গাইবান্ধায় নদ-নদীর নাব্যতা ফেরানোর বিকল্প নেই

কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা

সারাদেশ

‘আগে পাম্প দিয়ে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটেই একতলা বাড়ির ছাদে ৫০০ লিটারের দুটি পানির ট্যাঙ্ক ভরে ফেলা যেত। এ বছর শুকনো

2023-05-27T01:46:47+00:00
2023-05-27T01:46:47+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
সারাদেশ
গাইবান্ধায় নদ-নদীর নাব্যতা ফেরানোর বিকল্প নেই
দীর্ঘক্ষণ পাম্প চালিয়েও ভরছে না ট্যাঙ্ক
কায়সার রহমান রোমেল গাইবান্ধা
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ মে, ২০২৩, ১:৪৬ এএম   (ভিজিট : ২২২)
‘আগে পাম্প দিয়ে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটেই একতলা বাড়ির ছাদে ৫০০ লিটারের দুটি পানির ট্যাঙ্ক ভরে ফেলা যেত। এ বছর শুকনো মৌসুম শুরুর পর থেকে ২-৩ ঘণ্টা পাম্প চালিয়েও অর্ধেক ট্যাঙ্ক পানি পাওয়া যাচ্ছিল না। গত দুই সপ্তাহ থেকে পাম্প চালিয়ে এক ফোঁটা পানিও পাচ্ছি না।’ 

এভাবেই নিজের বসতবাড়িতে পানি সংকটের কথা তুলে ধরেন গাইবান্ধা পৌরসভার পূর্বপাড়ার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মুরাদজামান রব্বানী। শুধু তিনিই নন, পানির জন্য এমন হাহাকার পুরো গাইবান্ধাজুড়েই। যেন দেশের উত্তরের এ জেলার সর্বত্রই এখন ভীষণ খরা। পানি পেতে এখন মাটির আরও গভীরে পাম্প বসাতে দেখা যাচ্ছে সামর্থ্যবানদের। কিন্তু যাদের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাবমারসিবল পাম্প বসানোর সামর্থ্য নেই, তাদের উপায় কী? শুষ্ক মৌসুমে যেখানে জেলার নদী-খাল ও অন্যান্য জলাশয় শুকিয়ে কাঠ, সেখানে তারা পানি পাবেন কোথায়? 

দেশের উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় ক্রমেই বাড়ছে খরাপ্রবণতা। ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের ওপর চাপ পড়ায় পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে ইদানীং। একে তো টানা অনাবৃষ্টি আর নব্যতা সংকটে শুকিয়ে গেছে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়। তার ওপর নির্বিচারে পুকুর-জলাশয়সহ পানির উৎসগুলো ভরাট করে ইট-পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়ার ফলে ভূগর্ভে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে খুব দ্রুত নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এতে একদিকে যেমন সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্যও মিলছে না পর্যাপ্ত পানি; চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলার কৃষি। এমন পরিস্থিতিতে পানির চাহিদা পূরণে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের ওপর চাপ কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা। আর এর জন্য নদ-নদীগুলোর নাব্যতা ফেরানোর বিকল্প নেই বলে মত তাদের। 

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশে সেচের জন্য যে পানি ব্যবহার হয় তার ৭৫ শতাংশই মাটির নিচ থেকে তোলা। এক কেজি বোরো ধান উৎপাদন করতে প্রায় তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এক বিঘা বোরো ধান চাষে প্রয়োজন হচ্ছে ২৪ লাখ লিটার পানি। বার্ষিক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ ১৩ হাজার ৭১০ মিলিয়ন ঘনমিটার।

আর গাইবান্ধা জলবায়ু পরিষদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলায় ভূগর্ভস্থ পানি হ্রাসের বার্ষিক হার প্রায় এক মিটার। জেলার মোট জনগোষ্ঠীর ৭০ ভাগেরও বেশি মানুষ পান করা, গৃহস্থালি ও সেচের জন্য নলকূপ ব্যবহার করেন। এসব নলকূপের প্রায় প্রতিটির সঙ্গেই সংযুক্ত আছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমারসিবল পাম্প। প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে তোলা হচ্ছে লাখ লাখ লিটার পানি। ফলে ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। 

সরেজমিন দেখা যায়, জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকাসহ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের চকরহিমাপুর, খামারপাড়া, সাপমারা, সাহেবগঞ্জ, মেরী, তরফকামাল; কাটাবাড়ি ইউনিয়নের মাহমুদবাগ, বাগদা, বাগদাকলোনী, বেলতলা; গুমানীগঞ্জ ইউনিয়নের তরফমনু, কাইয়াগঞ্জ, পারগয়রা, গুমানীগঞ্জ, ফুলপুকরিয়াসহ কামদিয়া, রাজাহার ও শাখাহার ইউনিয়নের অনেক স্থানেই পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে ওসব এলাকায়। এ সংকট মোকাবিলায় সামর্থ্যবানদের অনেকেই বাসা-বাড়িতে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তুলছেন। এ ছাড়া চলতি বছর ইরি ও বোরো চাষের সেচ নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন এখানকার চাষিরা। বাধ্য হয়ে ১০ থেকে ১৫ ফুট গর্ত খনন করে তার মধ্যে সেচপাম্প বসিয়ে পানি তুলেছেন তারা। কিন্তু সেখানেও কয়েক দিন পর পর পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানির সন্ধানে আবারও গভীর গর্ত খনন করে সেচ কাজ চালিয়েছেন।

গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা গোপাল মহন্ত বলেন, ‘চাপকলে এমনিতে পানি ওঠে না। তাই টিউবওয়েলের পানি ওঠাতে সাবমারসিবল পাম্প দীর্ঘ সময় ছেড়ে রাখতে হয়।’ কাটাবাড়ী ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ গ্রামের সন্তোষ মোহন্ত বলেন, ‘গাঙের পাড়ে বাড়ি, তবুও নলকূপে পানি পাচ্ছি না।’ 

এদিকে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর পানির স্তর আরও বেশি নেমে গেছে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, গোবিন্দগঞ্জের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাহা আলী বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থায় পাম্প বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প বসানোই সমাধান নয় বলে জানাচ্ছেন জলবায়ু ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে ভূ-উপরিস্থিত পানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি বন ও পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারেও তাগিদ তাদের। 

গাইবান্ধা পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক ওয়াজিউর রহমান রাফেল বলেন, জেলার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এখন অধিকাংশ এলাকায় নিরাপদ ফলনের স্তরের নিচে। সংকট মোকাবিলায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থিত বিভিন্ন উৎস থেকে পানি ব্যবহারের ওপর সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। নিশ্চিত করতে হবে নদ-নদীর নাব্যতা। 

বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হাবীব সাঈদ বলেন, ‘আশানুরূপ বৃষ্টি না হওয়ায় নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। ফলে অনেক এলাকাতেই চাষাবাদে ভূ-উপরিভাগের স্বাভাবিক পানি মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর নির্ভরতা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃষি ব্যবস্থাকে আমরা করে তুলেছি প্রধানত সেচনির্ভর। নদী ও খালে পানি না থাকায় ভূ-উপরিস্থ পানিতে সেচ এখন নেই বললেই চলে। নদী ও খাল-বিলের পারেও বসেছে গভীর নলকূপ। খাবার পানিও উঠছে গভীর নলকূপে অথবা সাবমারসিবল পাম্পে। এতে চাপ পড়ছে মাটির নিচের পানির স্তরে। এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার পথ একটাই, নদীসহ খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।’

আর জলবায়ু পরিষদ গাইবান্ধার সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট জিএসএম আলমগীর বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া পরিবেশ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। সেক্ষেত্রে বিকল্প উৎস হিসেবে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্লান্টই হচ্ছে এখন ভালো বিকল্প।



Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: