নাটোরের লালপুরে যুবলীগ নেতা খায়রুল বাশার হত্যা মামলায় জামায়াত-শিবিরের ১৩ নেতাকর্মীকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মহিদুজ্জামান এই রায় ঘোষণা করেন। অন্যদিকে মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে আদালত ৫৪ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশের পর সারা দেশে তাণ্ডব শুরু করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। সেদিন খাইরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়। নিহত খাইরুল লালপুর উপজেলার কদিমচিলান ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পেশায় নিরাপত্তাপ্রহরী ছিলেন তিনি। খাইরুলকে খুনের ঘটনায় তার ভাই শাহীনুর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেছিলেন।
সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন নাটোরের লালপুর উপজেলার পুকুরপাড়া চিলান গ্রামের সেকেন্দারের ছেলে আবদুল করিম, বানু সরদারের ছেলে মতি সরদার, কদিমচিলান গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে আবুল কালাম আজাদ প্রিন্স, পুকুরপাড়া চিলান গ্রামের তৈয়ব সরদারের ছেলে মকলেছ সরদার, মকলেছ সরদারের ছেলে মহসিন সরদার, সেকেন্দারের ছেলে খলিল, রুস্তম আলীর ছেলে রানা, ফরজের ছেলে আনিসুর, লুৎফর প্রাংয়ের ছেলে রাজ্জাক, শাহজাহানের ছেলে জার্জিস, কদিমচিলান গ্রামের আন্দারুর ছেলে কালাম, মাজদারের ছেলে মিজানুর রহমান এবং পুকুরপাড়া চিলান গ্রামের কুদ্দুস প্রাংয়ের ছেলে সানা প্রাং। তারা সবাই জামায়াত-শিবির কর্মী এবং পলাতক।
রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি এন্তাজুল হক বাবু এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। এই রায়ের পর আসামিরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কদিমচিলান বাজারের বাসস্ট্যান্ডের কাছে মিছিল বের করে। আসামিরা গুলিবর্ষণ করে এবং ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। এ সময় যুবলীগ নেতা খাইরুল ইসলামকে আসামিরা কুপিয়ে হত্যা করে।
পিপি এন্তাজুল হক বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের দিনই নিহত খাইরুলের ভাই শাহীনুর রহমান লালপুর থানায় ৬০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। পরে পুলিশ তদন্ত করে ৬৭ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ ১০ বছর পর সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক। এই মামলার মোট ৬৭ জন আসামির মধ্যে তিনজন মারা যাওয়ায় তারা এমনিতেই খালাস। বাকি ছিলেন ৬৪ জন। এর মধ্যে ১৩ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। অন্য সবাইকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রায় ঘোষণার সময় কোনো আসামি আদালতে হাজির ছিলেন না। আদালত ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছেন। আগে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি তুলব। সেটা পর্যালোচনা করব। তারপর মন্তব্য করব। পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়ে তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত খাইরুলের আত্মীয়স্বজন।
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে খাইরুল ইসলামের ছেলে জুবায়ের ইসলাম বলেন, মামলাটি হাইকোর্টে নিয়ে দীর্ঘদিন এর বিচার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। এক পর্যায়ে নথিপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা বহু কষ্টে নথি জোগাড় করে আবার মামলাটি সক্রিয় করি। দীর্ঘদিন পর রায় হলো, কিন্তু সবার সাজা হলো না। অথচ দিনদুপুরে সবার সামনেই বাবাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হলো। তাই এ রায়ে আমরা খুশি নই। উচ্চ আদালতে আপিল করব। সেখানে আবার মামলার নথিপত্র গায়েব হয়ে যায় কিনা তা নিয়ে আমাদের শঙ্কা রয়েছে।
সময়ের আলো/আরএস/