অগ্রহায়ণ এসেছে, তাইতো কৃষক পরিবারে হাসি ফুটেছে। প্রতি বছর যখন এই মাসটি আসে তখন সারাদেশে ন্যায় নওগাঁতে রোপা-আমন ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। এবার তার ব্যতিক্রম হয়নি। এসেছে অগ্রহায়ণ, কাটছে নতুন ধান, নতুন চাল আর সেই চাল থেকে পিঠা, পুলি-পায়েস আরো কত কি। ঘরে ঘরে চলছে জামাই আদর।
নবান্নের আনন্দে আমন ধান কাটা-মাড়াইয়ের ধুম চলছে নওগাঁ জেলা জুড়ে। এখন মাঠের সোনালী ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত কৃষকরা। কয়েকমাস আগে যে স্বপ্ন বুনেছিল ধান ঘরে আসার সাথে সাথে সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। নানা ব্যস্ততায় বাড়ির উঠানে চলছে ধান মাড়াইয়ের মহোৎসব।
দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠে সোনালী ধানের সমারোহ। বাতাসে দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। চারিদিকে সোনালী রঙের নতুন আমন ধানের মৌ মৌ ঘ্রাণ। ঘাসের ওপর বিন্দু বিন্দু শিশির কণা জানান দিচ্ছে শীতের আগমন। নওগাঁর মাঠে মাঠে চলছে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ধুম। কৃষকরা বলছেন, বিগত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন ভাল হয়েছে। নতুন ধানের চালের হরেক রকম পিঠা-পায়েস ও মিষ্টান্ন দিয়ে অগ্রহায়ণে নবান্ন উৎসবে মেতে উঠবেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। যা থেকে ৯ লাখ ৭ হাজার ৫২৫ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের আশা কৃষি বিভাগের।
উত্তরের জেলায় নওগাঁর মাঠে মাঠে আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ধুম পড়েছে। নতুন ফসল ঘরে তুলতে বাংলার কৃষকরা আনন্দে মেতে উঠেছে। কাস্তে হাতে ধান কাটার সময় কৃষকের পেছনে লেগেছে শালিক পাখি। ঝাঁক বেঁধে খুঁজছে নিজেদের আহার। জেলার মহাদেবপুর উপজেলার বাগডোব গ্রামের ফসলের মাঠে দেখা যায় এমন দৃশ্য। অবারিত প্রান্তরে সোনালী রঙের নতুন আমনের শস্যের দোলা হাসি ফোটায় কৃষকের মুখে। আর নতুন ধানে নবান্ন তো কৃষকের জন্য এক আনন্দের উৎসব।

নবান্ন উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। নতুন ধান কাটা আর সেই ধানের প্রথম অন্ন খাওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় নবান্ন উৎসব। নতুন চালের তৈরি পায়েস-পোলাও, পিঠা-পুলিসহ রকমারি খাদ্য পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানটাও যেন আনন্দের। পাশাপাশি পালন করা হয় সামাজিকভাবে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী নানা আচার-অনুষ্ঠান। শরতের বিদায় হতে না হতেই হেমন্তকে পাশ কাটিয়ে যেন আগাম বার্তা দিচ্ছে শীত। ফসলের খেতসহ শিশিরে ভেজা ঘাস আর কুয়াশার চাদর জানান দিচ্ছে হেমন্ত এসেছে প্রকৃতি-জুড়ে। প্রকৃতিতে অনুভূত হচ্ছে হালকা শীতের আমেজ। দরজায় কড়া নাড়ছে শীত। দিনভর গরম থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পর্যন্ত হালকা কুয়াশা চাদরে ঢেকে থাকছে।
চাষিরা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর ধানের ফলন ভাল হয়েছে। প্রতি বিঘাতে ধান উৎপাদন করতে খরচ পড়েছে ১০-১২ হাজার টাকা। তবে ধানে পোকার উপদ্রব হওয়ায় কীটনাশক প্রয়োগে বাড়তি প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ ফসল কাটার পর অন্য ফসল উৎপাদনে বাড়তি তেমন খরচ হয়না। আবহাওয়া ভাল থাকায় এখন সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে ফসল ঘরে তুলতে পারছে।
মহাদেবপুর উপজেলার বাগডোব গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, আমনের আবাদে বিঘা প্রতি প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ পড়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়ায় গভীর নলকূপের পানি দিয়ে আবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে বৃষ্টি হওয়াতে ধানের কিছুটা সমস্যা হয়েছে। ধানে পোকার আক্রমণ হয়েছে। এতে কীটনাশক প্রয়োগে বাড়তি টাকা খরচ হয়েছে। তারপরও ফলন হয়ে বিঘা প্রতি ১৬-১৮ মণ।
চকগৌরি গ্রামে কৃষক সানোয়ার হোসেন বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত হালকা কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। ঘাসের ওপর বিন্দু বিন্দু কুয়াশা জমে থাকছে। সকালে কাজে বের হলে শীতের পোশাক গায়ে জড়িয়ে বের হতে হচ্ছে। দিন দিন ঠাণ্ডা বেশি পড়বে।
সদর উপজেলার গাংজোয়ার গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আপদকালিন ফসল হিসেবে আমন ধানের আবাদ করা হয়। এ ধান কেটে আলু বা সরিষা রোপণ করা হবে। আমন ধান বিক্রি করে সে টাকা দিয়ে এসব ফসলে আবাদ করা হবে। এতে পকেট থেকে বাড়তি টাকা খরচ হবে না।
একই গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক হারান চন্দ্র বলেন, অগ্রহায়ণ মাসে নতুন আমন ধান কেটে চাল করা হয়। চাল থেকে আটা করে বিভিন্ন পিঠা পায়েস, মিষ্টান্ন ও ফল দিয়ে নবান্ন উৎসবে পালন করা হয়। মেয়ে-জামাই, প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করে খাওয়ানো হয়। আগে বছরে একটি ফসল হওয়ায় ঘরে অভাব ছিল। বছর শেষে আমন ধান কেটে উৎসব করে নবান্ন পালন করা হতো। তবে এখন সারা বছরই ধানের আবাদ হয়। নবান্ন উৎসব এখন তেমন পালন করতে দেখা যায় না।
মহাদেবপুর উপজেলা কৃষি অফিসার হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ বলেন, মহাদেবপুর উপজেলায় এ বছর ২৮ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়ে বেশি হয়েছে। তার মধ্যে ১১হাজর ১০ হেক্টর জমিতে চিনিগুড়া আতব (সুগন্ধি জাতের) ধানের আবাদ করা হয়েছে। তবে ধানে পোকার আক্রমণ হলেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কোন ব্যাঘাত হবে না। পোকা দমনে কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকের সার্বিক পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে বলে জানান এ কৃষিবিদ।
সময়ের আলো/আরআই