দেশে ঝাঁজ বাড়ল পেঁয়াজের

এসএম আলমগীর

জাতীয়

ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে-বিষয়টি তেমন নয়। সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল, শুধু বন্ধের মেয়াদ বাড়িয়েছে দেশটি। গত

2024-03-25T06:40:25+00:00
2024-03-25T08:36:13+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
দেশে ঝাঁজ বাড়ল পেঁয়াজের
ভারতের রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মার্চ, ২০২৪, ৬:৪০ এএম  আপডেট: ২৫.০৩.২০২৪ ৮:৩৬ এএম
দেশে ঝাঁজ বাড়ল পেঁয়াজের
ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে-বিষয়টি তেমন নয়। সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল, শুধু বন্ধের মেয়াদ বাড়িয়েছে দেশটি। গত ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানো ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ করেছিল ভারত। এই নিষেধাজ্ঞা ৩১ মার্চ শেষ হওয়ার কথা ছিল, এখন সে সময় আরও বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবেশী দেশটি রফতানি বন্ধের মেয়াদ বাড়িয়েছে-এই খবরেই দেশের অসাধু পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে আবারও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা, আর খুচরা বাজারে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। নতুন করে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

রোজা শুরুর আগে দেশের বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এর পর দেশে নতুন পেঁয়াজে ভরপুর এবং গত ১৫ মার্চ সরকার উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বেঁধে দেওয়ার পর পেঁয়াজের দাম বেশ কমে আসে। কয়েক ধাপে ৮০ টাকা থেকে ৬০ টাকা এবং একপর্যায়ে ৪৫ টাকা কেজিতেও নেমে আসে পেঁয়াজ গত সপ্তাহে। বাজারে দিন তিনেক কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পারেন ক্রেতারা। এর পর থেকেই আবার বাড়তে শুরু করে দাম, গতকাল আরেক দফা বেড়ে আবার খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ৮০ টাকায় ঠেকেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক সময় সরকারের তরফ থেকে এবং ব্যবসায়ীদের তরফ থেকেও বলা হয়, বাজারে কোনো সিন্ডিকেট নেই। তা হলে এই যে, এক দিনের ব্যবধানে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা দাম বাড়িয়ে দিল পেঁয়াজের-এটা বাজার সিন্ডিকেট নয় তো কি। এমন কথা বলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা সবসময় বলে আসছি হঠাৎ হঠাৎ পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায় বাজার সিন্ডিকেটের কারণে। অথচ আমাদের কথাকে আমলে নেওয়া হয় না। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সময় বাড়িয়েছে-এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। এর সঙ্গে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির তো কোনো সম্পর্ক নেই। তা হলে বাড়ল কেন; বাড়ল পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের কারণে। বাজারের এই সিন্ডিকেট যতদিন না ভাঙ্গা যাবে ততদিন পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।

গতকাল রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সব বাজারেই নতুন করে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে জানা গেছে, এখানে এক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। এই বাজারের মেসার্স নূর বিতানের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী রিয়াদ মিয়া সময়ের আলোকে বলেন, আগের দিন শনিবারও আমরা এই পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৪৭ টাকায় বিক্রি করেছি। অথচ আজ (গতকাল) রোববার বিক্রি করছি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়।

দাম বাড়ল কেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো কারণ নেই। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে-এই খবর জানার পরই দাম বেড়ে গেছে। পাবনা, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ এলাকার মোকামেও দাম বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে সব বাজারেই। ভারত থেকে এলসির পেঁয়াজ দ্রুত না আসলে দুয়েক দিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম আরও বাড়বে।

ঢাকার আরেক প্রধান বাজার কারওয়ানবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী ও মেসার্স কুতুবপুর বাণিজ্যালয়ের বিক্রেতা আলাউদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, বাজারে কিন্তু পেঁয়াজের কোনো অভাব নেই। তবুও দাম বাড়ল শুধু ভারত রফতানি বন্ধ করেছে-এই খবর জানার পর। আমার মনে হয়, দাম কমে আসবে। কারণ দেশে এখন নতুন পেঁয়াজে ভরপুর।

পাইকারি বাজারের প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। এক দিন আগে শনিবারও ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। আর রোববার বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়। দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে কারওয়ানবাজারের খুচরা পেঁয়াজ বিক্রেতা কবীর হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ আনতে গিয়ে আমি নিজেই অবাক হয়েছি। এক দিন আগে পাইকারি বাজার থেকে ৪৫ থেকে ৪৬ টাকায় কিনেছি। অথচ রোববার কিনতে হয়েছে ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায়। আনা-নেওয়া খরচসহ আমাদের প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে যাচ্ছে ৬০ থেকে ৬২ টাকা। আমি বিক্রি করছি ৭০ থেকে ৭৫ টকায়।

রাজধানীর হাতিরপুল বাজারের আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা হাবিবুর রহমান জানান, তিনি প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৮০ টাকায় বিক্রি করছেন। তিনিও জানান, পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হয়েছে, তাই তিনিও বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।

দুই-তিন দিনের মধ্যে ভারতীয় পেঁয়াজ আসবে : বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী
অন্যদিকে রোববার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ভারতীয় পেঁয়াজ দেশে আসবে। ভারত থেকে মোট ৫০ হাজার মেট্রিকটন পেঁয়াজ আনা হবে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) কার্যালয়ে ‘প্রয়োজনীয় জিনিসের দামের ওপর সিন্ডিকেট এবং প্রতিযোগিতার প্রভাব’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পেঁয়াজের বর্তমান বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, পেঁয়াজ রফতানির ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের চুক্তিকে প্রভাবিত করবে না। চুক্তি অনুযায়ী ৫০ হাজার টন ভারতীয় পেঁয়াজ ধীরে ধীরে বাংলাদেশে আসবে। ভারত থেকে আমাদের পেঁয়াজ ইতিমধ্যেই ট্রেনে চড়েছে যা দর্শনা রুট দিয়ে দুই বা তিন দিনের মধ্যে পৌঁছাবে।

ফরিদপুরের বাজার স্থিতিশীল
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, হঠাৎ করে ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দেশের বিভিন্ন বাজারে আবার পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করলেও ফরিদপুরে এর কোনো প্রভাব এখনও পড়েনি।

জেলার সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের মোকাম সালথা ও নগরকান্দা উপজেলায় এখনও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া, বালিয়া ও ঠেনঠেনিয়া বাজারে প্রতি মণ হালি পেঁয়াজ প্রকার ভেদে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও জেলার নগরকান্দা উপজেলার বাজারগুলোতেও একই দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।

বর্তমানে হালি পেঁয়াজ উত্তোলন মৌসুম শুরু হওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশি পেঁয়াজ বাজারে সরবরাহ রয়েছে। ফলে এসব বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি থাকায় এখনও ফরিদপুরে মোকামে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকায় এবং খুচরা পর্যায়ে প্রকারভেদে প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

নাটোরে বেড়েছে কেজিতে ৫-৭ টাকা
নাটোর প্রতিনিধি সুফি সান্টু জানান, নাটোরে এক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫-৭ টাকা। গত শনিবার যে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় সে পেঁয়াজ রোববার বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পেঁয়াজ রফতানিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। এ কারণেই পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও হাটবাজারে আমদানি কম থাকায় পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকা মণ দরে।

মোক্তার আলী নামে একজন ক্রেতা জানান, তিনি রোববার পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে হতবাক হয়েছেন। গতকাল যে পেঁয়াজের দাম ছিল কেজি ৪৫ টাকা মাত্র, এক দিনেই তার কেজি দাঁড়িয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।

নাটোর শহরের মাদরাসা বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান জানান, তিনি রোববার লক্ষ্মীপুর এবং তেবাড়িয়া, ঠাকুর লক্ষ্মীকোলসহ বিভিন্ন পেঁয়াজ মোকামে গিয়েছিলেন পেঁয়াজ কিনতে কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় অল্প পরিমাণ মাল কিনেছেন।

অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, টিসিবির বাজারে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি আপাত বন্ধ থাকার ফলে ব্যবসায়ীরা কৌশলে দাম বৃদ্ধি করেছে। তারা দাবি করেন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবারও যেন বিভিন্ন স্থানে ন্যায্যমূল্যে টিসিবির তরফ থেকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হয়। তা হলে কমে যাবে পেঁয়াজের দাম।

সিরাজগঞ্জে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল বাজারের খুচরা পেঁয়াজ ব্যবসায়ী পলান সাহা বলেন, রোববার ৫২ টাকা কেজি দরে দেশি পেঁয়াজ কিনে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে খুচরা বিক্রি করেছি। 

জামতৈল বাজারের পেঁয়াজের আড়তদার ইকবাল হোসেন জানান, শনিবার পাবনার বেড়ার পাইকারি বাজার থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে দেশি পেঁয়াজ কিনে রোববার ৫০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে রোববার মোকামেই ৫০ টাকা কেজি করে পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে। 

সময়ের আলো/আরএস/ 




Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: