মানুষকে আল্লাহ সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি’ (সুরা ইসরা : ৭০)। মানুষের এ মর্যাদা রক্ষা করা সবারই অন্যতম দায়িত্ব। ইসলাম একটি নিরীহ, অবলা প্রাণীকেও যথাযথ মর্যাদা, ভালোবাসা দিতে আদেশ করে। আর মানুষকে সম্মান-মর্যাদা দেওয়া তো ঈমানের অংশ বিশেষ। কিন্তু আমরা অনেকেই অবজ্ঞা-অবহেলায় মানুষকে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে থাকি। দিল-মনে আঘাত করি। একজন কবি চমৎকার বলেছেন, ‘তোমরা কাবা ঘর ভেঙে দাও, তবুও মানুষের দিল ভেঙো না। কারণ কাবা ঘর আজরের ছেলে ইব্রাহিমের তৈরি, আর মানুষের দিল আল্লাহ কুদরতি হাতের তৈরি।’ কিন্তু আমরা কতভাবেই না মানুষকে কষ্ট দিই!
মানুষ স্বভাবতই সুন্দর ব্যবহার ও সুন্দর ব্যবস্থাপনা পছন্দ করে। অনাকাংখিত পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে চায়। মানুষের কাছে মানুষ সবসময় ভালো ব্যবহারই আশা করে। ইসলাম মানুষের চাহিদা ও ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে ঘোষণা করেছে, তুমি অন্যের কাছে যেমন ভালো ব্যবহার আশা রাখো, তুমিও তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। আর অন্যকে উৎপীড়ন না করা পুণ্যের কাজ। জান্নাতে প্রবেশের সুপথ। উৎপীড়ন ব্যক্তিকে জাহান্নামে পৌঁছে দেবে। হাদিসে রয়েছে, ‘যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভ করতে চায় সে যেন আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর বিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এবং মানুষের সঙ্গে এমন ব্যবহার করে, যে ব্যবহার সে নিজে অন্যের কাছে আশা করে।’ (রিয়াজুস সালেহিন : ১৫৬৬)
একটি সমাজ ঘরবাড়ি ছাড়া কল্পনা করা যায় না। ঘরবাড়ি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রয়োজন মেটাতে আমরা ঘরবাড়ি তৈরি করছি। ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে দরকার নির্মাণসামগ্রী। কিন্তু অনেক মানুষকে দেখা যায় বাড়ি তৈরির নির্মাণসামগ্রী ইট, বালু, খোয়া, রড ইত্যাদি চলাচলের রাস্তায় যত্রতত্র ফেলে রাখে। রাস্তা আটকে কাজ করে। রাস্তায় দিনরাত অসংখ্য মানুষ চলাফেরা করে। চলতি পথে মানুষগুলো এসব কারণে বিভিন্ন ভোগান্তির শিকার হয়। মনে কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। কারও স্থান সংকটের কারণে সাময়িকভাবে রাস্তায় এসব সামগ্রী রাখার প্রয়োজন হতে পড়ে। তবে তা দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরাব, সরাচ্ছি অথবা কেউ কিছু বলার ক্ষমতা রাখে না এমন মানসিকতা পরিহার করে মানবতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
রাস্তার পাশে বাড়ি বা বাড়ির সঙ্গে রাস্তা থাকলে পানির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা চাই। বৃষ্টির দিনে ছাদে পানি জমে, ছাদে পানির ট্যাঙ্ক ওভার হয়ে পানি পড়ে, টিউবওয়েলের পানি, টয়লেটের ময়লা পানি, গরু-ছাগলের প্রস্রাব রাস্তায় পড়ে মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়। এসব পানি গড়িয়ে পড়ে পথচারীদের কষ্ট দেয়। কাপড়ে, শরীরে ময়লা লাগে। মানুষের এসব কষ্টে বাড়ির মালিক পাপী হচ্ছেন। আরও খেয়াল করার বিষয়, দিনরাতে আলো জ¦ালিয়ে মানুষকে কষ্ট দেওয়া যেন না হয়। রাতের সঙ্গে আঁধার নামে, আঁধার দূর করতে আমরা বাতি, লাইট জ্বালাই। রাস্তায় চলার সময় মোটরসাইকেল, অটো, গাড়ি ইত্যাদিতে হাইলাইট ব্যবহার করি। ব্যবহৃত গাড়ির সাদা-হলুদ লাইটের আলো সামনে থেকে আসা পথিকের চোখে লাগে। খুবই বিরক্ত, কষ্ট লাগে। কখনো কখনো এ জন্য দুর্ঘটনাও ঘটে। সাবধান না হলে এসব কর্মে বড় পাপ বাড়তেই থাকবে।
বিভিন্ন প্রয়োজনে আমরা মালবাহী গাড়ি ব্যবহার করি। এসব গাড়ি জনজীবনকে সহজ করে তুলেছে। তবে কিছু সময় এগুলো কষ্টের বড় কারণ হয়ে যায়। যেমন-ট্রাক, ড্রাম ট্রাক, স্ট্রিয়ারিং গাড়ি ইত্যাদি ইটের ভাটা ও বাসাবাড়িতে মাটি, বালু বহন করছে। গাড়ি থেকে পড়া মাটিগুলো রাস্তায় জমে থাকছে। হালকা বৃষ্টি হলে এতে রাস্তাগুলো প্রচুর পিচ্ছিল হয়ে যায়। চলতি পথের মানুষগুলো খুবই কষ্টের সম্মুখীন হয়। বড় বড় দুর্ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। কর্তৃপক্ষ এর প্রতিকার না করলে তাদের পাপ বৃদ্ধি হতেই থাকবে। এ ছাড়াও গ্রামগঞ্জে, উপশহরে প্রচুর কৃষিকাজ হয়। বাড়িতে খোলা, উঠান ইত্যাদি না থাকায় কৃষকরা রাস্তায় ফসল মাড়ানো, শুকানোর কাজ করে। বিশেষ প্রয়োজনে হয়তো এসব ব্যবহার করা হয়। তবে অযত্ন-অবহেলার কারণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। ফলে চলার পথে এসব উপাদান, আবর্জনা জমে থাকে। পথিক সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে পথ পাড়ি দেয়। যা পাপ ও প্রায়শ্চিত্ত ডেকে আনে।
মানুষকে কষ্ট দেওয়া ধ্বংসাত্মক কাজ, কবিরা গুনাহ। সব ধর্মেই মানুষকে কষ্ট দেওয়া নিষেধ। ইসলামে তো বলা হয়েছে, বান্দা মাফ না করলে সে গুনাহ মাফ হবে না। তা ছাড়া মানুষকে কষ্ট দেওয়ার শাস্তিও কঠিন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অত্যাচার করে অর্থাৎ মানুষকে কষ্ট দেয় আমি তাদের কঠিন শাস্তি দেব’ (সুরা ফুরকান : ১৯)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা মুসলমানদের কষ্ট দেবে না, তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হবে না’ (তিরমিজি : ২০৩২)। রাসুল (সা.) অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘প্রকৃত মুসলমান যার হাত ও মুখ অর্থাৎ কর্ম ও কথা থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকে’ (বুখারি : ১০)। এ ছাড়াও হাদিসে বলা হয়েছে ঈমানের শাখা সত্তরের অধিক। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলের, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। তখন সে রাস্তার ওপর একটি কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের ডাল দেখতে পেয়ে তা সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এই ভালো কাজটি পছন্দ করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন’ (মুসলিম : ৬৪৩১)। এ হাদিস থেকে বোঝা যায় রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোর ফজিলতে বান্দা ক্ষমা পেয়ে যাচ্ছে। তা হলে বিপরীতে রাস্তায় কষ্টদায়ক কিছু রাখর জন্য শাস্তি অনিবার্য হবে। মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয় এমন কাজ থেকে আমরা বিরত থাকার চেষ্টা করব। আল্লাহ উত্তম তওফিকদাতা।
সময়ের আলো/আরএস/