গণমাধ্যম ও তার ভূমিকা নিয়ে আমরা মোটামুটি অবগত। খবরের কাগজে ছাপা হওয়া সংবাদগুলো মানুষ সত্য বলে মেনে নেয় এবং কোথাও কোনো অনাচার হলে মানুষ সংবাদপত্রকে দোষে এই বলে যে এসব নিয়ে কাগজগুলো কিছু লিখছে না কেন। গণমাধ্যমের ওপর মানুষের অগাধ বিশ্বাসই এই মাধ্যমকে এক অনন্য জায়গায় বসিয়েছে। তাদের ধারণা, সমাজের যাবতীয় সমস্যা তুলে ধরে সংবাদপত্র সরকারের নজর কাড়বে।
অনেক সময় সেটি সম্ভব হয়, আবার কোনো সময় তা হয় না। এখানে সংবাদপত্রের সীমাবদ্ধতা আছে। কেননা আজকাল সংবাদপত্রে যা কিছু প্রকাশিত হয় তা কেবল সাংবাদিকদের দ্বারা সম্ভব নয়। মালিক একটি বিরাট ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পরপর কিন্তু এমনটি ছিল না- মুষ্টিমেয় যে কাগজগুলো তখন প্রকাশিত হতো, তারা মালিকদের দ্বারা প্রভাবিত হতো না। কিছু কিছু পত্রিকা যা সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তাদের কথা আলাদা, তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সরকারের ভাবমূর্তি তুলে ধরা।
তবে বিগত ২০-২৫ বছরে সে ধারা বদলেছে- বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আজকাল সংবাদপত্র বের করা শুরু করেছে। অনেক বিজনেস হাউস আবার টেলিভিশন কেন্দ্র চালু করেছে। সে ক্ষেত্রে সংবাদপত্র বা সম্পূর্ণ মিডিয়া কতটা স্বাধীন তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা যারা সত্তর দশকে সাংবাদিকতা জগতে প্রবেশ করি, তাদের কাছে আজকালের গণমাধ্যমের অনেক কিছুই নতুন লাগে। সংবাদপত্র আর দশ/বারোটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতোই ব্যবসায় নেমেছে। ফলে এদের মান অনেক নেমে গেছে।
তবু বলতে হয়, গণমাধ্যমের সাহায্যে পাঠকরা ঘরে বসেই সব খবরাখবর পাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর যেমন কাগজের মাধ্যমে জানা যায়- তেমনি তাদের দুর্বলতা ও অন্যান্য কুকর্মের কথাও আমরা জানতে পারি।
ইদানীং ব্যাংকগুলোর কিছু খারাপ কাজের ফলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় সরকার সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে কারণ তারা কেউকেটা, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে কিন্তু সরকারের তেমন কঠোর ভূমিকা নেই। খবরের কাগজ কিন্তু সবই লিখছে কিন্তু প্রতিকার তেমন হচ্ছে না।
কিছু কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এত শক্তিশালী যে তাদের ধরা যায় না- তাদের পেছনে মিডিয়া রয়েছে। অনেককে বলতে শুনি ওদের গায়ে হাত দিলে সরকারের টেকা দায় হবে। আমি বিশ্বাস করি না। সরকারকে হটাতে পারে কেবল জনগণ, তাও ভোটের মাধ্যমে। তবে হ্যাঁ, সত্তর ও আশির দশকে আমরা সামরিক সরকারের অভ্যুদয়ও দেখিছি। তখন কি মিডিয়া চুপ করে ছিল? না, সেটি হলফ করে বলা যায় না।
গণমাধ্যমের ভূমিকা কী বিরাট তা বলতে গেলে হোয়াইট হাউসের ওয়াটার গেট কেলেংকারির ঘটনা স্মরণে আছে- কীভাবে সাংবাদিকরা এর ওপর রিপোর্ট লিখে নিক্সন সরকারের পতন ঘটিয়েছিল।
এর বিপরীতে বলা যায়, ডেমোক্রেটিক দলের দুজন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও বারাক ওবামা কিন্তু গণমাধ্যমের সহায়তায় কিন্তু খুব জনপ্রিয় হয়েছিলেন। কেনেডি টেলিভিশনে বেশকিছু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন আবার ওবামা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যান। ভারতে ইমারজেন্সির সময় বাড়াবাড়ির খবর প্রকাশ পায় গণমাধ্যমে ফলে সরকারের পরিবর্তন ঘটে।
গণমাধ্যমের এহেন ভূমিকার জন্যই বহু আগে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এডমন্ড বার্ক (Edmand Burke) গণমাধ্যমকে অভিহিত করেছিলেন চতুর্থ স্তম্ভ বা fourth state বলে।
গণমাধ্যমের গুরুত্ব বিবেচনা করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন (১৮০১-১৮০৯) বলেছিলেন : 'Were it left to me to decide whether we should a government without newspaper or newspaper without a government, I should not hesitate for a moment to prefer the latter.' তর্জমাটা অনেকটা এরকমÑ আমাকে যদি বেছে নিতে বলা হয় যে, তুমি কি পত্রিকাবিহীন সরকার পছন্দ করবে, নাকি সরকারবিহীন পত্রিকা, আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে সরকারবিহীন সংবাদপত্রকেই বেছে নেব।
সংবাদপত্রের গুরুত্ব বুঝে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু বলেছেন : ‘I would rather have a completely free press with all the danger involved in the wrong use of the freedom.’
তার মতে, ভুল ব্যবহারের কারণে স্বাধীনতা যদিও বিঘ্নিত হয় তবু আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন গণমাধ্যম পছন্দ করব।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্ষমতার বাইরে থেকে অনেকেই স্বাধীন পত্রপত্রিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেসব কথা একদম ভুলে যান।
আমাদের দেশে দু’দুবার সামরিক শাসন এসেছে। একবার এসেছে জাতির পিতাকে হত্যা করে; অন্যবার এসেছে ক্ষমতাসীন সরকারকে হটিয়ে। এদের মোট মেয়াদকাল ছিল ১৩ বছরের মতো। তখন গণমাধ্যম স্বাধীন ছিল কি? না, একেবারে না। শাসকরা নিত্যনতুন আইন তৈরি করে সংবাদপত্রের বাকরুদ্ধ করেছিল। এই সরকারগুলোর পতন হলে গণমাধ্যম আবার নতুন করে স্বাধীনতা ফিরে পায়- তবে কোনো সরকারই কিন্তু অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আইনের অপব্যবহার করে সাংবাদিকদের জেলে ঢোকানো হয়। এখানে আমি নির্দিষ্ট কোনো সরকারের কথা বলছি না। মুখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে অনেক কণ্ঠরোধ করা হয়।
বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে গণমাধ্যমেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে গণমাধ্যম বলতে মোটামুটিভাবে খবরের কাগজকে মনে করা হতো- এরপর একে একে আসে টেলিভিশন, যাকে বলা হয় ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া, সম্প্রচার মাধ্যম (broadcast media), কমিউনিটি রেডিও ও অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এগুলো আজ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কিন্তু সমাজ গঠনে এদের ভূমিকা কী, তা গবেষণার বিষয়।
গণমাধ্যম যেমন দেশ ও সমাজ গড়তে সাহায্য করতে পারে তেমনিভাবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। আমাদের দেশে অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ভুল খবরকে ভিত্তি করে। যে লোক নিরক্ষর, তার নামে ফেসবুকে পোস্ট করা নিয়ে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার খবরও প্রচারিত হয়েছে, বিচার-আচার করে জানা যায় সেই লোকের কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই।
স্বাধিকার আন্দোলনের সময় বিদেশি গণমাধ্যম আমাদের পক্ষে বিশেষ প্রচার চালিয়েছিল, বিশেষ করে BBC Radio, এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ভাষায় তাদের প্রচারিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সারা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিল। আমেরিকার গণমাধ্যমের ব্যাপারে বিষয়টি একটু ভিন্নধর্মী। সেই দেশের সরকার পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু সেখানকার স্বাধীন গণমাধ্যম ছিল মুক্তিকামী বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে।
পাকিস্তানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সম্প্রীতির কারণে সেখানকার খবরের কাগজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তবে মজার ব্যাপার, ইসরাইলের গণমাধ্যম কিন্তু ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কেননা পাকিস্তান ছিল মুসলিম দেশগুলোর মিত্র। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোর প্রধান ভূমিকা ছিল বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরা। এখানে একটি পরিসংখ্যান দিতে চাচ্ছি সেটি হলো- ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দ্য টাইমস পত্রিকা ২৯টি সম্পাদকীয় ছেপেছে। দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ ছেপেছে ৩৯টি আর দ্য গার্ডিয়ান ৩৭টি।
এ প্রসঙ্গে ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ সালের দ্য লন্ডন টাইমসের সম্পাদকীয়টির একটি বাক্য উল্লেখ করছি। কাগজটি লিখেছে : ‘If Sheikh Mujib is killed so tragically, there was no need to emerge Bangladesh as a free country.’ বাংলায় বলা যায়- যদি শেখ মুজিবকে এমন করুণভাবে হত্যা করা হয়, তবে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
এর বিপরীতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত The Bangladesh Observer ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ সম্পাদকীয় শুরু করে এভাবে : ‘The killing of Sheikh Mujib was a historic necessity.’ লন্ডন টাইমসের সম্পাদকীয়টি সারা বিশে^র মানুষের অনুভূতি প্রকাশ করেছে; অপরপক্ষে বাংলাদেশ অবজারভারের সম্পাদকীয়তে তুলে ধরা হয় খুনিদের চিন্তাধারা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি
সময়ের আলো/জিকে