আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন, গত ৭ জনুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে কিছু কিছু জায়গায় বিতর্ক থাকলেও নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে হয়েছে। যতটুকু বিতর্ক হয়েছে সেটাও কতিপয় উৎসাহী কর্মকর্তাদের কারণে। কেননা কর্মকর্তাদের এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া ছিল না। নির্বাচন পরবর্তী সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমরা সক্ষম। যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই কাজ করছেন। আশা করি আমরা এগুলো সুন্দরভাবে মোকাবিলা করতে পারবো।
মঙ্গলবার দৈনিক সময়ের কার্যালয়ে এসে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি সময়ের আলোর কার্যালয়ের প্রত্যেকটি বিভাগ ঘুরে ঘুরে দেখেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সময়ের আলোর প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ্, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কমলেশ রায়, নগর সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, হেড অব নিউজ আলমগীর হোসেন, ভারপ্রাপ্ত চিফ রিপোর্টার এমএকে জিলানী, সহকারী সম্পাদক আলমগীর রেজা চৌধুরী, হেড অব মার্কেটিং কামরুল হাছান, সার্কুলেশন ম্যানেজার মোকাদ্দেস হোসাইন, নিজস্ব প্রতিবেদক সমীরণ রায়, সময়ের আলোর রাজশাহী ব্যুরো প্রধান শফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টরা।
আলাপকালে আওয়ামী লীগের এই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, কিছু কিছু জায়গায় নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি নেতাকর্মী চেয়েছে, নির্বাচনে যাতে কোনো মারামারি বা সংঘাত না হয়।
খায়রুজ্জামান বলেন, নির্বাচনকে যেন কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, তার জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি দলীয় প্রার্থীদের নৌকায় মনোনয়ন দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে কেউ চাইলে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন। তার এই বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এ কারণে নির্বাচন উৎসবমুখর হয়েছে। যদিও দলের তৃণমূল পর্যায়ে কিছুটা বিভক্তি দেখা দিয়েছে। তাই এটা কন্ট্রোল করতে হবে। নির্বাচনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ছিলেন। এরা সবাই আওয়ামী লীগের। হয়তো যারা প্রার্থী ছিলেন তারা মিলে যাবেন। কিন্তু এ প্রার্থীদের সমর্থকরা মিলে যাওয়াটা সময় সাপেক্ষ। তবে স্বশরীরে সবাইকে নিয়ে বসলে হয়তো একটা সমাধান বের করা যাবে। কারণ সামনাসামনি বসলে রাগ কমে যায়। আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায়ে এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে। কারণ এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, নির্বাচন হয়ে গেছে। কেউ হেরেছেন, কেউ জিতেছেন। এটা নিয়ে আর কোন সংঘাত চাই না। তবে এবার নির্বাচনে কোথাও কেউ ভোট দিতে পারেনি, এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বলেন, আমি যখন প্রথম দফায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হয়েছিলাম, তখন কাজ করতে গিয়ে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। যখন রাস্তা প্রশস্ত করতে গিয়েছি, কেউ কেউ বাধাঁ দিয়েছেন। মামলা করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় মেয়র হওয়ার পরে যখন রাস্তাগুলো কাজ শেষ করেছি, তখন তারাই বলেছেন, বাড়ি ভাড়া বেড়েছে। জায়গার দাম বেড়েছে। যে জায়গার কাঁঠা প্রতি দাম ছিল ৫ লাখ টাকা, সেটি এখন ৩০ লাখ টাকা। এখন অনেকেই বলে আমার জায়গাটা একোয়ার করে নেন। কারণ আগে জমির দাম মৌজা হিসেবে দেড় গুণ ছিল। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটি তিন গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাহস নিয়েই করেছি বলেই আজকে রাজশাহী শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সুন্দর শহর। এই কাজগুলো করার ক্ষেত্রে একটু সাহসী ভূমিকা রাখতে হয়। আমি মসজিদের কমিটি, ওয়ার্ড কমিটি ও কাউন্সিলরদের সঙ্গে বসে কথা বলে কম্প্রোমাইজ করেছি। যার ফলে এই কাজগুলো করতে পেরেছি। এখন অনেকে বিনা পয়সায় জায়গা দিতে চায়।
ইউটিলিটি সার্ভিস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যখন ঢাকায় মেয়র ছিলেন মোহাম্মদ হানিফ ও চট্টগ্রামের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তখন তারা দাবি করেছিলেন, নগর সরকার চাই। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে নগর সরকার আছে। এতে ইউটিলিটি সার্ভিসের বিষয়টি নগর সরকারের মধ্যে চলে আসে। এমনকি নগরের পুলিশও আলাদা থাকে। আমাদের এখানে করলেও সুবিধা হতো। কখনো ওয়াসা কখনো, কখনো রাজউক, কখনো ডিপিডিসি কাজ করে। এতে করে সমন্বয় হীনতা দেখা দেয়। কাজের গতি কমে আসে। তাই এসব সিটি কর্পোরেশনের আওতায় থাকলে সমন্বয় হীনতা দেখা দেয় না। যদিও আমি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের সঙ্গে তিন থেকে চার মাস পর পর সমন্বয় সভা করি। ফলে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনকে সুন্দর করে সাজাতে পেরেছি।

রাজশাহীর কৃষি ব্যাংক সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন কৃষি ব্যাংকের পুরো কার্যক্রম উত্তরবঙ্গ ঘিরে। এসব এলাকায় ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপারে মানুষ উৎসাহী। কেউ মসলা চাষ করছেন। কেউ কমলার চাষ করছেন। কেউ বাগান করছেন। এগুলো ভালো হচ্ছে। রাজশাহীতে শিল্পায়ন নেই। কিন্তু কৃষি ক্ষেত্রে ভালো করছে। ভালো ধান হচ্ছে। বছরে তিন থেকে চারটি ফসল হচ্ছে একটি জমিতে। তবে ব্যাংকগুলো বিশেষ কোল্ড স্টোরেজের জন্য লোন দিচ্ছে না। এতে করে পেঁয়াজসহ পচনশীল পন্য রাখা যায় না। কোল্ড স্টোরেজ থাকলে পচনশীল পন্যগুলো সংরক্ষণ করা যেত। এটা কেন দিচ্ছে না আমি বুঝতে পারছি না।
মেয়র বলেন, দক্ষিণ অঞ্চল এখন উন্নয়নের নয়া দিগন্ত। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রংপুর ও রাজশাহীর দিকে আরেকটু উন্নয়ন করা দরকার। কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল করা দরকার। কৃষি যন্ত্রপাতি রাজশাহী ও বগুড়ায় তৈরি হলে আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো না। এ জন্য ঋণ দেওয়া হলে আরও ভালো হয়। এছাড়া কৃষকদের উৎসাহ দিতেও স্বল্প সুদে অর্থাৎ ২% সুদে ঋণ দেওয়া উচিত।
রাজশাহীর চিনিকল সম্পর্কে তিনি বলেন, রাজশাহীর চিনিকলের অবস্থা বেহাল দশা। কৃষক এখন আর আখ চাষ করতে চায় না। কারণ তাদের যে টাকা দেওয়া হয় স্লিপে, সেই টাকা পেতে পেতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই তারা আখ চাষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাছাড়া আখের ফলনও কম হয়। রাজশাহী চিনিকলে প্রাই ২৬ থেকে ৩০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়।
পদ্মার চরকে কাজে লাগানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পদ্মারচর কাজে লাগানোর জন্য গতকাল মঙ্গলবার আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়ে এসেছি। এখানে প্রায় ৮০০ একর জায়গা আছে। আমি সেখানে সোলার প্ল্যান করার চিন্তা করছি। এতে ৬০০ একর জমি প্রয়োজন। বাকি ২০০ একরের মধ্যে সুইমিং পুল, বিনোদনপ্রেমীদের জন্য পার্কসহ আরো অনেক কিছু করতে চেয়েছি।
কর্মসংস্থান বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি লোককে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। আমারও লক্ষ্য সেটি, যাতে তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়। ইতিমধ্যে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য ব্যবস্থা করেছি। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। যাতে তরুণ সমাজ আউটসোর্সিং করেও আয় করতে পারেন। এখানে চার্জ রাখা হয়েছে নামকোয়াস্তে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকায় যেভাবে ডেঙ্গু হানা দিয়েছিল। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের তেমনটি ছিল না। তারপরেও জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে আমরা সবকিছু করেছি। জুমা বারে ইমাম সাহেবদের দিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে বয়ান দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। তবে এখন পর্যন্ত যতটুকু হয়েছে, আমি তাতে সন্তুষ্ট নয়। আরো অনেক কাজ করতে হবে। রাজশাহী শহরে মূল পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কাজ হয়, রাতে হয়। কিন্তু দেশের মানুষের একটা চরিত্র আছে, সকাল ১০টার পর মানুষ অপরিষ্কার করে ফেলেন। এখানে জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, রাজশাহীতে ভারত থেকে ফেন্সিডিল আসে। এতে তরুণরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিজিবি-বিএসএফের একাধিক বৈঠকে এসব নিয়ে কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা বন্ধ হচ্ছে না। এর সঙ্গে জড়িত স্থানীয় পঞ্চায়েত ও মেম্বাররা। এটি বন্ধ হওয়া উচিত।
সময়ের আলো/জেডআই