দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জমে উঠেছে বরিশালের নির্বাচনী মাঠ। বিশেষ করে বরিশাল সদর আসনে নৌকার মনোনয়ন বঞ্চিত সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই বরিশাল আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
সাদিকপন্থীরা বলছেন, বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নৌকার প্রার্থী নয় বরং সাদিক আব্দুল্লাহকে জয়ী করতে সর্বোচ্চ কাজ করবেন। বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন চেয়ে বঞ্চিত হওয়ার পর পুনরায় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল ৫ আসন থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হন সাদিক, এতে করে কোণঠাসা হয়ে পরে সাদিক শিবির। তবে সাদিক আব্দুল্লাহ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেওয়ার পর উজ্জীবিত সাদিকের নেতাকর্মীরা।
এদিকে, বরিশাল সদর অর্থাৎ বরিশাল-৫ আসনে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুখ বলছেন, সদ্য সিটি নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতের বিরোধিতা করেছিলো এই মহানগর আওয়ামী লীগ। কিন্তু জনগণ ভোটে ফলাফল দিয়েছে। অতএব কে কি বললও তা নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই বলে জানান জাহিদ।
অন্যদিকে প্রশাসন সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান একে এম জাহাঙ্গীর। গত সোমবার (২৭ নভেম্বর) বরিশাল সদর আসনে বরিশাল রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেন জাহিদ ফারুখ শামীম এবং বুধবার (২৯ নভেম্বর) মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন তিনি।
এদিকে মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর পক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগের একডজন নেতা মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করলেও আজ (বুধবার) পর্যন্ত জমা দেয়া হয়নি তা। তবে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশের নামে সাদিক আব্দুল্লাহর পক্ষে বরিশাল নগরীতে বিশাল শো ডাউন করেছে। বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের পর মিছিল করেছেন তারা। সমাবেশ থেকে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাদিক আব্দুল্লাহর পক্ষে সকলকে কাজ করার আহবান জানান।
সমাবেশে বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বরিশাল আওয়ামী লীগকে আগলে রেখেছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসন থেকে তৃনমূল ভোটে নির্বাচিত হবেন সাদিক আব্দুল্লাহ। আমরা জেলা ছাত্রলীগ তার জন্য সর্বোচ্চ কাজ করবো।
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি গাজী নইমুল হোসেন লিটু বলেন, বরিশালে আওয়ামী লীগের নেতা একজনই সেটা হচ্ছে সাদিক আব্দুল্লাহ। আগামী ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে সাদিক আব্দুল্লাহকে সাধারণ মানুষ বিপুল ভোটে জয়ী করবেন।
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বরিশাল জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা সবসময় বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে কাজ করেছি। মহানগর আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছে সাদিক আব্দুল্লাহ। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে ৫ বছরে বরিশালকে সমৃদ্ধ করেছেন। একইসঙ্গে সাদিক আব্দুল্লাহ চাঁদাবাজ মুক্ত করেছে। এবারে আমরা স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে প্রস্তুত। আমরা ফসল রোপণ করি, আর পাকা ফসল আরেকজনে কেটে ঘরে তুলবে তা হতে দেয়া যাবে না। আমাদের ফসল আমাদের ঘরে রাখতে চাই। আমরা কোনো বহিরাগতর ঘরে ফসল নিতে দেবো না। যাকে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তাকে আমরা কোনো আন্দোলন সংগ্রামে পাইনি, আমরা চাই যে জনগণের সাথে থাকে তাকে। আমরা ফসল উৎপাদন করবো আর সেই ফসল রাতের আঁধারে আরেকজন কেটে ঘরে তুলবে, আমরা সেটা চাই না।
তিনি বলেন, সাদিক আব্দুল্লাহ নির্বাচনে অংশ নিতে চায়নি, তবে সেরনিয়াবাত ভবনে কান্নার রোল পড়েছিলো, আমরা তাকে চেপে ধরেছি নির্বাচন করার জন্য। জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাবে, আপনার ভোট আপনি দেবেন, কোনো জালিয়াতির সুযোগ নেই। কোনো প্রশাসন ব্যবহার করে আপনারা বাক্স ভরবেন সেই সুযোগটি নেই, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমাদের নির্যাতন করেছে, সেই সুযোগ এবার নেই।
অন্যদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল ৫ আসনে নৌকার প্রার্থী ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেছেন, আমার ওপর আস্থা রাখায় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনিই আমাকে ২০১৮ সালে মনোনয়ন দিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। আমিও চেষ্টা করেছি আমার দায়িত্ব-কর্তব্য সততা-নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে পালন করতে। আর এ কারণে প্রধানমন্ত্রী আমার ওপর আস্থা রেখেছেন বিধায় আমাকে আবারও মনোনয়ন দিয়েছেন।
বুধবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিল শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া ও তার পক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগের অবস্থানের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত সিটি নির্বাচনের সময়ও সমস্যা হয়েছিলো, তখনও মহানগর আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে সঠিকভাবে সহায়তা করেনি। কিন্তু আপামর সাধারণ মানুষ যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে, যারা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে বিশ্বাস করে এবং আস্থা রাখে তারা ঠিকই কাজ করেছে। আর সেজন্যই খোকন সেরনিয়াবাতকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন।
তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনে আমি নৌকার প্রার্থী, আমি আওয়ামী লীগের অরিজিনাল প্রার্থী সুতরাং যারা আওয়ামী লীগপন্থী এবং যারা জননেত্রী শেখ হাসিনার আস্থায় বিশ্বাস করেন তারা অবশ্যই আমার পাশে থাকবেন। আমি জানি বরিশালের সাধারণ মানুষের আমার সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে। আমার সততা নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার জন্য তারা আমাকে ভালোবাসেন। তাই আমি মনে করি আপামর জনসাধারণ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।
তিনি আরো বলেন, সদর উপজেলাসহ বরিশালকে উন্নয়নশীল সমৃদ্ধশালী একটি শহরের রূপান্তরিত করবো। এরমাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশের পথে আমরা এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো এবং তার হাতকে আরও শক্তিশালী করবো।
জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটির নেতাকর্মীরা তার সাথে থাকবে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলা উপজেলা ও মহানগরের যারা রয়েছেন, তারা এরইমধ্যে ফোন দিয়ে বলতে শুরু করেছেন আমরা নৌকায় ভোট দিবো ব্যক্তি কাউকে দিবো না। সুতরাং মেসেজ ক্লিয়ার।
স্বতন্ত্র বা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীদের নিয়ে মহানগরের দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বলতে চাওয়াটা গণতান্ত্রিক অধিকার। মেয়র নির্বাচনের সময় লোকজন অনেক কথা বলেছিলো, কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। আমরা গল্প বলিনা, রেজাল্ট দেখে বলি। এরআগেও অনেকে বলেছিলো আমরা মনোনয়ন পেয়ে গেছি এবং আগে মিছিলও নামিয়েছে কিন্তু বাস্তবে মনোনয়ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি আমি নৌকার প্রার্থী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে এবং বরিশালের উন্নয়নের জন্য আমার ওপর জনগণের বিশ্বাস আছে। তারা আমাকে ভালোবাসে বিধায় ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত করে ওদেরকে সমুচিত জবাব দিবে।
সময়ের আলো/আরআই