বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে তিনটি ব্যাংকে সশস্ত্র হামলা, অস্ত্র লুট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত অভিযোগে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ৫৩ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দুর্গম পাহাড়ে চলমান চিরুনি অভিযানে সোমবার তাদের গ্রেফতার ও আটক করা হয়। এ সময় ৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে একাধিক নারী, এক গাড়ি চালক ও ব্যাংকের সহকারী ক্যাশিয়ারও রয়েছেন।
সোমবার বান্দরবানের পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কেএনএফের সক্রিয় দুই সদস্যকে আটকের তথ্য জানানো হয়। তবে অভিযান শুরুর পর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অনেকেই সীমান্তের ওপারে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কেএনএফ সন্ত্রাসীদের ধরতে চলমান চিরুনি অভিযান প্রসঙ্গে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, কেএনএফের সন্ত্রাস নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ঈদের ছুটিতেও অভিযান চালাবে যৌথবাহিনী। ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অনেকে দুর্গম পাহাড়ে আত্মগোপনে রয়েছে। আর পাহাড়ে অভিযানের ক্ষেত্রে অনেক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। সশস্ত্র কেএনএফ সদস্যরা মাইন বোমা পুঁতে রাখে। সবকিছু বিবেচনায় সাবধানতা অবলম্বন করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর সদস্যরা দিনরাত এক করে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত মার্চের মাঝামাঝি শান্তি আলোচনার পর কেএনএফের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শতাধিক কমান্ডো মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে বান্দরবানে প্রবেশ করে। কেএনএফের ওই কমান্ডো দলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফেরোসাস ওয়াইল্ড-বোর’ (এফডব্লিউবি)। এই এফডব্লিউবির সদস্যরাই গত মঙ্গলবার রাতে ও পরের দিন বুধবার দুপুরে ব্যাংক ডাকাতি, থানা ও বাজারে আক্রমণ এবং উপজেলা সদরে ত্রাস সৃষ্টি করে। তাদের এমন ভয়ংকর হামলার পর সেনাবাহিনীসহ যৌথবাহিনীর অভিযানে এফডব্লিউবির সদস্যরা সীমান্তের ওপার মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরামে দুর্গম পাহাড়ে আশ্রয় নেয় বলে ধারণা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের।
অভিযানে থাকা একাধিক বাহিনীর কর্মকর্তারা সময়ের আলোকে জানান, পাহাড়ে অবস্থান করা বমদের বাড়িঘরে তল্লাশি করা হচ্ছে। ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত অস্ত্রের সন্ধানে পাড়াগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বমগোষ্ঠীর সন্দেহভাজন অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে সোমবার বিকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে চলমান যৌথবাহিনীর তল্লাশি অভিযানকালে পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কেএনএফের দুজন সক্রিয় সদস্যকে আটক করা হয়েছে। সোমবার বান্দরবনের রুমা উপজেলার বেথেলপাড়ায় এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় যৌথবাহিনীর হাতে আটক কেএনএফ সদস্যদের কাছ থেকে সাতটি দেশি বন্দুক, ২০ রাউন্ড গুলি, ল্যাপটপ, ইউনিফর্ম ও বুট উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ২ এপ্রিল বান্দরবানের রুমায় সোনালী ব্যাংকে সশস্ত্র হামলা ও ব্যাংকটির শাখা ম্যানেজারকে অপহরণের ঘটনা ঘটিয়ে নতুন করে কেএনএফ তাদের ভয়ানক রূপ প্রকাশ করে। পরের দিন থানচিতে আরও দুটি ব্যাংকের শাখায় লুটপাট এবং থানচি থানায় সশস্ত্র হামলা চালায় তারা। এসব ভয়ানক সন্ত্রাসী কর্মকা-ের প্রেক্ষাপটে গত দুদিন ধরে সরকারের নির্দেশে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে চিরুনি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বান্দরবানে।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত গাড়ির চালক, ব্যাংকের সহকারী ক্যাশিয়ার ও কুকি-চিনের আরও চারজন রয়েছে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন জানান, বান্দরবানে সম্প্রতি রুমা ও থানচি দুই উপজেলার সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে ডাকাতি সময় অস্ত্র লুট, মারধরের ঘটনার পর থেকে জড়িত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলার বাহিনী। এরই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে একাধিক নারী ও এক গাড়িচালকসহ ৫৩ জনকে গ্রেফতার করে যৌথবাহিনী। এ সময় ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত গাড়িটি জব্দ করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চারজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- ভানুনুন নুয়াম বম, জেমিনিউ বম, আমে লনচেও বম ও গাড়িচালক মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন সাগর।
পুলিশ সুপার আরও জানান, সম্প্রতি তিনটি ব্যাংকে অস্ত্রধারী ডাকাত দলের ২৫-৩০ জনের সদস্য পূর্বপরিকল্পিতভাবে অতর্কিত হামলা করে। অস্ত্রের মুখে উপস্থিত লোকজনদের জিম্মি করে সোনালী ব্যাংক থেকে ১৫-২০ লাখ টাকা এবং কৃষি ব্যাংক থেকে আনুমানিক ৩ লাখ টাকা লুট করে। এ সময় ব্যাংকের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনদের কাছ থেকে আনুমানিক ১০-১৫টি মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে কয়েক রাউন্ড ফায়ার ও ত্রাস সৃষ্টি করে ঘটনাস্থল থেকে পশ্চিম দিকে শাহাজাহান পাড়াস্থ পাহাড়ি এলাকার দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনায় থানচি থানায় মামলা রুজু করা হয়। গত রোববার বিকাল ৫টায় দিকে থানচি থানা পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে টিঅ্যান্ডটি পাড়া এলাকা থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত (ঢাকা মেট্রো-ন-১১-৩০০৭) সাদা রঙের একটি বলেরো গাড়ি জব্দ করা হয়। পরে ডাকাত দলের সদস্য গাড়িচালক মোহাম্মদ কফিলকে গ্রেফতার করে সোমবার আদালতে সোর্পদ করা হয়েছে।
সৈকত শাহীন জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপজেলাগুলোতে অভিযান পরিচালনার জন্য চারটি সাঁজোয়া যান (এপিসি) আনা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা আরও বাড়ানো হবে। চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব সাঁজোয়া যান রুমা-থানচি উপজেলায় ব্যবহার করা হবে।
এদিকে বান্দরবানে ব্যাংক ডাকাতি ঘটনার পর থেকে জনসাধারণের নিরাপত্তা স্বার্থে থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলা সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ঈদ ও নববর্ষ ঘিরে বান্দরবানে তিন উপজেলার সোনালী ব্যাংকে লেনদেন বন্ধ থাকায় সোনালী ব্যাংকের জেলা সদর শাখায় ভিড় করছেন গ্রাহকরা। নগদ টাকা উত্তোলনের চাপে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যাংকাররা। পাশাপাশি ওই ব্যাংকে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সোমবার সকাল থেকেই এমন চিত্র দেখা গেছে বান্দরবান জেলা শাখা সোনালী ব্যাংকে।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ি থেকে আসা সোনালী ব্যাংকে কয়েকজন গ্রাহক সময়ের আলোকে জানান, ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর তাদের উপজেলার ওই শাখায় ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় উৎসবকে ঘিরে প্রয়োজনীয় কাজের খরচে জন্য বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এসে টাকা উত্তোলন করতে হচ্ছে।
সোনালী ব্যাংক জেলা শাখা ব্যবস্থাপক রাজন কান্তি দাশ সময়ের আলোকে বলেন, ঘটনার পর তিন উপজেলা ওই শাখা ফিজিক্যাল ট্রানজেকশন বন্ধ রয়েছে। তাদের সব কার্যক্রম বান্দরবান সদর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যাংকের নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সদর থানা থেকে এক প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসন থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, জনসাধারণে নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছি। অন্যদিকে এ ঘটনার পর থেকেই থানচি ও রুমা দুই উপজেলায় জনসাধারণে মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সময়ের আলো/জেডআই