গত দুই বছরে নানা অজুহাতে লাগামহীনভাবে বেড়েছে ওষুধের দাম। এর মধ্যে ২০২২ সালে দুই দফায় প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাস্টিক, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ওষুধের দাম ১৩ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ওষুধের এই দাম বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ওষুধ। এ অবস্থায় নতুন বছরে আবারও অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ওষুধের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির নেতারা।
এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে একটি বৈঠকও করেছেন তারা। বৈঠকে নেতারা দাবি করেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া ডলার সংকট, এলসি জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ওষুধের দামের সমন্বয় প্রয়োজন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকারের ফর্মুলার বাইরে যেসব ওষুধ রয়েছে, সেগুলোর কোনটার দাম কত হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। যেকোনো সময় ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর বা সরকার নতুন দাম ঘোষণা করবে। তবে কোন কোন ওষুধের দাম বাড়ছে, তা জানানো হয়নি। অন্যদিকে দাম বৃদ্ধির এই চাপ থাকলেও বৈঠকের বিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানিয়েছেন ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর। মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। শুধু আমরা আমাদের সমস্যাগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরেছি।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বৃহৎ এই শিল্পের ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। ফলে ডলারের চড়া মূল্যের কারণে ব্যবসায়ীরা কিছুটা সংকটের মধ্যে রয়েছে। তাই ওষুধের দাম বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে। অন্যথায় ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হবে। এভাবে তো ব্যবসা চলতে পারে না। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি এসেনশিয়াল ড্রাগের (জীবনরক্ষাকারী ওষুধ) ২৭ হাজারেরও বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ওষুধ রয়েছে ২১৯টি। তার মধ্যে ১১৭টি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার। অন্য সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। অথচ একসময় দুশরও বেশি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে দিতো সরকার। কিন্তু সে সংখ্যা এখন কমে গেছে।
অধিদফতরের তথ্যমতে ২০২২ সালে দ্ইু দফা বাড়ানো হয় বিভিন্ন ওষুধের দাম। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বহুল ব্যবহৃত ২০টি জেনেরিকের ৫৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়। তার মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার প্যারাসিটামলের দাম ৫০ থেকে শতভাগ বাড়ানো হয়। আর ৪০ টাকার অ্যামোক্সিসিলিনের দাম বাড়িয়ে করা হয় ৭০ টাকা এবং ২৪ টাকার ইনজেকশনের দাম ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়াও মেট্রোনিডাজল, এমোক্সিলিন, ডায়াজিপাম, ফেনোবারবিটাল, এসপিরিন, ফেনোক্সিমিথাইল পেনিসিলিন, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের জেনেরিকের ওষুধ দাম বাড়ানো হয় ১৩ থেকে ৭৫ শতাংশ।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত দরের চেয়ে বাজারে অনেক ওষুধ বেশি দামেও কেনাবেচা চলছে। বিশেষ করে জেনেরিকের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের তালিকা না বাড়ার সুযোগ নিয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নিয়ন্ত্রণ করে। আগে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি হলে অন্তত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে মানুষকে জানানোর নিয়ম ছিল। কিন্তু এখন কোম্পানিগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হয়।
এই অবস্থায় আবারও ওষুধের দাম বাড়ানো হলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষ বড় সংকটে পড়বে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দাম লাগামহীন হওয়ায় সাধারণ মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে রোগীর খরচ হয় ৬৯ শতাংশ। ওষুধের দাম বৃদ্ধির কারণে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ওষুধ কেনার সামর্থ্য অনেকে হারাচ্ছেন।
ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির সময়ের আলোকে বলেন, আমরা আমাদের সার্বিক সমস্যাগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরেছি এবং বলেছি সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার খরচও বেড়ে গেছে। তাই ওষুধের দামেরও সমন্বয় প্রয়োজন। এখন দাম বাড়বে কি না কোনো কিছুই সিদ্ধান্ত হয়নি, সবকিছুই সরকারের ওপর নির্ভর করছে।
ওষুধের দাম বাড়ার যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় ডলারের মূল্য ছিল ৮৬ টাকা। এখন ডলারের দাম বেড়ে অফিসিয়ালি ১১০ থেকে ১১১ টাকা হয়েছে। আমরা ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করতে ১১৯ থেকে ১২০ টাকায় ডলার কিনছি। স্বাভাবিকভাবেই ওষুধের কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ব্যয়, প্যাকেজিং মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই পর্যায়ক্রমে ওষুধের দামও বিন্যস্ত করার চিন্তা করছি আমরা।
অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ানোর বিষয়ে ডলারের উচ্চমূল্যকেই দায়ী করে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, এলসি জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয়সহ সার্বিকভাবে সব কিছুর খরচ বেড়েছে। ফলে ওষুধের বাজারেও এক ধরনের প্রভাব পড়েছে। আমরাও আসলে এক ধরনের অসহায় অবস্থায় আছি। এখন ওষুধের দাম না বাড়ালে প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়বে। এখনও দাম বাড়ানোর বিষয়ে কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। তবে দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
আবারও ওষুধের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ সময়ের আলোকে বলেন, গত কয়েক বছরে মানুষের আয় বাড়েনি বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ওষুধসহ রোগ শনাক্তের খরচের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বেড়েছে। অনেকেই ওষুধ কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যদি ওষুধের দামও আবার বাড়ে, সাধারণ মানুষের কষ্টের সীমা থাকবে না। মূল্য নিয়ন্ত্রণে করণীয় তুলে ধরে তিনি বলেন, সবার আগে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির সিস্টেমে হাত দিতে হবে। সরকার ওষুধের দাম না বাড়িয়েও অন্যভাবে ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। এ ছাড়া দেশের সব জেনেরিকের ওষুধ যদি ফর্মুলার আওতায় নিয়ে আসা যায়, তা হলেও দাম কমে যাবে। মার্কেটিংয়ের নামে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, সেটাও বন্ধ হবে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. নূরুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, ওষুধের দাম বাড়ানোর বিষয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। আর আমাদের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। দাম বাড়াতে হলে কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। কেউ যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে তখন যাচাই-বাছাই করে দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কেউ আবেদন করেননি।
সময়ের আলো/আরএস/