রিচার্জের টাকা যায় কোথায়

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

বেসরকারি চাকরিজীবী মো. নুরুল আমিন (৫০) শুরু থেকেই তিনি গ্রামীণফোনের একজন গ্রাহক। বাড়তি ঝামেলা মনে করে কখনো প্যাকেজ কিংবা অফার

2024-01-25T07:05:51+00:00
2024-01-25T07:05:51+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
রিচার্জের টাকা যায় কোথায়
প্যাকেজের ফাঁদে মোবাইল গ্রাহকরা
শাকিল আহমেদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৪, ৭:০৫ এএম 
রিচার্জের টাকা যায় কোথায়
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. নুরুল আমিন (৫০) শুরু থেকেই তিনি গ্রামীণফোনের একজন গ্রাহক। বাড়তি ঝামেলা মনে করে কখনো প্যাকেজ কিংবা অফার দেখে মোবাইল রিচার্জ করেন না তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করেন নিজের বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে। ইন্টারনেটে কথা বলায় মোবাইলে খরচও কম হয় তার। এ জন্য গ্রামীণফোনে ৪৯ টাকায় এক সেকেন্ড পালসের একটি ছোট প্যাকেজ কিনতেন তিনি। সককিছু ঠিকঠাক চলছিল। একবার রিচার্জ করলে বেশ কিছু দিন চলে যেত। কোনো মেয়াদের ঝামেলা ছিল না। তবে কয়েক দিন আগে ৪৯ টাকা রিচার্জ করে নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হন তিনি। 

সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আগে ৪৯ টাকা রিচার্জ করলে অনেক দিন ব্যবহার করতে পারতাম। কোনো মেয়াদ ছিলো না। আর গত দুবার আমি ৪৯ টাকা রিচার্জ করলে তিনদিন পর অব্যবহৃত টাকা কেটে নিয়ে যায়। সবশেষ একবার রিচার্জ করে তিনটা কল করতে পেরেছি। এরপর ভাইকে ফোন করতে গিয়ে দেখি ফোনে টাকা নেই। আমাকে বলছে এমারজেন্সি ব্যালেন্সের জন্য ডায়েল করুন। দুইবারই আমার সঙ্গে এমন হয়েছে।

তিনি বলেন, জিপি যদি কোনো নতুন নিয়ম করে বা প্যাকেজের পরিবর্তন আনে সেটিও তো আমাদের জানাবে। কিন্তু কোনো নোটিস ছাড়া নিজেদের ইচ্ছে মতো টাকা কেটে নিচ্ছে- এটা তো হতে পারে না। গ্রামীনফোনের এই সেবা নিয়ে আমি খুবই বিরক্ত।

মো. আলমগীর নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, ফোন কোম্পানিগুলো এত এত প্যাকেজ ও অফার দেয় যে যা মনে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিদিন ফোনে অনেক অফার আসে। কখনো অফার থেকে আবার কখনো মাইজিপি অ্যাপস থেকে কিংবা ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকান থেকে আমি টকটাইম কিনি। কেনার পার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আবার নতুন অফারের ম্যাসেজ আসে। সেটি কিনলে আগেরটি আর যোগ হয় না। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা চচ্ছে মেয়াদ কবে শেষ সেটি তো মনে রাখা যায় না। ফলে সব মিনিট ব্যবহার করার আগেই কেটে নিয়ে যায়। অভিযোগ জানাতে গেলে আবারো টাকা গুনতে হয়। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর অফার ও প্যাকেজ বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমার টাকায় কেনা মিনিট ও ইন্টারনেট আমি ইচ্ছেমতো ব্যবহার করার স্বাধীনতা চাই। 

শুধু নুরুল আমিন কিংবা আলমগীরই নন, মোবাইলফোন অপারেটরদের একাধিক প্যাকেজ ও লোভনীয় অফার নিয়ে গোলক ধাধায় পড়ছে গ্রাহকরা। ব্যবহারের আগেই কেটে নেওয়া হচ্ছে অব্যবহৃত ইন্টারনেট ও টকটাইম। গ্রাহকদের সঙ্গে অপারেটরদের এমন ছলচাতুরিকে অনেকটা পকেটমারের মতো আচরণ বলে মনে করছে গ্রাহক স্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। 

তাদের অভিযোগ, সবকিছু জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেয় না টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি)।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, গ্রাহকদের অব্যবহৃত ডাটা ও টকটাইম কেটে নেওয়ার অভিযোগ অনেক দিনের। প্রতিদিনই গ্রাহকরা আমাদের কাছে এ ধরনের অভিযোগ করছে; কিন্তু কোনো সমাধান হচ্ছে না। আগে সর্বনিম্ন রিচার্জ ছিল ১০ টাকা সেটি ২০২২ সালে করা হলো ২০ টাকা। এরপর সম্প্রতি গ্রামীণফোন সর্বনিম্ন রিচার্জ ৩০ টাকা করতে চাইলে সবমহলের চাপের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসে। 

তিনি আরও বলেন, আগে ৫০ টাকা রিচার্জ করলে আনলিমিটেড কথা বলা যেত। এখন সেখানেও ব্যারিয়ার (প্রতিবন্ধকতা) দিচ্ছে অপারেটরগুলো। নির্দিষ্ট মেয়াদের পর আর কথা বলা যায় না। তারা গ্রাহকের অজান্তেই টাকা কেটে নেয়। তারা গ্রাহকের সঙ্গে পকেটমারের মতো ব্যবহার করছে। যেন দেখার কেউ নেই।বিটিআরসির দুর্বলতার কারণেই তারা গ্রাহকদের সঙ্গে এমনটি করতে পারছে।

তবে গ্রাহকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খলিল-উর-রহমানকে ফোন করলে তিনি ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

তিনি বলেন, অপরিচিত কারও সঙ্গে এ বিষয়ে ফোনে কথা বলা ঠিক হবে না। একটা নিউজ কালেকশনের জন্য কিছু ম্যানার, এথিকস আছে, আমার তো মনে হয় না এভাবে অপরিচিত কোনো একজনের ফোন করে নিউজ কালেক্টড করার কোনো এথিক্স, ম্যানার বা রুলস আছে। আপনি কাল আসেন, সাক্ষাতে কথা বলি।
এসব বিষয়ে কথা বলতে মোবাইল অপারেটরদের জাতীয় ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন অ্যামটবের (অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকারকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট অপারেটরের কাছে অভিযোগ দিতে বলেন। এর সমাধান আমি দিতে পারব না। এর আগে মোবাইল ডাটা প্যাকেজের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর নির্দেশিকা জারি করেছিল বিটিআরসি। অব্যবহৃত ডাটা যুক্ত হওয়া বা ডাটা ক্যারি ফরওয়ার্ডের নিয়ম থাকলে একাধিক অফার আর প্যাকেজের ফাঁদে পড়ে সবকিছু গুলিয়ে ফেলছে গ্রাহকরা। তাই প্যাকেজ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সংস্থাটি। সে সময় তিন দিনের ডাটা প্যাকেজ তুলে দেওয়া হয় এবং ৯৫টি প্যাকেজ বাদ দিয়ে ৪০টিতে নিয়ে আসা হয়। 

ওই সময় বিটিআরসির কল সেন্টারে (১০০) গ্রাহকদের অভিযোগ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এমএনও (মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর) অনুযায়ী ‘ডাটা প্যাকেজ’ ও ‘ভলিউম’ সংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে রবি-এয়ারটেলের বিরুদ্ধে। অপারেটরটির বিরুদ্ধে ১৭৬টি অর্থাৎ ৪৮.৪ শতাংশ অভিযোগ করেছে গ্রাহকরা। এ ছাড়া জিপির বিরুদ্ধে ১২৯টি, বাংলালিংক-৪১টি ও টেলিটকের বিরুদ্ধে ১৫টি অভিযোগ করেছে গ্রাহকরা। ‘ডাটা সম্পর্কিত’ অভিযোগের মধ্যে গত মার্চে ৩৯৪টি, এপ্রিলে ২২৬টি, মে মাসে ২৬৬টি, জুন মাসে ২৮২, জুলাই মাসে ২৪৬টি ও আগস্ট মাসে ২৫৩টি অভিযোগ করেছে গ্রাহকরা। ‘প্যাকেজ ভলিউম’ এবং ‘ট্যারিফ’ সম্পর্কিত অভিযোগের মধ্যে মার্চে ৬৪টি, এপ্রিলে ৫৩টি, মেতে ৬৪টি, জুনে ৫৪টি, জুলাইতে ৬৮টি এবং আগস্টে ৫৮টি অভিযোগ করেছিল গ্রাহকরা। এসব অভিযোগের মধ্যে অফার অমিল হয়েছে ৩৫ শতাংশ, ব্যালেন্স ডিডাকশন ও প্যাকেজ অ্যাক্টিভিশন ২৩ শতাংশ, মেয়াদ মেলেনি ১৩ শতাংশ, ডাটা ল্যাপস ৭ শতাংশ, নেটওয়ার্ক কোয়ালিটি ও ডাটা স্পিড ৭ শতাংশ, ডাটা প্রাইজ, ভলিউম, মাউগ্রেশন ৮ শতাংশ ও অন্যান্য ৮ শতাংশ। 
সে সময় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এরপর অব্যবহৃত টকটাইম বা মিনিট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমরা একটা নীতিমালা করে দেব। যাতে কোনো গ্রাহক হয়রানি না হয়। তবে সেটি এখন বাস্তবায়ন হয়নি।

বিটিআরসির ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে চার অপারেটর মিলে দেশে মোট মোবাইল গ্রাহক রয়েছে ১৯০.৮১ মিলিয়ন। এর মধ্যে ৮২.২০ মিলিয়ন গ্রাহক নিয়ে সবার ওপরে রয়েছে গ্রামীণফোন। এরপর রবি অজিয়াটা ৫৮.৬৭ মিলিয়ন, বাংলালিংক ৪৩.৪৮ মিলিয়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটকের ৬.৪৬ মিলিয়ন গ্রাহক রয়েছে। এ ছাড়া দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে ১৩১.৩৭ মিলিয়ন।


সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: