বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ছাতিয়ানগ্রাম। সপ্তদশ শতাব্দীর কথা ছাতিয়ানগ্রামে ছিলেন ছোট খাটো জমিদার নাম ছিল আত্মারাম চৌধুরী ও স্ত্রী শ্রী জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী (তমা দেবী)। ছিলেন নিঃসন্তান সন্তান লাভের আশায় জমিদার তার বাড়ীর অদূরে নির্জন এক পুকুর পাড়ে ঈশ্বরের সাধনা অর্চনা শুরু করেন। আত্মারাম চৌধুরী যে স্থানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করে ছিলেন সে স্থানটি আজও সিদ্ধেশ্বরী নামে স্মৃতি বহন করে আসছে। সিদ্ধিলাভের পর পরবর্তীতে তার স্ত্রীর গর্ভে ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম হলে তার নাম রাখা হয় ভবানী।
এ সব তথ্য জানা যায়, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় লিখিত রানী ভবানী বই থেকে। তার জন্ম হয় ১৭১৬ সালে। মৃত্যু ৫ সেপ্টেম্বর ১৮০২ সাল। দান, ধ্যান, শিক্ষা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চিকিৎসা ও ধর্মীয় কাজের স্বীকৃত স্বরূপ তার প্রজারা তাকে মহারানী নামে আখ্যায়িত করে। এককালের অর্ধে বঙ্গেঁশ্বরী পরিচিতি ‘রানী ভবানীর স্মৃতিবিজড়িত ছাতিয়ানগ্রামে তার স্মৃতি টুকুও আজ ধ্বংসের পথে। সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে মহীয়সী এই নারীর জন্মস্থান হারাতে বসেছে তার ঐতিহ্য। ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে তার পিতার বাড়ী যেখানে তিনি ভূমিষ্ঠ হয়ে ছিলেন।
এখন তার পিতৃগৃহের ধ্বংসাবশেষ আছে মাত্র। ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত জয় দুর্গা মন্দির এবং শিব মন্দির। এগুলি রক্ষার জন্য সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কখনো।
ভবানীর বয়স যখন ৯/১০ বৎসর সে সময় একদিন নাটোর রাজবাড়ীর দেওয়ান (মগনেহর) দয়ারাম নবাব আলীবর্দী খানের দরবার থেকে ফেরার পথে ছাতিয়ানগ্রামে এসে রাত হয়ে যায়। সে খানে তাঁবু ফেলা হয় রাত্রি যাপনের জন্য। নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণের অভ্যাস ছিল দয়ারামের। ভোরে তিনি শয্যা ত্যাগ করে বেরুলেন তাঁবু থেকে। দেখলেন ফুট ফুটে একটি মেয়ে লাল শাড়ী পরে পূজার জন্য ফুল তুলছে। দেওয়ান দয়ারামের পছন্দ হল ঐ মেয়েটিকে। তিনি পিছু নিলেন মেয়েটির। পৌঁছলেন তিনি আত্মারাম চৌধুরীর বাড়ীতে জানলেন মেয়েটি আত্মারাম চৌধুরীর। নাম তার ভবানী। দেওয়ান নাটোরের রাজকুমার রামকান্তের সাথে ভবানীর বিয়ের প্রস্তাব দিলেন আত্মারামের কাছে। তিনি ভবানীর মতামত জানতে গেলে ৩টি শর্তে বিয়েতে রাজী হন।
প্রথম শর্ত ছিল বিয়ের পর তিনি এক বছর পিতার বাড়ীতে থাকবেন। এক বছরে প্রতিদিন একটি করে পুকুর স্থাপনের জন্য ছাতিয়ানগ্রামে ৩৬৫টি পুকুর খনন করে দিতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত ছিল ছাতিয়ানগ্রাম থেকে নাটোর পর্যন্ত নতুন রাস্তা নির্মাণ করে পুরো রাস্তায় লাল সালুর কাপড় দিয়ে ছাউনি তৈরি করতে হবে। যার ভিতর দিয়ে সে স্বামীর বাড়ী যাবেন। তৃতীয় শর্ত ছিল এলাকার প্রজাদের ভূমিদান করে তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
ছাতিয়ানগ্রামে ৩৬৫টি পুকুরের স্মৃতি চিহ্ন আজও বিদ্যমান। ছাতিয়ানগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বদিকে যে রাস্তাটির স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে সে রাস্তাটির নাম ছিল ভবানীর জাঙ্গাল। উক্ত সড়কটি ছাতিয়ানগ্রাম থেকে নাটোর পর্যন্ত বিস্মৃত ছিল। এ থেকে প্রমাণ হয় রাজকুমার রামকান্ত সকল শর্ত পূরণ করে রানী ভবানীকে রানী বানিয়ে ছিলেন।
ভবানীর বিয়ের পর মা জয়দূর্গা দেবী দেহ ত্যাগ করেন। রানী ভবানী তার মায়ের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য যে স্থানে তিনি মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে ছিলেন সেখানে মন্দির তৈরি করেন। যার নাম ছিল জয় দূর্গামন্দির। এই মন্দিরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অষ্টধাতু নির্মিত এক দূর্গা প্রতিমা।
রানী ভবানী শিশুকাল থেকেই ছিলেন ধর্ম পরায়ণ ও মানব কল্যাণে নিয়োজিত একটি মহিলা। তার বিয়ের শর্ত ৩৬৫টি পুকুর এবং রাস্তাটি তার নিজের জন্য করেননি, করেছিলেন জনসাধারণের উপকারের জন্য। ১৭৪৮ সালে তার স্বামী রাজকুমার রামকান্তের মৃত্যুর পর রানী ভবানী নবাব আলি বদিখানের কাছ থেকে নাটোরের জমিদারের ভার গ্রহণ করেছিলেন। ১৮০২ সাল পর্যন্ত তিনি জমিদারী পরিচালনা করেন। 
প্রবাদ আছে নবাব সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে কাশিম বাজার কটিতে যে ষড়যন্ত্র সভা হয়েছিল সেখানে রানী ভবানী আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তিনি ইংরেজদের বিরোধিতা করে জমিদারকে খাল কেটে কুমির না আনার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। নাটোরের রাজার কাচাড়ী ছিল ছাতিয়ানগ্রামে। ১৯৫০ সালে সান্তাহারে সংঘটিত হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সে সময় জয়দুর্গা মন্দিরে থাকা অষ্টধাতুর দুর্গা নিরাপত্তার অভাবে তিনি নাটোরে নিয়ে যান।
জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হবার সময় রানী ভবানীর জন্মস্থান ছাতিয়ানগ্রামের জয় দুর্গা মন্দির নাটোরসহ তার সময় নির্মিত সকল ধর্ম প্রতিষ্ঠানের সম্পদ চয়েজ অবল্যান্ড হিসাবে রাখা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলেও ছাতিয়ানগ্রামের জয়দুর্গা মন্দিরের বিশাল এলাকা রানী ভবানীর চয়েজ ল্যান্ড হিসাবে ব্যবহার ছিল। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন একজন এসডিও রানী ভবানীর ব্যস্ত ভিটাটি মোস্তাকিন পালোয়ান নামের একজন ব্যক্তিকে লিজ হিসাবে প্রদান করেন। পরে হিন্দু সম্প্রদায় লিজ বাতিলের জন্য মামলা দায়ের করলে আদালত উক্ত প্লটের ১৭ শতাংশ বাড়ি করার জন্য রায় দেন। চয়েজ ল্যান্ড অবশিষ্ট জমিগুলি ফেরত দিতে বলেন।
অতিরিক্ত এসডিও (রাজস্ব) আগের কথা বহাল রাখে উক্ত জায়গাগুলির সমুদয় সম্পত্তি দখল করে জয়দুর্গা, শিবমন্দির এবং রানী ভবানীর পিতৃগৃহ ভেঙ্গে ফেলেন।
সময়ের আলো/আরআই