ইসলামে সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব

উসমান বিন আবদুুল আলিম

ইসলামের আলো

মানুষ সামাজিক জীব। ইসলামে সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজে মানুষ তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গ্রাম-মহল্লার লোকজনের

2024-02-01T00:44:13+00:00
2024-02-01T00:44:13+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
ইসলামে সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব
উসমান বিন আবদুুল আলিম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১২:৪৪ এএম   (ভিজিট : ৩০৩৬)
ইসলামে সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব
মানুষ সামাজিক জীব। ইসলামে সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজে মানুষ তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গ্রাম-মহল্লার লোকজনের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে। তাই সমাজজীবনে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে হলে সমাজের সব ব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়।

সমাজবদ্ধ হয়েই মানুষকে বসবাস করতে হয়। সমাজে একে অপরের সহযোগী হয়ে জীবনের পথ চলতে হয়। তাই সামাজিক জীবনে পারস্পরিক বন্ধন ও সাহায্য-সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম যেমনিভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নফল রোজা, জিকির, তাসবিহ-তাহলিলের মতো ইবাদতে উৎসাহ দিয়েছে, তেমনি সমাজের মানুষের কল্যাণে কাজ করাকেও ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, তোমরা পূর্ব ও পশ্চিমে মুখ ফিরাবে। বরং সৎ কাজ হলো, তোমরা ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, পরকালের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত কিতাব ও নবী-রাসুলগণের ওপর। পাশাপাশি তোমরা সম্পদ ব্যয় করবে তারই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য। আর যারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে এবং যারা 

কৃতপ্রতিজ্ঞা পালনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণকারী; তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই আল্লাহভীরু’ (সুরা বাকারা : ১৭৭)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকি তথা আল্লাহভীরুদের গুণাবলিতে একদিকে যেমন ঈমান ও নামাজের মতো মৌলিক ইবাদতের কথা উল্লেখ করেছেন, তেমনি অন্যদিকে তিনি জাকাত এবং সমাজের অসহায় নিঃস্বদের সাহায্য-সহায়তার মতো সামাজিক কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনও ইবাদত হিসেবে গণ্য।

সমাজজীবনের ভারসাম্য, শৃঙ্খলা, উন্নতি ও অগ্রসরতা অব্যাহত রাখতে পারস্পরিক সৌজন্য, মূল্যবোধ ও শিষ্টাচারের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো জাতিকে সুসভ্য ও সফল রূপে প্রতিষ্ঠিত হতে এর বিকল্প নেই। আমাদের বিদ্যমান অশান্ত সমাজে শান্তি ও স্থিতি আনতে হলে সবাইকে শিষ্টাচারসম্পন্ন হতে হবে। কারণ শিষ্টাচারসম্পন্ন মানুষ কোনো তুচ্ছ বিষয়ে নিজেকে জড়ায় না, কারও সঙ্গে শত্রুতা করে না বা কারও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করে না। শিষ্টাচার হচ্ছে ভদ্র, মার্জিত ও রুচিসম্মত আচরণ। একজন মানুষ ভালো না মন্দ তা বিবেচিত হয় মূলত সে ব্যক্তির আচরণ দেখেই। এ গুণ মানুষকে সংযমী ও বিনয়ী করে তোলে। শিষ্টাচারসম্পন্ন ব্যক্তি তার ভদ্র ও সংযত ব্যবহার দিয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে। এমন মানুষকে সবাই শ্রদ্ধা করে, হোক সে ব্যক্তি অসুন্দর কিংবা গরিব। ইসলামেও আদব শিষ্টাচার ও সৌজন্যকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন।

শিষ্টাচারের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্র, ভালো ব্যবহার ও পরিমিত ব্যয় বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা নবুয়তের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ’ (আবু দাউদ : ৪৭৭৬)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তুমি আদব ও শিষ্টাচার অন্বেষণ করো। কারণ আদব হলো বুদ্ধির পরিপূরক, ব্যক্তিত্বের প্রমাণ, নিঃসঙ্গতায় ঘনিষ্ঠ সহচর, প্রবাসজীবনের সঙ্গী এবং অভাবের সময়ে সম্পদ’ (ইসবাহানি, মুনতাখাব; সাফারিঈনি, গিযাউল আলবাব : ১/৩৬-৩৭)। বিশিষ্ট ফকিহ আহনাফ আল-কায়েস বলেন, ‘আদব বা শিষ্টাচার বিবেকের জ্যোতি, যেমন আগুন দৃষ্টিশক্তির জ্যোতি’ (ফাতাওয়া আল মিসরিয়া : ১০/৩৫৯)।

রুওয়াইম ইবনে আহমাদ আল-বাগদাদী তার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার আমলকে লবণ ভাববে, আর তোমার আদবকে মনে করবে ময়দা’ (ড. আলী আবদুল হামীদ, আত-তাহযিলুদ দিরাসি বিল কাইয়েমিল ইসলামিয়াহ : পৃ. ১৫৪; আল-কুরাফি, আল-ফুরূক : ৩/৯৬)। অর্থাৎ তুমি আমলের চেয়ে আদব ও শিষ্টাচারকে এত অধিক গুরুত্ব দেবে, লবণ ও ময়দার স্বাভাবিক মিশ্রণে উভয়ের অনুপাত যেভাবে কম-বেশি হয়।

পৃথিবীতে যারা মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন, তারা শিষ্টাচার ও মার্জিত ব্যবহারের মাধ্যমেই মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। প্রত্যেক ধর্মে আদব ও শিষ্টাচারের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী (স.) ছিলেন শিষ্টাচারের মূর্তপ্রতীক। উন্নত ব্যবহারের জন্য তিনি ছোট-বড় সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। সংযম, বিনয়, ভদ্রতা তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কখনো তিনি কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি, উদ্ধত আচরণ করেননি। এ কারণেই যুগে যুগে মানুষের কাছে তিনি এত শ্রদ্ধার পাত্র। তবে এ গুণ হঠাৎ করে কারও মধ্যে গড়ে উঠে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্ব। শিষ্টাচারের বীজ মূলত বপন হয় শিশুকালে। আর এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা প্রধান। শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। পরিবারের বড়রা যে রকম ব্যবহার করে শিশুরা তা-ই অনুকরণ করে। বাল্যকালে শিশুদের সংযম, বিনয় ও উন্নত রুচির চর্চা ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে শিষ্টাচার গড়ে তোলে। যে ব্যক্তি শিষ্টাচার অর্জন করতে পারে না, তার মানুষ হয়ে জন্মানোর কোনো সার্থকতা নেই। 

শিষ্টাচারহীন উদ্ধত মানুষ কেবল আকৃতির দিক থেকেই মানুষ, তাদের মনুষ্যত্বের কোনো বিকাশ ঘটে না। ফলে তারা সমাজের চোখে হয়ে থাকে ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গ সদৃশ। সমাজ এদের কোনো মর্যাদায় ভূষিত করে না, কুরুচিপূর্ণ এসব মানুষকে ফেলে রাখে আস্তাকুঁড়ে। সমাজে শিষ্টাচারের অভাব নৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। সমাজজীবন হয়ে উঠে অশান্তিপূর্ণ। নানা কদর্যতা, অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ফলে সমাজে বসবাসকারী মানুষ ভোগে অস্তিত্বের সংকটে। শিষ্টাচারহীনতা একটি দেশ ও জাতির উন্নয়নের অন্তরায়। তাই আসুন শিষ্টাচারসম্পন্ন জীবন গড়ি, আলোকিত সমাজ গড়ি।

সময়ের আলো/আরএস/ 




Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: