আত্মহত্যা বিরোধী বক্তব্য দিয়ে নিজেই করলেন আত্মহত্যা
মোশফিকুর রহমান ইমন, জবি
শিক্ষা
দু-সপ্তাহ আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক কনসার্টের উপস্থাপনায় আত্মহত্যা বিরোধী সচেতনতামূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা। কনসার্টটিও
আত্মহত্যা বিরোধী বক্তব্য দিয়ে নিজেই করলেন আত্মহত্যা
মোশফিকুর রহমান ইমন, জবি
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৪, ৭:৫৭ পিএম
জবি শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা। ছবি: সংগৃহীত
দু-সপ্তাহ আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক কনসার্টের উপস্থাপনায় আত্মহত্যা বিরোধী সচেতনতামূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকা। কনসার্টটিও ছিল ক্যান্সার আক্রান্ত এক শিক্ষার্থীকে বাঁচানোর তাগিদে।
আত্মহত্যা বিরোধী সচেতনতামূলক বক্তব্যে ফাইরুজ বলেছিলেন, ‘আপনারা গান শুনুন। ভুল করে কারও কখনো আত্মহত্যার চিন্তা আসলে নিজেকে যেন ঘরের মধ্যে বন্দি না রাখে।’ এক কথায় তিনি তার বক্তব্যে অবসাদ, দুশ্চিন্তা ভুলে গানের মাঝে বেঁচে থাকার কথা বলেছিলেন।
আত্মহত্যা বিরোধী সচেতনতামূলক বক্তব্য দিয়েছিল যে মেয়েটি, সেই কিনা নিজেই আজ সেই পথ বেছে নিয়েছে। নিয়ম নীতি, ভালোবাসা আর মায়ার তোয়াক্কা না করে সেই আত্মহত্যাকে বেছে নিয়ে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে গলায় ফাঁস নিয়ে গতকাল (শুক্রবার) রাতে আত্মহত্যা করেছেন তিনি।
এদিকে ফেসবুক পোস্টে অবন্তিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের আম্মান সিদ্দিকী নামে তার সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম দায়ী থাকবেন বলে উল্লেখ করে যান। ফেসবুক পোস্টে অবন্তিকা লিখেছেন, ‘আমি যদি কখনো সুইসাইড করে মারা যায়, তবে আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র দায়ী থাকবে আমার ক্লাসমেট আম্মান সিদ্দিকী আর তার সহকারী হিসেবে তাকে সহায়তাকারী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম। আম্মান যে আমাকে অফলাইন অনলাইনে থ্রেটের উপর রাখতো সে বিষয়ে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ করেও আমার লাভ হয়নি। দ্বীন ইসলাম আমাকে নানানভাবে ভয় দেখায়। আম্মানের হয়ে যে আমাকে বহিষ্কার করা ওনার জন্য হাতের ময়লার মতো ব্যাপার। আমি জানি এখানে কোনো বিচার পাবো না।’
পোস্টে উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের কাছে বিচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ম্যাম আপনি এই প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে আপনার কাছে বিচার চাইলাম। আর আমি ফাঁসি দিয়ে মরতেসি। আমার উপর দিয়ে কী গেলে আমার মতো নিজেকে এতো ভালোবাসে যে মানুষ সে মানুষ এমন কাজ করতে পারে।’
এ বিষয়ে ছাত্র আম্মান সিদ্দিকীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে পোস্টে নাম উল্লেখ করা সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম বলেন, মেয়েটাকে দেখি ১ থেকে দেড় বছর আগে। তারা কয়েকজন সহপাঠী প্রক্টর অফিসে আসে। সেসময় তৎকালীন প্রক্টর মোস্তফা কামাল স্যার, আমিসহ আরও কয়েকজন সহকারী প্রক্টর অফিসে ছিল। মেয়েটা ফেক আইডি ব্যবহার করে তার বন্ধুদের এসএমএস দিত। এটা নিয়ে থানায় জিডি হয়েছে। আমাদেরকে জানানো হয়। পরে মেয়েটা স্বীকার করে। এরপর তার পরিবারের লোকজন অনুরোধ করে জিডি তুলে নেবার জন্য। তখন সকল প্রক্টরিয়াল টিম মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয়, তিন মাস পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। কোন ঝামেলা না হলে জিডি তুলে নেয়া হবে। আমি কখনো মেয়েটার সঙ্গে একা কথা বলিনি। সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রক্টর অফিসে লিখিত অভিযোগ দেখলেও বুঝা যাবে। আপনারা ঘটনা তদন্ত করে দেখুন। আমি দোষী হলে শাস্তি দিন। কিন্তু আগেই আমাকে দোষী বানাবেন না দয়া করে। না হলে আমারও সুইসাইড করা লাগবে।
এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাসুম বিল্লাহ, সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন আইন কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার দাস। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন, সঙ্গীতের চেয়ারম্যান ঝুমুর আহমেদ।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা বিষয়টি জেনেছি। ছাত্রী তার মৃত্যুর জন্য দায়ী হিসেবে আমাদের প্রক্টরিয়াল টিমের একজন সদস্যের নাম উল্লেখ করেছে। মাননীয় উপাচার্য সাময়িকভাবে তাকে অব্যাহতি প্রদানের মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন। আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপাচার্য ড. সাদেকা হালিম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার সময় তাকেও ঘেরাও করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপকালে জবি ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে অভিযুক্ত শিক্ষক দ্বীন ইসলাম ও অভিযুক্ত শিক্ষার্থী আম্মানকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, শুক্রবার (১৫ মার্চ) রাত ১২টার পর ফাইরুজ অবন্তিকার শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহপাঠীরা ‘আমার বোন মরলো কেনো বিচার চাই বিচার চাই’ এ শীর্ষক স্লোগান দিতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে টায়ার পুড়িয়ে অবরোধ করে তারা। প্রক্টরকেও ঘেরাও করে তারা।