বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

দূষণ ও দখলের কারণে রাজধানীর চারপাশের নদী ও জলাশয়ের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায়, ঢাকা নগরীর ঘরে এবং শিল্প কারখানায়

2024-03-22T07:23:48+00:00
2024-03-22T07:47:16+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা
দ্রুত নামছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মার্চ, ২০২৪, ৭:২৩ এএম  আপডেট: ২২.০৩.২০২৪ ৭:৪৭ এএম
বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা
দূষণ ও দখলের কারণে রাজধানীর চারপাশের নদী ও জলাশয়ের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায়, ঢাকা নগরীর ঘরে এবং শিল্প কারখানায় যে পানি ব্যবহার করা হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশই উত্তোলন করতে হয় মাটির নিচ থেকে। প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে পানি আইন লঙ্ঘন করে প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার পানির স্তর দ্রুততার সঙ্গে নেমে যাচ্ছে। পানি বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, যে হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, সে হারে পানির স্তর পূরণ হচ্ছে না। তাই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সহনীয় পর্যায়ে আনতে না পারলে কয়েক দশকের মধ্যেই সুপেয় পানির সংকট তৈরিসহ বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্ষার মৌসুমে বাংলাদেশের বেশির ভাগ জায়গায় পানির ভূগর্ভস্থ স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এলেও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল ও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু এলাকায় স্বাভাবিক পর্যায়ে আসে না। তা ছাড়া দূষণ ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে দেশে বিশুদ্ধ পানির যেসব উৎস রয়েছে সেগুলোও ধীরে ধীরে দূষিত হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও পানির এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণেও সুপেয় পানির রিজার্ভে হুমকি বাড়ছে। তাই পানি আইন মেনে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা না হলে এই সংকট বাড়তেই থাকবে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ২ মিটার করে নেমে যাচ্ছে। ১৯৭০ সালে ঢাকা শহরে ৬ মিটার মাটির নিচেই পানি পাওয়া যেত। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় পানির স্তর ছিল ২৫ মিটারে, যা ২০০৫ সালে ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার এবং ২০২৪ সালে এসে ৭৫ মিটারে নেমেছে। ঢাকার ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটাতে ওয়াসার ১ হাজার পাম্প ছাড়াও ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপন করা অন্তত ২ হাজার গভীর নলকূপ দিয়ে প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হয়। শুধু ঢাকা ওয়াসাই প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে। ওয়াসার প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫ সালে ঢাকায় প্রতিদিন ৩৫ লাখ ঘনমিটার, ২০৩০ সালে প্রতিদিন ৪৩ লাখ ঘনমিটার এবং ২০৩৫ সালে প্রতিদিন ৫২ লাখ ঘনমিটার পানির চাহিদা থাকবে। ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে পানির স্তর নেমে যেতে পারে ১২০ মিটারে। 

২০১০ সালে ঢাকা ওয়াসার উৎপাদিত পানির ৮০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে তোলা হতো। আর ২০ শতাংশ ছিল ভূ-উপরিভাগের পানি। সংস্থাটি ২০২৫ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ পানি ভূ-উপরিভাগ থেকে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করলেও এখনও এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমানে ওয়াসার দৈনিক উৎপাদিত পানির ৭০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ উৎসের।

বাংলাদেশ পানি আইনের ১৯ নম্বর ধারায় ‘ভূগর্ভস্থ পানিধারক স্তরের সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ ও ভূগর্ভস্থ পানি আহরণে বিধি- নিষেধ’ সম্পর্কে বলা হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানিধারক স্তর হতে পানির নিরাপদ আহরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাহী কমিটি, এই আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে, সুরক্ষা আদেশ দ্বারা যেকোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারবে। আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, নির্বাহী কমিটি, যথাযথ অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যেকোনো এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিধারক স্তরের সর্বনিম্ন নিরাপদ আহরণ সীমা নির্ধারণ করতে পারবে। আইনে ‘নিরাপদ আহরণ সীমা’ কথার অর্থ হচ্ছে পানিধারক স্তর হতে পানির এমন কোনো পরিমাণ উত্তোলন যার ফলে পানিধারক স্তর নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূগর্ভস্থ পানি বিজ্ঞান পরিদফতরের পরিচালক (জিওলজি) ড. আনোয়ার জাহিদ জানান, শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে যেসব এলাকা আছে, শিল্পায়নের ফলে এসব এলাকায় ক্রমাগত পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। 

তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার আদর্শ নিয়ম হলো, পানি উত্তোলনের পরিমাণ কখনোই রিচার্জের পানির চেয়ে বেশি হতে পারবে না। কিন্তু মানুষ মাত্র কয়েক সেকেন্ডে যে পানি তুলে ফেলতে পারে তা প্রাকৃতিকভাবে পূরণ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। রাজধানীতে ভবন বৃদ্ধি ও কংক্রিটের অবকাঠামো বাড়তে থাকা এবং ক্রমশ জলাশয় বিলুপ্তি হতে থাকায় ভূগর্ভস্থ পানি প্রাকৃতিকভাবে পুনরায় ভরার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে ঢাকায় জলাভূমি ও উন্মুক্ত জায়গা কমেছে ১৩৪ বর্গকিলোমিটার। বিআইপির তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে প্রতি বছর গড়ে ৪২ হাজার একর জলাশয় ভরাট করা হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশন এলাকা থেকেই বছরে গড়ে ৫ হাজার ৭৫৭ একর জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে সড়ক ২৫ শতাংশ, জলাশয় ১৫ শতাংশ, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান থাকা দরকার ২০ শতাংশ। অর্থাৎ নাগরিক সুবিধার জন্য ৬০ ভাগ জায়গা খালি থাকা দরকার। আর ৪০ ভাগ জায়গায় আবাসন, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এবং মার্কেট গড়ে উঠবে। বিআইপির সাবেক সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, এই গবেষণা করা হয়েছিল ড্যাপের গেজেট প্রকাশিত হওয়ার আগে। এখন গবেষণা করা হলে হয়তো ফল কিছুটা ভিন্ন হতো। 

ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সহনীয় পর্যায়ে আনার তাগিদ দিয়ে ফজলে রেজা সুমন বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ অসীম না। তাই সরকারকে জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় এর ব্যবস্থাপনা করার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দেশে ৯৮ শতাংশ অঞ্চল পানি সরবরাহের আওতায় রয়েছে। ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে যেখানে সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব, তা করা হচ্ছে। গ্রামেও সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ সার্ফেস ওয়াটার শিফট করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে।

রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ছাড়াও সার্ফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।




Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: