সিলেটের চা শ্রমিকদের ভাষা ‘দেশোয়ালি’ দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে। ভাষার মাসে দেশোয়ালির সংরক্ষণ এবং এর ওপর গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আশ্রাফুল করিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিবুল হাসান রিজভী।
দেশোয়ালি ভাষা কী?
‘আমরা জানি যে, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অনেক। এই গোষ্ঠীর বড় একটা অংশ সিলেটের বিভিন্ন চা বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ- এসব জেলার পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছে। বৃহত্তর সিলেটের তিন জেলায় (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ) চা বাগান রয়েছে, আর সবচেয়ে বেশি চা বাগান রয়েছে মৌলভীবাজারে। এসব চা বাগানে অনেক শ্রমিক আছেন যারা আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন। তারা চা বাগানে নিজেদের মধ্যে নিজেদের ভঙ্গিতে কথা বলেন। চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিন এক অঞ্চলে বসবাসের ফলে তাদের ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক বাংলা ভাষার মিশ্রণে এক নতুন ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়। গবেষণা করতে গিয়ে দেখতে পাই স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছে দেশোয়ালি ভাষা।’
দেশোয়ালি ভাষার উৎপত্তি বা ইতিহাস কেমন...?
‘বৃহত্তর সিলেটের চা বাগানগুলোতে কর্মরত চা শ্রমিকরা ১৫০ বছর পূর্বে ভারতের বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ও মাদ্রাজের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছে। প্রথম দিকে এরা যার যার অঞ্চলের যার যার জাতির ভাষা ব্যবহার করত। পরে নিজেদের প্রয়োজনে, স্থানীয়দের সঙ্গে মিশতে গিয়েই এই দেশোয়ালি ভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত হয়। এই দেশোয়ালি ভাষায় অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতো আলাদা লিপি বা বর্ণের ব্যবহার নেই।’
তিনি বলেন, সিলেটে আরেকটি ভাষা রয়েছে ‘লালং’ ভাষা। এই ভাষার ওপরেও আমার গবেষণায় একটি প্রবন্ধ বের হয়েছে। দেশোয়ালি ভাষায় হিন্দি, স্থানীয় বাংলা ও তাদের নিজস্ব ভাষার (যার যার অঞ্চলের) একটি মিশ্রণ পাওয়া যায়। এই ভাষার বর্ণমালা বা লিপি না থাকলেও, মৌখিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
দেশোয়ালি ভাষার সামাজিক অবস্থান কেমন...?
‘চা শ্রমিকদের আর্থসামাজিক বিষয়ের ওপর বিভিন্ন জরিপ, গবেষণা করা হলেও তাদের ভাষার ওপর নজর নেই বললেই চলে। ব্রিটিশদের দেওয়া সম্বোধন হিসেবে স্থানীয়দের কাছে এখনও এই চা শ্রমিকদের কুলি নামে ডাকা হয়। সামাজিকভাবে অবহেলিত হওয়ায় এই শ্রেণির লোকদের ভাষার প্রতি আমাদের নজর নেই।’
দেশোয়ালি ভাষার সঙ্গে বাংলা শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় কেমন...?
গবেষণা করতে গিয়ে দেখতে পাই দীর্ঘদিন থাকার ফলে এই চা শ্রমিকদের দেশোয়ালি ভাষায় বাংলা ভাষার প্রভাব লক্ষণীয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় : ‘হাসো কেন’ মানে বাংলাকে তারা বলে ‘আছিস ক্যানে’, ‘তাড়াতাড়ি কাজ করো’ এইটিকে তারা বলছে ‘জলদি কাম করবেক’, বাবাকে ‘বাপ্প’, মাকে ‘মাআ’, সৎ মাকে ‘সওতমা’, দুলাভাইকে ‘পাহুন’, চাচাকে ‘ককা’, দাদাকে ‘জেজ বপ্পা’ প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়।
দেশোয়ালি ভাষা সংরক্ষণে কী উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে...?
এই চা শ্রমিকরা নানাভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ করে লেখাপড়ায়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চা বাগান এরিয়াতে এক মাইলের মধ্যে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। বর্তমানে এই চা শ্রমিকরা বাংলাদেশেরই নাগরিক। দেশের রফতানিমুখী এই চা শিল্পে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্ব বহন করছে এই চা শ্রমিকরা। চাকমারা তাদের ভাষায় অভিধান রচনা করেছেন যার নাম ‘চাকমা বাংলা অভিধান’, মণিপুরিদের ভাষার ওপরেও গবেষণা হচ্ছে, বই রচিত হচ্ছে, সাঁওতালদের রয়েছে ইংরেজি অভিধান। ঠিক এমন করে দেশোয়ালি ভাষারও অভিধান রচনাসহ শব্দ সম্ভার সংগ্রহের জন্য আমরা উদ্যোগ নিতে পারি। সরকারি কিংবা বেসরকারি যেকোনো সংস্থার উচিত এই দেশোয়ালি ভাষায় গবেষণার জন্য এগিয়ে আসা। এ ছাড়াও এই ভাষা প্রচারের লক্ষ্যে রেডিও, টেলিভিশনে অন্তত প্রতি মাসে একবার হলেও এই ভাষার সাংস্কৃতিক দিকগুলো প্রচার করা উচিত। স্থানীয় প্রশাসনসহ পত্র-পত্রিকার এ বিষয়ে এগিয়ে আশা উচিত। বিলুপ্ত ভাষা রক্ষা করা বিশ্বের তাবৎ দেশের দায়িত্ব। তবে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে এই বাংলাভাষী বাংলাদেশের মানুষের দায়িত্ব একটু বেশি।
দেশোয়ালি ভাষার প্রতি সরকারের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত...?
ইতিমধ্যে সরকার প্রাক-প্রাথমিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের যার যার ভাষায় পাঠদানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় চা উৎপাদন অঞ্চলগুলোয় প্রাক-প্রাথমিকে এই ‘দেশোয়ালি’ ভাষায় পাঠদান শুরু করা উচিত। এতে চা শ্রমিকরা যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে, তা অনেকাংশেই রোধ হবে। তাহলে একদিকে যেমন একটি ভাষা সংরক্ষিত হবে, অপরদিকে যারা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানানোর দায়িত্ব পালন হবে।
সময়ের আলো/জেডআই