আজ ১১ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে টাঙ্গাইল, নান্দাইল, শিবগঞ্জ ও হিলি হানাদার বাহিনী ও রাজাকার মুক্ত হয়। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) : মুক্তিযুদ্ধের সময় নান্দাইল থানা ও এর আশপাশে ছিল রাজাকার ও পাক-হানাদারদের ঘাঁটি। বিএলএফের একটি দল ন. ম. ম. ফারুকের নেতৃত্বে ১০ ডিসেম্বর গভীর রাতে নান্দাইল থানার উত্তর দিক খোলা রেখে অন্য তিন দিকে অবস্থান গ্রহণ করেন বিএলএফ, মুক্তিযোদ্ধারা। আত্মসমর্পণ না করলে তুমুল আক্রমণ শুরু করা হবে বলে বার্তা পাঠানো হলে পাকিস্তানি বাহিনীসহ রাজাকার-আলবদররা রাতেই উত্তর দিকের সড়ক দিয়ে আঠারবাড়ির দিকে পালিয়ে যায় এবং থানায় অবস্থানরত পুলিশরা আত্মসমর্পণ করে। এরপর রাত ২টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা নান্দাইল থানা ও জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : শিবগঞ্জ থানা সদর মুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দল যখন শিবগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন ১১ ডিসেম্বর রাতেই তাদের কাছে স্থানীয় মানুষজন খবর দেন, রাজাকার-আলবদর ও থানার পুলিশকে ফেলে রেখে পাকিস্তান সেনারা এ দিন রাতেই শিবগঞ্জ ছেড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের দিকে পালিয়ে গেছে। এ খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ১১ ডিসেম্বর দুপুর ২টা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দল একের পর এক শিবগঞ্জ সদরে ঢুকে পড়ে। পুরোপুরিভাবে মুক্ত হয় শিবগঞ্জ থানা।
টাঙ্গাইল : ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলার সূর্যসেনারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে টাঙ্গাইলকে মুক্ত করে উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত ‘কাদেরিয়া বাহিনী’র বীরত্বের কথা স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরুতেই এখানে ‘টাঙ্গাইল জেলা স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ’ গঠন করা হয়। চলতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ। ২৬ মার্চ থেকে গ্রামে-গ্রামে যুবকরা সংগঠিত হয়। ৩ এপ্রিল মির্জাপুরের গোড়ান-সাটিয়াচড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবরোধ ভেঙে হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল শহরে প্রবেশ করে। মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ স্থানে চলে যান। অল্পদিনের মধ্যেই সেদিনের তরুণ-যুবক ছাত্রলীগ নেতা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বিশাল ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ। খন্দকার আবদুল বাতেনের নেতৃত্বে গঠিত ‘বাতেন বাহিনী’ও অনেক জায়গায় হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। টাঙ্গাইলে মুক্তিযুদ্ধে প্রধান ভূমিকা পালন করে কাদেরিয়া বাহিনী।
হিলি (দিনাজপুর) : ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ৭নং সেক্টরের আওতায় দিনাজপুরের হিলি হানাদার মুক্ত হয়। হাকিমপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. লিয়াকত আলী জানান, পাকিস্তান হানাদাররা হিলি থেকে তিন মাইল পূর্বে ছাতনী গ্রামে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। বিভিন্ন দিকে ক্যাম্প গঠনের মাধ্যমে ভারী অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অবস্থান গ্রহণ করে এবং মুহাড়াপাড়ায় তারা একটি গভীর খাল কেটে বেশ কয়েকটি ব্যাংকার তৈরি করে। সেখানে পাকিস্তান সেনারা ৪০টি ট্যাঙ্ক নিয়ে অবস্থান করতে থাকে। পরে ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে সমর্থন দানের পর হিলির মুহাড়াপাড়া এলাকায় মিত্রবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তান সেনাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। দুদিন প্রচণ্ড যুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনী পরাস্ত হলে ১১ ডিসেম্বর দুপুর ১টার দিকে হিলি হানাদার মুক্ত হয়।
সময়ের আলো/আরএস/