বেলফোর ঘোষণা যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

এক টুকরো কাগজে লেখা ৬৭টি শব্দ বিশ্বে এমন এক কঠিন বৈরিতার জন্ম দিয়েছিল যা আধুনিক সময়ে এসেও সমাধান করা সম্ভব

2023-11-14T22:45:44+00:00
2023-11-14T22:45:44+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বেলফোর ঘোষণা যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৩, ১০:৪৫ পিএম   (ভিজিট : ১১২৭)
এক টুকরো কাগজে লেখা ৬৭টি শব্দ বিশ্বে এমন এক কঠিন বৈরিতার জন্ম দিয়েছিল যা আধুনিক সময়ে এসেও সমাধান করা সম্ভব হয়নি। ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই এই বেলফোর ঘোষণার ১০৬ বছর পূর্ণ হয়েছে। সাতষট্টি শব্দের এই নথি, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ পরিষ্কার করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ সরকার প্রথমবারের মতো ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের সমর্থন জানায়। এটি সেই সময়কার কথা যখন ফিলিস্তিন অঞ্চলটি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অর্থাৎ ওই ভূখণ্ডের প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের হাতে ছিল।

ইসরায়েলিরা এই বেলফোর ঘোষণাকে আজকের আধুনিক ইসরায়েল গঠনের ভিত্তি বলে মনে করে। অন্যদিকে আরব বিশ্বের একাংশ মনে করে এই নথির মাধ্যমে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। কেননা এই ফিলিস্তিন অঞ্চল একসময় অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ব্রিটিশ সরকার যখন অটোমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে তখন আরবরা ব্রিটিশদের সমর্থন ও সহযোগিতা করেছিল। তাই বেলফোর ঘোষণাকে তারা পিঠে ছুরিকাঘাতের মতো মনে করে।বেলফোর ঘোষণার পর, ইহুদি অভিবাসীরা ফিলিস্তিন অঞ্চলে ভিড় করতে থাকে।

তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর এই ঘোষণাপত্রটি একটি সিল করা খামে ব্যারন লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ডের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ব্যারন লিওনেল তখন ব্রিটেনে বসবাসকারী ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন বড় নেতা ছিলেন।

ওই চিঠিতে লেখা ছিল: ‘‘প্রিয় লর্ড রথসচাইল্ড, মহামান্য সরকারের পক্ষ থেকে, নিম্নলিখিত এই বিবৃতিটি আপনাকে পাঠাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। জায়নবাদী ইহুদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সমর্থন দেয়া এই বিবৃতিটি মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়েছে এবং মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদিত হয়েছে।

মহামান্য ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে, তবে এটাও নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, এমন কিছু করা উচিত হবে না যা ফিলিস্তিনে অবস্থানরত অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার কিংবা অন্য দেশে বসবাসকারী ইহুদিরা যে অধিকার এবং রাজনৈতিক মর্যাদা ভোগ করছে, তার কোন হানি হয়।

আপনি যদি জায়নবাদী ফেডারেশনের কাছে এই ঘোষণা পৌঁছে দেন তাহলে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। আর্থার জেমস বেলফো’’

ব্রিটিশ সরকার আশা করেছিল যে এই ঘোষণার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইহুদিরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) মিত্র শক্তির পাশে থাকতে রাজি হবে। ব্রিটিশ নেতারা এবং কতিপয় ইতিহাসবিদ মনে করতেন, ইহুদি সম্প্রদায়ের যথেষ্ট পরিমাণ অর্থনৈতিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ছিল, যা তাদেরকে যুদ্ধ জয়ী হতে সাহায্য করবে।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রথম যুদ্ধের পর ব্রিটেনও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একটি শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে চেয়েছিল। ওই চিঠিটি লেখার পেছনে উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠন এবং পরবর্তীতে ওই অঞ্চল থেকে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুত হওয়ার পেছনে এই বেলফোর ঘোষণার বড় ধরনের প্রভাব ছিল।

ইসরায়েলিদের জন্য, বেলফোর ঘোষণাটি এমন একটি নথি ছিল যা ইসরায়েলিদের দাবি করা প্রাচীন ভূমিতে ওই জাতির বিকাশ লাভের স্বপ্নকে পূরণ করেছে।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের জন্য এই বেলফোর ঘোষণা এমন এক দুঃসময় ডেকে আনে যা আজও অব্যাহত রয়েছে। এমনকি ফিলিস্তিনিরা সমালোচনা করে যে, ওই নথিতে তাদের শুধুমাত্র ‘ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের নাম পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর, বেলফোর ঘোষণাটি মিত্রশক্তির সমর্থন পায়। সে সময় ফিলিস্তিনকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ১৯২২ সালের জুলাইয়ে লীগ অফ নেশনস ওই অঞ্চলে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অনুমোদনও দেয়। লীগ অফ নেশনস ছিল জাতিসংঘের পূর্ববর্তী একটি সংস্থা।

এই অনুমোদনের মাধ্যমে ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ওই অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব পায়। ১৯৩০ এর দশকে, এই অঞ্চলে বসবাসকারী আরবরা ক্রমবর্ধমান ইহুদি জনসংখ্যা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে। এতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

বিক্ষোভ প্রশমিত করতে গিয়ে, ব্রিটেন ইহুদি অভিবাসনের ওপর কোটা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদি গণহত্যা বা হলোকাস্টের ভয়াবহতা প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের চাপ বাড়তে থাকে।

এদিকে ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে মধ্যরাতে, ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের মেয়াদ শেষ হয় অর্থাৎ ওই অঞ্চলে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটে। ব্রিটিশরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই অঞ্চলটি ছেড়ে যায়। একই দিনে ইসরাইল তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

সময়ের আলো/জেডআই




Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: