পৃথিবীর কোনো মানুষই অন্য মানুষের মতো নয়। মানুষের চিন্তা-অনুভূতি, আবেগ-জীবনবোধ সম্পূর্ণই ভিন্ন ভিন্ন। তাই মতভেদ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। ইসলামেও মতভেদকে স্বীকার করা হয়েছে। তবে ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কে যাদের সঠিক ধারণা নেই তারা মতভেদ শব্দটি শোনামাত্র ভ্রুকুঞ্চিত করেন। বিশেষত নামাজ সংক্রান্ত বিষয়ে মতভেদ যেন তাদের কাছে একেবারেই অসহনীয়।
জেনে রাখা উচিত মতানৈক্য মাত্রই পরিত্যাজ্য নয়। কেননা কিছু মতভেদ আছে যা সৃষ্টি হয় দলিল থেকে, দলিলই যার উৎস। আর কিছু মতভেদ সৃষ্টি হয় মূর্খতা ও হঠকারিতা থেকে। ইসলামে প্রথম মতভেদটা স্বীকৃত আর দ্বিতীয়টা নিন্দিত। তবে ইসলামের মৌলিক আকিদা ও অকাট্য বিষয়ে মতভেদের কোনো সুযোগ নেই। হ্যাঁ, দ্বীনের শাখাগত বিষয়ে দলিলভিত্তিক মতভেদ হতে পারে।
মতভেদ নবীজি (সা.), সাহাবি, তাবেয়িদের যুগেও ছিল এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এই মতভেদের বিষয়ে শরিয়তের বিধান হলো-তা বিলুপ্ত করার চেষ্টা করা ভুল। একে বিবাদের মাধ্যম বানানো অপরাধ। এ শ্রেণির মতভেদ প্রকৃতপক্ষে গন্তব্যে পৌঁছার বিভিন্ন মাধ্যম। সিরাতে মুস্তাকিমের বিভিন্ন পথরেখা রয়েছে। এগুলোর কোনোটাকে প্রত্যাখ্যান করা কিংবা অনুসরণের অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ। হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) খন্দক যুদ্ধের দিন ঘোষণা করলেন, ‘কেউ যেন বনু কুরাইজা পৌঁছার আগে সালাত আদায় না করে। পথিমধ্যে আসরের সময় হয়ে গেলে এক দল সাহাবি নামাজ আদায় করে নিল এবং অপর দল নামাজ থেকে বিরত রইল। দ্বিতীয় দলের যুক্তি ছিল রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ। আর প্রথম দল নির্দেশ দ্বারা ‘বিলম্ব না করে দ্রুত পৌঁছার’ উদ্যোগ নিয়েছে। এ ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো দলকে তিরস্কার করেননি।’ (বুখারি : ৪১১৯)
মনে রাখতে হবে দলিলবিহীন, মূর্খতাপ্রসূত মতভেদ নিন্দিত। দ্বীনের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়াদি এবং ইমামদের সর্বসম্মত ঐকমত্য বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ এই নিন্দিত মতভেদেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে এটি মতভেদ নয়, বরং দলিলের বিরোধিতা। এই বিরোধী ব্যক্তি সিরাতে মুস্তাকিম তথা সরল পথ থেকে বিচ্যুত। তার গন্তব্য ও একজন ন্যায়নিষ্ঠ মুমিনের গন্তব্য এক নয়। সে তো এক ভিন্ন লক্ষ্যের অভিযাত্রী, যার পরিচয় হলো, ‘যে বিচ্ছিন্ন হলো সে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাহান্নামের পথে গেল’ (তিরমিজি : ২১)। বলা বাহুল্য, সিরাতে মুস্তাকিমের অন্তর্গত বিভিন্ন পথ এবং সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত বিভিন্ন পথের হুকুম এক নয়। এ কারণেই সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ইমাম ও আলেমদের মাঝে শাখাগত মতপার্থক্য হলেও বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার কোনো আলামত পরিলক্ষিত হয়নি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের তরিকাকে বিভেদ ও বেদাত থেকে বাঁচার মানদণ্ড বলে ঘোষণা করেছেন, অথচ দ্বীনের শাখাগত বিষয়ে তাদের মাঝেও মতপার্থক্য হয়েছে। কিন্তু এ বিভেদের কারণে তাদের মাঝে বিবাদ সৃষ্টি হয়নি, প্রীতি ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়নি। তাদের হৃদয় ছিল অভিন্ন। ওই মতানৈক্য তাদের সামগ্রিক জীবনে কোনো প্রকারের অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেনি। আসলে দলিলভিত্তিক মতপার্থক্য বিভেদ বা বিচ্ছিন্নতা নয়। হ্যাঁ, কেউ যদি ওই শাখাগত মতভেদকে বিবাদের উপলক্ষ বানায় তা হলে সেটা তার অজ্ঞতা, যা সংশোধন করা জরুরি। আল্লাহ আমাদের বোঝার তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/আরএস/