বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষিত জাতি তৈরির সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বিবেচিত। যেখানে দেশের পরিশ্রমী ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এসব শিক্ষার্থীরাই মাদকের কড়াল গ্রাসে আক্রান্ত হচ্ছে। এক সময় তাদের সংখ্যা কম হলেও এখন বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠেছে মাদক বিস্তারের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও ব্যতিক্রম নয় এ চিত্রের।
মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আবাসিক হলগুলোতে বেড়েছে মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম্য। ক্যাম্পাসে মাদক এতটাই সহজলভ্য হয়ে গেছে যে ক্যাম্পাসে হরহামেশাই মেলে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ নানা ধরনের দেশি-বিদেশি মাদক। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলে এক ছাত্রলীগ কর্মীর কক্ষে সন্ধান মিলেছে মাদক সাম্রাজ্যের। গত মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে ওই ছাত্রলীগ কর্মীর কক্ষ (৪৪০ নম্বর) পরিদর্শন করে বিদেশি ব্র্যান্ডের কয়েকটি মদের বোতলসহ মাদক গ্রহণের বেশকিছু সরঞ্জাম পাওয়া যায়। অভিযোগ উঠেছে— তিনি হলে নিয়মিত মাদক সেবন ও কেনা-বেচার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মাদকের সাথে সম্পৃক্ত ঐ ছাত্রলীগ কর্মীর নাম আশিকুজ্জামান জয়। তিনি শাখা ছাত্রলীগের উপপক্ষ বিজয়ের কর্মী ও ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী।
গত সোমবার (২২ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে মাদক সেবনের জের ধরে বিজয় গ্রুপের অনুসারীদের মধ্যে মারধরের ঘটনা ঘটলে আশিকুজ্জামানের মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে উঠে আসে। এ বিষয়ে জানতে তার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
একই সেশনের ও রাজনৈতিক সহকর্মী উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাসেল রাজ এ ব্যাপারে বলেন, সে মদ, গাঁজা থেকে শুরু করে সব ধরনের মাদকই সেবন করত। গত কয়েকদিন আগেও বেতবুনিয়া থেকে অনেকগুলো মদের বোতল নিয়ে এসেছে। তার কারণে আমাদের বদনাম হচ্ছিল। তাই, আমরা ব্যাচ মেট হিসেবে তাকে কয়েকবার সতর্ক করি, কিন্তু সে আমাদের কথায় কর্ণপাত না করে উল্টো বিভিন্ন কথা শোনায়।
এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আলী আরশাদ চৌধুরী বলেন, ৪৪০ নম্বর কক্ষ সিলগালা করা হয়েছে। আমরা নোটিশ দিয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চলবে। কেউ যেমন আইন হাতে তুলে নিতে পারবে না, তেমনি মাদকের সঙ্গেও জড়িত হতে পারবে না। কারো মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে শৃঙ্খলা কমিটি আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ অহিদুল আলম বলেন, সে মাদকের সঙ্গে জড়িত কিনা বিষয়টি খতিয়ে দেখে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য হল প্রভোস্টকে বলেছি। আমি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করবো না। মাদকের সঙ্গে কারো কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার ছাত্রত্ব থাকবে না।
হলে মাদক গ্রহণ এবং হল জুড়ে মাতলামির জন্য পরিচিত এমন আরো অনেকের ব্যাপারে ঐ হলে থাকা শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগের অনুসারীদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদের মধ্যে রয়েছে- সংস্কৃত বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুজাহিদ চৌধুরী, ইতিহাস বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. পলাশ চৌধুরী, মার্কেটিং বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহিম হোসাইন, লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরশিল আজিম নিলয়, নাট্যকলা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আওয়াল হোসাইন সোহাগ, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শোয়েব আতিক, ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের রাব্বি, সমাজতত্ত্ব বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাজমুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ ফারুকী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম ও সংস্কৃত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শুভ দাস রোহিত।
সময়ের আলো/আরআই