আজ আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস ২০২৪। মানবসেবায় অনন্য দায়িত্ব পালনকারী নার্সদের স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শনের দিন হিসেবে বিশ্বব্যাপী আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হবে। আজকের এই দিনে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষেই প্রতি বছর এইদিনে বিশ্বজুড়ে পালিত আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নার্স ছিলেন নারী সাহাবি রুফাইদা (রা.)। তিনি বানু খাজরাযের আসলাম গোত্রের সদস্য ছিলেন। এ সাহাবিয়্যা রাসুল (সা.)-এর মদিনায় আগমনের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। যারা রাসুল (সা.)-কে মদিনায় তাঁর আগমনের দিন অভ্যর্থনা জানান, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম।
আমাদের কাছে আধুনিক নার্সিং বা রোগী সেবার জনক ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ১৮৫০ সালে ক্রাইমিয়ার যুদ্ধে ফ্লোরেন্স আহত সৈন্যদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। মানবসেবার ইতিহাসে তিনি অমর। কিন্তু অনেকেই জানে না যে ফ্লোরেন্সের প্রায় ১ হাজার ২০০ বছর আগে মদিনার আনসার রমণীদের মধ্যে একজন মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করে ইসলামি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তার নাম, বিখ্যাত রমণী সাহাবি রুফাইদা আল আসলামিয়া (রা.)। তিনি আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সা.)-এর যুদ্ধে আর্ত ও আহতদের সেবিকা হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের তাঁবুতে তিনি তৈরি করেন ‘খিমাতু রুফাইদা’ বা রুফাইদার সেবাক্ষেত্র নামক অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র।
বনু খাজরায আসলাম গোষ্ঠীতে ৬২০ অব্দে রুফাইদার জন্ম হয়। তার পিতা সাদ আল আসলামি ছিলেন মদিনার একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। ছোট থেকেই রুফাইদা তার আব্বাকে সাহায্য করতেন নানা বিষয়ে। বলা যায়, নিজের আব্বার হাতেই তার রোগ নিরাময় ও চিকিৎসাবিজ্ঞান শেখা। তিনি যেন আজন্ম জানতেন তাকে মানুষের সেবা করতে হবে। সেই হিসেবেই নিজেকে তৈরি করেছিলেন রুফাইদা। শুধু তাই নয়, তিনিই মদিনায় প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আমাদের প্রিয় নবী যখন মদিনাতে পা রাখেন, রুফাইদাই অন্যতম একজন যিনি তাঁকে স্বাগত জানান। ইমাম বুখারি (র.) ‘আদাবুল মুফরাদ’ কিতাবে লিখেছেন, মসজিদে নববির পাশে তার একটি তাঁবু ছিল। যেখানে তিনি অসুস্থদের সেবাদান করতেন। খন্দকের যুদ্ধে সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.) আহত হলে রাসুল (সা.) তাকে সেই তাঁবুতে রেখে চিকিৎসার আদেশ দেন।
মদিনার আনসার-মুহাজিরদের অন্যান্য নারী সাহাবিদের তিনি নার্সিং প্রশিক্ষণ দেন। তার শিষ্য নারী সাহাবিরা বদর, উহুদ, খন্দক ও খায়বারসহ অন্যান্য জিহাদ-সংগ্রামগুলোতে অংশগ্রহণ করে আহতদের চিকিৎসা সেবা দান করতেন। কোমল হৃদয়ের কারণে তিনি অসুস্থ, অসহায় ও শিশুদের কল্যাণে নিজের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন। রাসুল (সা.) খায়বারের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন রুফাইদা (রা.) ও এক দল স্বেচ্ছাসেবী নার্স (নারী সাহাবি) তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চাই। আহতদের সেবা করার পাশাপাশি মুসলিমদের যতটুকু সম্ভব সাহায্যের চেষ্টা করব। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুমতি দিলেন। কেউ আহত হলে তিনি তাকে রুফাইদার তাঁবুতে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি ও তার স্বেচ্ছাসেবী ‘নার্স বাহিনী’ খুবই চমৎকারভাবে এ কাজ সম্পন্ন করেন। ফলে খুশি হয়ে রাসুল (সা.) খায়বার যুদ্ধের গনিমতের একটা অংশ রুফাইদা (রা.)-এর জন্য বরাদ্দ করেন। তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমদের সমান মর্যাদা (গনিমত) দেওয়া হয়েছিল।
রুফাইদা (রা.) ইসলামি ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তার সম্মানে আগা খান বিশ্ববিদ্যালয় একটি নার্সিং কলেজ স্থাপন করেছে। শুধু তাই নয়, বাহরাইনের রয়্যাল কলেজ অব সার্জন ইন আয়ারল্যান্ডের ছাত্রছাত্রীদের রুফাইদা আল আসলামিয়া পুরস্কার দেওয়া হয়। রুফাইদা জানতেন, সেবার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সংস্পর্শ পাওয়া যায়। সেই পথেই তিনি হেঁটে গেছেন আজীবন।
সময়ের আলো/আরএস/
চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক