অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক গৃহবধূর হাত-পা বেঁধে শরীরে আগুন দিয়েছে স্থানীয় বখাটেরা। গত শনিবার (২৫ নভেম্বর) রাতে শরীয়তপুর সদরের কাগদী এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের সহায়তায় পানিতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচলেও ভুক্তভোগী ওই নারীর শরীরের অন্তত ১০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
পরিবারের অভিযোগের পর ঘটনা তদন্তে কাজ শুরু করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম হিমা আক্তার, সে শরীয়তপুর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কাগদী গ্রামের মৃত ইউনুস সরদারের মেয়ে।
ভুক্তভোগী হিমা ও তার পরিবার জানায়, গত ৩ মাস যাবৎ হিমাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে উত্ত্যক্ত করে আসছিলো প্রতিবেশী ইদ্রিস পাহাড়ের ছেলে রাসেল পাহাড়। ফেসবুক-মেসেঞ্জারে টাকার লোভ দেখিয়ে হিমাকে নিজ বাড়িতে যেতে বলতো রাসেল। রাসেলের এমন অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হয়নি হিমা। এতে মারাত্মকভাবে ক্ষিপ্ত হয় সে। এরই জেরে শনিবার (২৫ নভেম্বর) রাত নয়টার দিকে ঘরের বাইরে বের হলে হিমাকে জোর করে মুখ চেপে ধরে পাশের একটি বাঁশ বাগানে নিয়ে যায় রাসেল ও তার এক সহযোগী। সেখানেই হিমার হাত-পা বেঁধে হিমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। এতে তার কোমরের নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত পুড়ে যায়। এসময় হিমার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে পালিয়ে যায় তারা। তাৎক্ষণিক পাশের পুকুরে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন হিমা। ওই রাতেই স্থানীয়দের সহায়তায় হিমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে স্বজনরা।
মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় হিমা ও তার মা-বোনের সঙ্গে। হিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, দীর্ঘ ৩ মাস যাবৎ আমাকে বিভিন্ন ধরনের খারাপ প্রস্তাব দিয়ে আসছিলো রাসেল। ফেসবুক-মেসেঞ্জারে খারাপ কথা লিখে টাকা দেয়ার কথা বলে তার বাড়ি যেতে বলতো। আমি তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সে আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়।
হিমা আক্তার বলেন, শনিবার (২৫ নভেম্বর) রাতে আমি রুমের বাইরে গেলে আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা রাসেল ও তার সহযোগী দুজন মিলে আমার মুখ চেপে ধরে বাথরুমের পিছনে থাকা বাঁশ বাগানে নিয়ে যায়। এসময় তাদের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় আমার দুই হাত-পা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে রাখে। এসময় রাসেল আমার জামায় আগুন লাগিয়ে দেয়। আমি চিৎকার দিলে আমার মা-বোন ছুটে আসে। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওরা দুজন পালিয়ে যায়। আমি জীবন বাঁচাতে পাশে থাকা পুকুরে ঝাঁপ দেই। আমি ওদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
হিমার বোন খাদিজা আক্তার জানায়, বোনের কান্না শুনে দৌড়ে বাথরুমের কাছে যাই। গিয়ে দেখি আমার বোনের শরীরে আগুন জ্বলছে। কোন উপায় না দেখে বোনকে পানিতে ঝাঁপ দিতে বলি। তার কোমরের নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ পুড়ে গেছে। পরে আমরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করি। রাসেল আমার বোনকে অনেক বিরক্ত করতো। আমরা থানায় অভিযোগ দিয়েছি। পুলিশ এসে ঘটনার খোঁজ নিয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. নুরুল আলম বেপারী বলেন, বাড়ির পাশে চিৎকার শুনে পুকুর পাড়ে ছুটে আসি। এসে দেখি হিমা পুকুরে পরে আছে। আমরা সবাই মিলে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাই। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী নাজমুল ইসলাম জানায়, আমি এসে দেখি হিমা বাঁচাও বাঁচাও বলে পুকুরে চিৎকার করছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি চাই।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) শামীম আব্দুল্লাহ বলেন, শনিবার (২৫ নভেম্বর) রাতে আগুনে পোড়া অবস্থায় হিমা আক্তার নামে এক রোগী ভর্তি হয়। তার শরীরের ১০ শতাংশ আগুনে পুড়ে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সে এখন অনেকটা আশঙ্কামুক্ত অবস্থায় রয়েছে। আশা করি দ্রুতই সে সুস্থ হয়ে উঠবেন।
শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার মাহাবুবুল আলম বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। সোমবার (২৭ নভেম্বর) হিমার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি অভিযোগ দেয়া হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত শুরু করেছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সময়ের আলো/আরআই