শিক্ষকদের কি নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে-দায় কার? এমন প্রশ্ন তুলে তারা বলছেন, একদিকে বাড়ছে শিক্ষার হার ও শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা, অন্যদিকে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়, অশ্লীলতা ও নানা রকমের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। তাই এর দায় সমাজ ও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আর লাগাম ধরা না গেলে এটি শিক্ষাঙ্গনে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং ভবিষ্যতে এর জন্য জাতিকে চরম মাসুল দিতে হতে পারে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চট্টগ্রামে কোচিং সেন্টারে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মাদারীপুরের শিবচরে শিক্ষা সফরের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মদপানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ছাড়াও নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের কাছে ছাত্রী নিপীড়ন, কোচিং-প্রাইভেট না পড়লে নম্বর কমিয়ে দেওয়া, হেনস্থা করা, অনিয়ম-জালিয়াতি এবং প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাসহ নানা অভিযোগ উঠছে।
এসব ঘটনা কেন ঘটছে-এমন প্রশ্নের উত্তরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশেক মাহমুদ সময়ের আলোকে বলেন, ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে যে সম্পর্ক এবং মাতা-পিতার সঙ্গে সন্তানের যে সম্পর্ক তা আর আগের মতো নেই। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে মা-বাবা ও শিক্ষকদের অনেক ভয় করত শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা নেই। এখন সর্বত্রই প্রযুক্তি আধুনিকায়নের একটা প্রভাব পড়েছে। তাতে করে অনেক দূরত্ব বেড়েছে কিন্তু কমানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এখন শিক্ষকদের বলা হয়-ছাত্রকে আর আগের মতো শাসন করা যাবে না। তখন কিন্তু সম্পর্ক আর আগের মতো থাকে না। সুতরাং শাসনের সঙ্গে শ্রদ্ধার একটা সম্পর্ক রয়েছে। তবে রুঢ় শাসন নয়। কারণ শাসনেরও একটা চরিত্র গঠনের বিষয় আছে। এখন আধুনিক সংস্কৃতি হচ্ছে সবাই একসঙ্গে এনজয় ও বিনোদন করবে। মাতা-পিতা কিংবা শিক্ষকদের সঙ্গে দূরত্ব রাখা যাবে না। কিন্তু বিনোদন করারও একটা লিমিট থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ মূল কথা হচ্ছে-শাসন থেকে সমাজকে মুক্ত করার যে প্রয়াস চলছে। মূল্যবোধ তৈরি করার যে প্রচেষ্টা তা অনেকাংশে কমে গেছে। ফলে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, এখানকার সমাজে সবার মাঝে স্বাধীনভাবে চলার এক ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়েছে। তার কারণ হলো এখন সবার হাতেই স্মার্টফোন রয়েছে। যা মানুষকে সামাজিক অনেক নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে যে অত্যধিক স্বাধীনতার চর্চা হচ্ছে, যে কারণে ছাত্র-শিক্ষক কারোর মধ্যে আর মূল্যবোধ তেমন থাকছে না এবং দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
ড. আশেক মাহমুদ বলেন, এখন শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে চাকরি-বাকরি, বস্তুগত সুবিধা ও অর্জন তখন তো মূল্যবোধ থাকার কথা নয়। আর যদি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যদি হতো মানুষ হওয়া, সামাজিক সংস্কার করা এবং মানুষের জন্য কাজ করা-তা হলে ছাত্রদের শিক্ষকরা সেগুলো শেখাত। তাই ধর্মীয় অনুশাসন, মূল্যবোধের বিকাশ ও মনুষ্যত্বের জায়গা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ফলে কি শিখবে আর কে শেখাবে-এই জায়গাগুলোর মধ্যে সংস্কার আনা জরুরি। তা না হলে এই নৈতিকতার অধঃপতন ও মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব হবে না বরং আরও বাড়তে থাকবে।
শিক্ষকদের কি নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে-দায় কার? এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের সমাজে শিক্ষকদের মধ্যেই মাঝেমধ্যেই এমন নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটছে। যা নতুন নয়। তবে ইদানীং বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটার কারণে এমন প্রশ্ন উঠেছে। যা ফলে একজন শিক্ষক হিসেবে আমাদের খুবই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে এবং যা খুবই বেদনাদায়ক ও লজ্জাস্কর। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মধ্যে নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলি গড়ে তুলতে হবে। আর এ ধরনের নৈতিকতা বিপর্যয়ের ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে।
তিনি বলেন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে যারা জড়িত তারা যেন শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় না আসতে পারে সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা এ ধরনের কাজ করছে সে বিষয়ে যে তদন্তগুলো হচ্ছে তাতে প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তা হলে ভবিষ্যতে আর এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ করার সাহস কেউ পাবে না। তাতে করে শিক্ষকদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আরও বাড়বে এবং ছাত্রীদের পড়াশোনার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
সময়ের আলো/ আরএস/