সত্য ও মিথ্যা বিপরীতমুখী দুই বৈশিষ্ট্য। সত্য ও মিথ্যা কখনো এক হতে পারে না। সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী-পরস্পরবিরোধী দুটি স্বভাববৈশিষ্ট্য কোনো মুমিন একইসঙ্গে ধারণ করতে পারে না, যেমন আলো ও অন্ধকার একইসঙ্গে থাকতে পারে না। ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হলো সত্যকে গ্রহণ করা আর মিথ্যাকে বর্জন করা। নবীজি (সা.) স্বয়ং মিথ্যা বলেননি এবং মিথ্যা বলতে উপদেশও দেননি। কারণ মিথ্যাই হলো সব অনর্থের মূল। ঝগড়া-বিবাদ, হানাহানি, খুনোখুনি সব মিথ্যা থেকেই জন্ম হয়। মিথ্যাকে মূলোৎপাটন করতে না পারলে আদর্শ ও সভ্য সমাজ গঠন করা যাবে না। এ ছাড়া মিথ্যা দ্বারা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন সম্ভব নয়।
একটি মিথ্যা হাজার মিথ্যার জন্ম দেয়। আবার একটি মিথ্যাকে হাজার মিথ্যা দিয়েও ঢাকা যায় না। মিথ্যা প্রকাশিত হবেই। আর মিথ্যা প্রকাশ হলে মিথ্যাবাদী লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। মানব সমাজে ঘৃণিত হয়। তাই মুমিনকে সবসময় মিথ্যা পরিহার করে চলতে হবে। ঈমানদারের আচরণে মিথ্যাচারিতা কাম্য নয়। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেন, মুমিনের স্বভাবে খেয়ানত ও মিথ্যাচারিতা ব্যতীত সব ধরনের আচরণ থাকতে পারে (মুসনাদে আহমাদ : ২২৮২৭)। অন্য হাদিসে আছে, হজরত সাফওয়ান (রা.) বলেন, একদিন রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি ভীরু হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাঁকে আরও জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি কৃপণ হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি মিথ্যাবাদী হতে পারে? তিনি বললেন, না। (মালেক : ১৮৩২)
মিথ্যা বলা শয়তানের স্বভাব, মুমিনের স্বভাব নয়। মিথ্যা অসৎ কাজের জন্ম দেয়। মিথ্যা দ্বারা মানব সমাজ উপকৃত হয় না বরং বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, অরাজকতা ও অন্যায়ে ভরে উঠে পুরো সমাজ। ইহকাল-পরকাল উভয় জগতের উন্নতির জন্য মিথ্যাকে বর্জন করা উচিত। কারণ মিথ্যা বর্জনে বেহেশত নিহিত। যে যত বেশি মিথ্যাকে পরিহার করবে সে তত বেশি মানব সমাজে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে এবং মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হবে। সুতরাং অভিশপ্ত শয়তানের মিথ্যা স্বভাব কোনো মুমিন গ্রহণ করতে পারে না এবং তা মুমিনের জীবন গড়ার পাথেয়ও হতে পারে না। হাদিসে আছে, হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, শয়তান মানুষের
আকৃতি ধারণ করে কোনো সম্প্রদায়ের কাছে আসে এবং মিথ্যা কথা বলে। যখন সেই লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় তখন তাদের মধ্য থেকে কেউ বলে, আমি এ কথা এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, তার চেহারা চিনি। কিন্তু তার নাম জানি না। (মুসলিম : ১৭)
বর্তমানে মিথ্যা বলা মহামারির রূপ ধারণ করেছে। সমাজের সর্বত্রই মিথ্যার ছড়াছড়ি। মিথ্যা বলা মহাপাপ জানা সত্ত্বেও মানুষ অবলীলায় মিথ্যা কথা বলছে। অথচ মিথ্যা বলার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। পবিত্র কুরআনে মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-‘তাদের প্রতি আল্লাহর লানত যারা মিথ্যাবাদী’ (সুরা আলে ইমরান : ৬১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-‘তোমরা সর্বদা সত্য কথা বলো। কেননা সত্য কথা মানুষকে কল্যাণের পথ দেখায়। আর মানুষ সর্বদা সত্য কথা বলতে থাকলে এক পর্যায়ে আল্লাহর কাছে নাম লিখিত হয় ‘সিদ্দিক’ সত্যবাদী। আর তোমরা মিথ্যা পরিহার করো। কেননা মিথ্যা মানুষকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। আর সর্বদা মিথ্যা কথা বললে আল্লাহর দরবারে সে মিথ্যুক নামে খ্যাতি পায়।’ (মেশকাত : ৪৬১৩)
মিথ্যা বলা ইসলামে মহাপাপ ও কবিরা গুনাহ। আর এটি এমন এক নিকৃষ্ট মন্দ কাজ যখন লোকেরা মিথ্যা বলতে শুরু করে তখন ফেরেশতারা মিথ্যা কথার দুর্গন্ধে এক মাইল দূরে চলে যায়। এ বৈশিষ্ট্য মুমিনের স্বভাবজাত হতে পারে না। তাই মুমিনদের আত্মা ও মুখ সবসময় দুর্গন্ধময় মিথ্যা থেকে পরিশুদ্ধ থাকতে হবে। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো বান্দা মিথ্যা বলে, তখন মিথ্যার দুর্গন্ধে ফেরেশতা তার কাছ থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়।’ (তিরমিজি : ২১০০)