মুসলমান হিসেবে ফরজ আমলের বাইরেও অনেক নফল আমল করতে হয়। নফলের রয়েছে অফুরন্ত সওয়াব। কিছু মানুষ কোনো ভালো কাজ শুরু করেন খুব আগ্রহ-উদ্দীপনার সঙ্গে, কিন্তু কিছুদিন পর তা আর অব্যাহত রাখতে পারেন না। এ জন্য ইসলাম যেকোনো কাজ নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে করতে বলে। এলোমেলো কোনো কাজ বিশেষ সুফল দেয় না। এ জন্য ইসলামে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একটি নির্দিষ্ট সময়সূচিতে বিন্যস্ত করেছে। শুধু নামাজই নয়, প্রতিটি ইবাদতের রয়েছে সুবিন্যস্ত নিয়ম ও রুটিন।
অনুরূপভাবে যেকোনো কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি আমলই নিয়মিত করা চাই; অল্প হোক তবু তাতে ধারাবাহিকতা রক্ষার সওয়াব ও ফজিলত অনেক বেশি। কিছু মানুষ সপ্তাহে এক দিন মসজিদে আসেন, মাঝে মাঝে দুয়েক ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, অনেকে এক রাতে ১২ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে, তারপর খবর থাকে না; খণ্ড খণ্ড এসব ইবাদত ও আমলের সওয়াব তো অবশ্যই পরকালে সঞ্চিত হবে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কছে এর বিশেষ মূল্য নেই। এভাবে সপ্তাহে এক দিন নামাজ পড়ায় কোনো ফজিলত নেই। আবার এক দিনে কয়েক দিনের আমল করে গাফেল হয়ে যাওয়ার মধ্যেও ফজিলত নেই। এক দিন ১২ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে এক সপ্তাহ ঘুমানোর মধ্যে ফজিলত নেই। বরং কম ইবাদত ধারাহিকভাবে আদায় করার মধ্যে হচ্ছে প্রকৃত ফজিলত।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘তোমরা সে নারীর মতো হয়ো না, যে তার পাকানো সুতো শক্ত করে পাকানোর পর টুকরো টুকরো করে ফেলে’ (সুরা নাহল : ৯২)। অর্থাৎ কোনো একটি কাজ করে তা বিনষ্ট করে দেওয়া ঠিক নয়। এমনিভাবে কোনো নেক আমল শুরু করে তা পরিহার করাও অনুচিত। যে নেক আমলই শুরু করা হবে তা যেন ধরে রাখা হয়। ইবাদতটা যেন নিয়মতান্ত্রিক হয়। ধারাবাহিক হয়।
কোনো ইবাদত নিয়মতান্ত্রিকভাবে করার ফজিলত সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন-‘শ্রেষ্ঠ নেক আমল সেটাই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা সংখ্যায় অল্প হয়’ (ইবনে মাজা : ৪২৪০)। অন্য এক সাহাবিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আবদুল্লাহ! তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না, যে রাতে নামাজ পড়ত, কিন্তু পরে রাতে নামাজ পড়া ছেড়ে দিয়েছে’
(বুখারি : ২৫২)। রাসুল (সা.) আমলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কখনো কখনো নফল নামাজেরও কাজা পড়েছেন। সুন্নত নামাজও ছুটে গেলে দ্বিতীয়বার আদায় করেছেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যদি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কোনো রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করতে না পারতেন, তখন তিনি পর দিন ১২ রাকাত নামাজ আদায় করে নিতেন’ (মুসলিম সূত্রে রিয়াদুস সালেহিন : ১১৮১)। অথচ তাহাজ্জুদ ফরজ ছিল না। ওয়াজিবও ছিল না। তবু পরদিন তা কাজা করে নিতেন। শুধু আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। নিয়মানুবর্তিতা ধরে রাখতে।
নবীজি (সা.) নিজেই নিয়মিত আমলের প্রতি যত্নবান ছিলেন এমন নয়, সাহাবিদেরও উদ্বুদ্ধ করতেন, যেন তারা কোনো নফল ইবাদত ছুটে গেলে সেটা পরে আদায় করে নেন। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে তার জিকির-পাঠ না করে ঘুমিয়েছে, অথবা আদায় করেছে তবে কিছু বাকি রয়েছে অতঃপর তা ফজর ও জোহরের মধ্যবর্তী সময়ে পড়ে নেয়, তার জন্য রাতে পাঠের সওয়াব দেওয়া হয়’ (মুসলিম)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.) এক দিন আমার কাছে এসে দেখেন, এক মহিলা আমার কাছে বসা। তারপর নবীজি (সা.) বললেন, সে কে আয়েশা? আয়েশা (রা.) বললেন, ‘অমুক মহিলা, যে প্রচুর নামাজ পড়ে।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘থামো! তোমরা সাধ্যমতো আমল করো। আল্লাহর কসম! আল্লাহ ক্লান্ত হন না, যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ো। আর আল্লাহর কাছে ওই আমল বেশি প্রিয়, যা আমলকারী ধারাবাহিকভাবে করে যেতে থাকে’ (বুখারি : ১১২২; মুসলিম : ৭৪১; নাসায়ি : ৭৬২)। হাদিসে ‘আল্লাহ ক্লান্ত হন না’-এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে-বান্দা যতক্ষণ আমল করতে থাকে আল্লাহও ততক্ষণ তার আমলনামায় সওয়াব দিতে থাকেন। ধারাবাহিক কোনো আমল করার কারণে বান্দার মধ্যে যদি কখনো অবসাদ চলেও আসে, তবু আল্লাহ সওয়াব দিতে থাকেন। তাই বান্দার কর্তব্য হচ্ছে কোনো আমল একবারে খুব বেশি না করে অল্প অল্প করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা। সুতরাং, আমল কম হোক; কিন্তু নিয়মিত যেন হয়, ধারাবাহিকতা যেন রক্ষিত হয়, তবেই আমাদের ইবাদত ও আমল আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় হবে। ইবাদতে স্বাদ আসবে। আমলে তৃপ্তি আসবে।
ধারাবাহিক আমল করে যাওয়ার উপকারিতা অনেক। এর মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা অর্জন করা যায়। ধারাবাহিক আমলে আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি একজন মুমিনের পরম পাওয়া। হাদিসে কুদসিতে আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। একপর্যায়ে আমি তাকে এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)। বছরের শুরুর এই সময়টিতে আমরা নিয়ত করে নিতে পারি, অন্তত একটি ভালো কাজ প্রতিদিন নিয়মিত আদায় করব। এর মাধ্যমে অর্জন হবে অফুরন্ত পুরস্কার। জীবন হবে সমৃদ্ধ।
সময়ের আলো/আরএস/