা গেছে। এর মধ্যে কোনো বইয়ের কাগজের মান ভালো নয়, আবার কোনো কোনো বইয়ের মুদ্রণ সঠিকভাবে হয়নি। ৯টিরও বেশি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এনসিটিবি।
গ্লোবাল প্রিন্টিং অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট, আমিন আর্ট প্রেস অ্যান্ড প্রিন্টিং, আলামিন প্রেস, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনস, লিখন আর্ট প্রেস, হাওলাদার প্রেস, এসএস প্রিন্টার্স, নয়ন মনি এবং রিফাত প্রেসে নিম্নমানের কাগজে ছাপানো পাঠ্যবই ও বইয়ের ফর্মা কেটে বিনষ্ট করা হয়েছে। নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানোয় ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সাড়ে ৬ লাখের বেশি বই। বাতিল করা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন কাগজও।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির চেয়ারম্যান শহীদ সেরনিয়াবাত সময়ের আলোকে বলেন, পাঠ্যবইয়ের কাজে লোকসান হবে। বই ছাপার পর্যাপ্ত কাগজ পেতে কষ্ট করতে হয়েছে। সময়মতো মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছানো একটি চ্যালেঞ্জ। এবার কাগজের জন্য নিম্নমানের পাল্প ব্যবহার করা হয়েছে। আর রিসাইকেল করা কাগজই বেশি। ফলে কাগজ ও ছাপার মান খারাপ হয়েছে।
এবার পাঠ্যবইয়ের কাগজ এবং ছাপার মান ভালো নয় বলে স্বীকার করে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, এনসিটিবির জন্য প্রাথমিকের বই ছাপায় সবচেয়ে বেশি দেরি হচ্ছে। সিন্ডিকেট করে একটি চক্র প্রাথমিকের কাজ নিয়ে নিয়েছে। আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। কাগজ সংকটসহ নানা কারণে বই নিম্নমানের হচ্ছে।
আগামী ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের তিন শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের বই ছাপানো হচ্ছে। প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণি এবং মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই ও শিক্ষক গাইড দেওয়া হচ্ছে। বাদবাকি শ্রেণিগুলোর জন্য পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে বই ছাপানো হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের স্তরের জন্য ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৩ কপি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে।
এগুলোর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরে ৯ কোটি ৬৬ লাখ ৮ হাজার ৯৭৮ এবং মাধ্যমিক (স্কুল, মাদরাসা ও কারিগরি) স্তরে মোট ২৩ কোটি ৮২ লাখ ৬৭ হাজার ৯৪৫ কপি পাঠ্যবই। দেরিতে দরপত্র প্রক্রিয়া করা, কার্যাদেশে বিলম্ব, কাগজ সংকট, বিদ্যুতের লোডশেডিং- এসব কারণে শুরুতেই পাঠ্যবই নিয়ে সংকট তৈরি হয়।
বাজারে অব্যবহৃত (ভার্জিন) পাল্পের চরম ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণে ৮৫ শতাংশে উজ্জ্বলতার কাগজ পাওয়া যায়নি। এমনকি পুনঃব্যবহৃত (রিসাইকেল বা পুরোনো কাগজ প্রক্রিয়া করে বানানো) পাল্পেরও ঘাটতি আছে। এ সুযোগে পুরোনো কাগজ সরবরাহকারী এবং কাগজ উৎপাদনকারীদের অনেকে সিন্ডিকেট করে ফেলে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এনসিটিবির নমনীয়তা আর কাগজের এই সংকট পুঁজি করে কিছু মুদ্রাকর নিউজপ্রিন্ট আর নিম্নমানের কাগজে বই ছাপাচ্ছে।
এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, কাগজের সংকট ছিল। দেশে ভার্জিন পাল্প ছিল না। এ জন্য উজ্জ্বলতায় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এরপরেও সংকটের সুযোগ নিয়েছে অনেকে। নিম্নমানের অভিযোগে অনেক বই বিনষ্ট করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অনিয়ম করে কেউ ছাড় পাবে না। যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার তাই নেওয়া হবে। দ্বিগুণ জরিমানা করা হবে। এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, এ বছর শতভাগ বই পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ১ জানুয়ারি দেশব্যাপী বই উৎসবে কোনো সমস্যা হবে না। কেউ বাদ পড়বে না। প্রথম দিন সবাই বই নিতে আসে না।
তিনি জানান, নানা কারণে প্রাথমিকের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ দেরিতে শুরু হয়েছে। অচলাবস্থা কাটিয়ে ৩ ডিসেম্বর থেকে প্রাথমিকের বই ছাপানো শুরু হয়। ইতিমধ্যে ৭২ শতাংশ প্রাথমিকে পাঠ্যবই স্কুলে পৌঁছানো হয়েছে। আর মাধ্যমিকের পাঠ্যবই ৮০ শতাংশ পৌঁছে দিয়েছে। জানুয়ারির ১০ তারিখের মধ্যে শতভাগ বই পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বই উৎসব মাধ্যমিকের কাপাসিয়ায়, প্রাথমিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে : আগামী ১ জানুয়ারি দেশব্যাপী বই উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হবে। আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে জেলা-উপজেলায় বই উৎসব করা হবে। বিভিন্ন জেলায় মন্ত্রী, এমপিরা এ উৎসবে উপস্থিত থাকবেন। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রাথমিকের বই উৎসব হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। সেখানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন উপস্থিত থাকবেন।
আর মাধ্যমিকের বই উৎসব হবে গাজীপুরের কাপাসিয়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শিক্ষার্থীদের হাতে মাধ্যমিকের বই তুলে দেবেন। এর আগের দিন শনিবার সকাল ১০টায় বই উৎসবের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিটি শ্রেণির একজন করে শিক্ষার্থীকে এক সেট করে বই দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন তিনি।