আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাপা-তিনটি দলেই চলছে প্রার্থিতার লড়াই। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা থাকলেও দল থেকে মনোনয়নের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়তে না হয় সে জন্য প্রার্থী হতে ইচ্ছুক নেতারা সরব রয়েছেন।
বাবুগঞ্জ ও মুলাদী-এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে বরিশাল-৩ আসন। এটি জাতীয় সংসদের ১২১ নম্বর নির্বাচনি এলাকা। এখানে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪১৪ জন ভোটার রয়েছে।
এ আসনে আওয়ামী লীগ সব সময় জোট থেকে প্রার্থী দিয়ে থাকে। বর্তমানেও এ আসনের সংসদ সদস্য জোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত। কিন্তু টানা তৃতীয় মেয়াদে দল ক্ষমতায় থাকায় এ আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আসনটিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী হলেও স্বাধীনতার পর থেকে এখানে তারা কখনো এমপি প্রার্থী পায়নি। তাই এবার আর মহাজোটের শরিক দলকে নয়, ভোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী দেওয়ার জন্য দলের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানিয়েছেন এ আসনের আওয়ামী লীগ ও তার সব সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
আর অতীতের ন্যায় এ আসনটিতে মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় বিএনপির একাধিক নেতার নাম রয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে বাবুগঞ্জের সঙ্গে মুলাদী যুক্ত হয়ে বরিশাল-৩ আসন গঠিত হয়। এর আগে উজিরপুর ও বাবুগঞ্জ উপজেলা নিয়ে ছিল আলাদা আসন। তখন মুলাদী ছিল বরিশাল-৩ আসনে এবং বাবুগঞ্জ ছিল-২ আসনে।
সেই হিসেবে ১৯৯১ সাল থেকে বরিশাল-৩ আসনে একটানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি নেতা মোশাররফ হোসেন মঙ্গু। আবার ১৯৯১ সালে বরিশাল-২ আসন অর্থাৎ উজিরপুর-বাবুগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন হন রাশেদ খান মেনন। যদিও এরপরের নির্বাচনে সেখানে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও পরেরবার জাতীয় পার্টির গোলাম ফারুক অভি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তবে ২০০৮ সালে বাবুগঞ্জের সন্তান ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের শরিক দল বরিশাল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. টিপু সুলতান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২০১৮ সালে আবারও শরিক দল হিসেবে জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু সংসদ সদস্য হন।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসনটিতে দলীয় প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে কাজ করে যাচ্ছেন বাবুগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী ইমদাদুল হক দুলাল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম খালেদ হোসেন স্বপন, সদস্য মিজানুর রহমান, ব্যবসায়ী ও সৈনিক লীগের জেলা সভাপতি মিজানুর রহমান, মুলাদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম মিঠু খান এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত যুবলীগ নেতা শহিদ মোশতাক আহমেদ সেন্টুর ভাই মোস্তাফিজুর রহমান নিলু।
নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির কথা জানিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম খালেদ হোসেন স্বপন বলেন, মুলাদী ও বাবুগঞ্জে আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সুবাদে এখানে বিস্তর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছি। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ আমাকে মনোনয়ন দিলে এই উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ অনেক বেশি ত্বরান্বিত হবে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুবাদে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমানেরও রয়েছে আলাদা ভাবমূর্তি। দলের তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী চান তাকে বরিশাল-৩ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হোক।
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলে জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী মিজানুর রহমান বলেন, ভোটের হিসাবে বরিশাল-৩ আসনটি এককভাবে আওয়ামী লীগের। কিন্তু এখান থেকে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী না দেওয়ায় উন্নয়ন বিঘ্নিত হয়েছে। আমি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।
এ আসনে আওয়ামী লীগের আরেকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন আতিকুর রহমান। তিনি দলের নানা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।
তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন। আতিকুর রহমান বলেন, আমি দলের নৌকার পক্ষ হয়ে নির্বাচন করতে চাই। এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চাই।
অন্যদিকে বরিশাল-৩ আসনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু এবং জাতীয় যুব সংহতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহাজাদা মুন্সী।
সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু বলেন, এ আসনে দুবার নির্বাচিত হয়ে অনুন্নত জনপদে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছি। নদীবিধৌত দুই উপজেলার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন হয়েছে আমার সময়ে। বিশুদ্ধ সুপেয় পানির জন্য দুই উপজেলায় অসংখ্য টিউবওয়েল স্থাপনের পাশাপাশি কাবিখার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে দল মনোনয়ন দিয়ে উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রাখার সুযোগ দেবে বলে আমি আশা করি।
ব্যবসায়ী ও সৈনিক লীগের জেলা সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, যদি দল আমাকে মনোনয়ন দেয় আর আমি নির্বাচিত হতে পারি তা হলে বাবুগঞ্জ-মুলাদী উপজেলাকে একটি আধুনিক উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলব।
অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং আবদুস ছত্তার খান।
২০০৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ঘিরে সেলিমা রহমান এবং অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের মধ্যে বিরোধ এখনও চলমান। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি পেয়েছিলেন সেলিমা রহমান এবং অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। শেষ পর্যন্ত দলের নির্দেশে চূড়ান্ত প্রার্থী ছিলেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে নির্বাচনি এলাকায় অনুপস্থিত রয়েছেন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, আমরা নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাব না। তবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আমি এককভাবে দলীয় প্রার্থী। আমার সঙ্গে সবার যোগাযোগ আছে। আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, বরিশাল-৩ আসনে সর্বদাই বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। এ আসনের ইতিহাসে বিএনপির প্রার্থী একাধিকবার বিজয়ী হয়েছেন। তাই আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে হারানো আসন পুনরুদ্ধারে বিএনপির নেতাকর্মীরা সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন।
অন্যদিকে এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের বরিশাল জেলার সেক্রেটারি উপাধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম এবারও প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে। তবে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর দলটি এই সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছে।
সময়ের আলো/আরএস/