এখন থেকে ঠিক দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২২ সালের ৩ জুন দেশের বাজারে প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল ১৮-২২ টাকা। এক বছর আগে ২০২৩ সালের ৩ জুন আলু কেজি ছিল ৩৬-৪০ টাকা। আর গত সোমবার প্রতি কেজি আলুর দাম ৫৫-৬০ টাকা। এ তথ্য খোদ সরকার সংস্থা টিসিবির। অন্যদিকে কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে দেশে আলুর উৎপাদন হয় ১ কোটি ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩৫ টন। ২০২৩ সালে আলু উৎপাদন হয় ১ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার ৭৩৬ টন। আর চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কেটি ১৬ লাখ টন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) তথ্য অনুসারে, বছরে দেশে আলুর চাহিদা ৯০-৯৫ লাখ টন। সেই হিসাবে দেশে চাহিদার বিপরীতে ১০-১৫ লাখ টনের মতো আলু উদ্বৃত্ত হওয়ার কথা। তা হলে তো আলুর দাম না বেড়ে একেবারে ক্রেতার নাগালে থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার উল্টো। দেশের ইতিহাসে এক কেজি আলুর দাম এখন ৬০ টাকা ছাড়িয়েছে।
অথচ মোটা ও মাঝারি মানের এক কেজি চালের দামও এখন ৬০ টাকার নিচে। অর্থাৎ দেশে এখন চালের চেয়ে আলুর দাম বেশি। এই কয়েক দিন আগেও চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার সময় সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বলা হতো- চালের ওপর চাপ কমান, বেশি করে আলু খান। কিন্তু এখন ঘটেছে তার উল্টো। এক কেজি আলু কিনতেও ক্রেতার বুক কেঁপে উঠছে এখন। ক্রেতারা বাজারে গিয়ে আলুর দাম জিজ্ঞেস করলে বিক্রেতা যখন বলছেন, ৬০ টাকা কেজি- ক্রেতার মুখ দিয়ে তখন মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসছে-‘বালাই ষাট’।
মাত্র দুই বছর আগেও যেখানে আলুর দাম একেবারেই ক্রেতার নাগালে ছিল, উৎপাদন বেড়েছে, চাহিদার চেয়ে দেশে আলু উদ্বৃত্তও আছে- তা হলে আলু দাম এত বাড়ছে কেন। এর কারণ জানতে সরকারেরই একটি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বেশি আলু উৎপাদনের জেলাগুলোতে তদন্ত করে সম্প্রতি। সংস্থাটির মহাপরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামানের নেতৃত্বেও বেশ কয়েকটি জেলায় একেবারে উৎপাদক পর্যায়ে, ফড়িয়া পর্যায়ে, হিমাগার পর্যায়ে এবং পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের বাজার তদারকি করা হয়।
তদন্ত করে আলুর দাম বৃদ্ধির জন্য বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ ও সুপারিশ করে সংস্থাটি। এতে আলুর দাম বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, বিগত কয়েক বছর আলুর উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিরা কিনে নিচ্ছেন আলু।
এদের মধ্যে আছেন সরকারি চাকরিজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা হিমাগারের স্লিপ বাণিজ্যের মাধ্যমে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এমনকি আলু চাষের জন্য কৃষকের ঋণও চলে যাচ্ছে একশ্রেণির সিন্ডিকেটের পকেটে।
সব মিলে প্রতি কেজি আলুর খরচ ২০ টাকা: ভোক্তা অধিদফতরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে আলুর উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণসহ সবকিছু নিয়ে কেজিপ্রতি ব্যয় সর্বোচ্চ ২০ টাকা। এ আলু হিমাগার পর্যায় থেকে ২২ টাকা প্রতি কেজি বিক্রয় হলেও ফড়িয়াদের (এজেন্ট ও বেপারি) লাভ থাকে। কিন্তু বর্তমানে হিমাগার থেকেই প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকায়। সেই আলু পাইকারি বাজার হতে খুচরা ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে ক্রেতার ব্যাগে যাচ্ছে ৬০ টাকায়। অর্থাৎ ২০ টাকার আলুতে ৪০ টাকা মুনাফা করছে আলু সিন্ডিকেট। আর মুনাফার বেশি অংশ যাচ্ছে হিমাগারে নামে-বেনামে রাখা মৌসুমি আলু ব্যবসায়ী এবং হিমাগারের মালিকরা।
কৃষকের নামে বরাদ্দ ঋণ পায় না কৃষক: ভোক্তা অধিদফতরের তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা কৃষিঋণ প্রকৃত কৃষক পাচ্ছে না। হিমাগার মালিকরা কৃষকদের নামে প্রাপ্ত কৃষিঋণ অনৈতিকভাবে ব্যাংক থেকে তুলে তাদের নিয়োগ করা এজেন্টদের মাধ্যমে আলু উৎপাদন মৌসুমে দাদন প্রথার মতো কৃষকদের স্বল্প মূল্যে আলু বিক্রয় করতে বাধ্য করেন। এভাবে কৃষকরা হিমাগারের মালিক ও তাদের এজেন্টদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ছে।
কৃষকের কাছ থেকে ১০-১২ টাকায় কেনা হয় আলু: তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হিমাগারের মালিকদের এজেন্টের প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করে মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে আলু ক্রয় করে হিমাগারে সংরক্ষণ করে। অনেক সময় প্রভাবশালী এজেন্টরা প্রদান করা অগ্রিম ঋণের অর্থ অনৈতিক বিনিয়োগ করে কৃষককে জমি থেকেই আলু বিক্রি করতে বাধ্য করে। গত মৌসুমে কৃষকরা জমি থেকে মাত্র ১০-১২ টাকা প্রতি কেজি আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন। আবার হিমাগার কর্তৃপক্ষের নিয়োগ করা এজেন্টদের স্থানীয় প্রভাবের কারণে অনেক সময় সাধারণ কৃষক ব্যক্তিগতভাবে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে এজেন্টের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন। আর এই হিমাগারের এজেন্টরাই প্রত্যক্ষভাবে আলুর দর নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
হিমাগারে চলে স্লিপ বাণিজ্য: জানা যায়, হিমাগারে রক্ষিত আলুর জন্য হিমাগার থেকে যে সিøপ প্রদান করা হয় তাতে শুধু কৃষক অথবা মজুদদারের নাম ও রক্ষিত আলুর বস্তার সংখ্যা উল্লেখ থাকে। এই স্লিপ যার কাছে থাকবে তিনিই আলুর মালিক বলে বিবেচিত হন। হিমাগারের স্লিপে আলু সংরক্ষণকারীর কোনো ঠিকানা বা মোবাইল নাম্বারও উল্লেখ থাকে না, যাতে প্রকৃত যে ব্যক্তি আলু কিনে রেখেছেন তার কোনো হদিস না মেলে। স্লিপ অনুসন্ধান করে প্রকৃত মালিকের তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। এর আড়ালে থাকা মালিকদের হাতে চলে গেছে সিংহভাগ আলু এবং তারাই এখন আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
হিমাগার মালিকদের নেতাও বলছেন আলুর কোনো সংকট নেই: এদিকে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, এ বছর আলুর মূল্য অস্বাভাবিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে যা প্রতি কেজি ৬০ টাকা ছাড়িয়েছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আলুর উৎপাদন কম হলেও চাহিদা অনুযায়ী তা পর্যাপ্ত রয়েছে এবং আলুর কোনো সংকট নেই। ভোক্তা বা খুচরা পর্যায়ে আলুর মূল্য ৩৬-৪০ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। তবুও কেন দাম এত বাড়ছে তার সঠিক কোনো কারণ আমিও খুঁজে পাচ্ছি না।
আলু ব্যবসা এখন প্রকৃত আলু ব্যবসায়ীদের হাতে নেই : এদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম শফিকুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, আলু ব্যবসা এখন প্রকৃত আলু ব্যবসায়ীদের হাতে নেই, এতে আলুর বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। এখন অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আলুর মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। চাহিদার বিপরীতে যে পরিমাণে আলু উৎপাদন হয়েছে তা পর্যাপ্ত বিধায় আলুর মূল্য বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। আলুর কোনো ঘাটতি নেই। কোল্ড স্টোরেজেও এখন পর্যাপ্ত আলুর মজুদ রয়েছে। তারপরও আলুর দাম কমছে না। আমরা বাজার মনিটরিং করছি। তবে আলুর দাম কমিয়ে আনার জন্য আলু আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে। আলু আমদানি করা হলেই সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে।
যে যার ইচ্ছেমতো লুটপাট করছে বাজারে: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ বিষয়ে সময়ের আলোকে বলেন, সরকারের তথ্যই যখন বলছে, দেশে চাহিদার চেয়ে আলুর উৎপাদন অনেক বেশি সেখানে আলুর বাজার এত বেসামাল কীভাবে হয়। তার মানে বুঝতে হবে এখানে কোনো সমস্যা আছে। আলুর বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে এবং তারাই দাম বাড়াচ্ছে আলুর। আসলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে- ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা মনে করছে, দেশটা মগের মুল্লুক। তাই যে যার ইচ্ছেমতো জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে লুটপাট করছে। বাজারে কোনো জবাবদিহি নেই। ভোগ্যপণ্যের বাজার এখন অনেকটা এতিমের মতো- যেন দেখার নেই কেউ।’
সিন্ডিকেটের কবলে রংপুরে আলুর বাজার: সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো থেকে জানান, জুনের শুরুতে কার্ডিনাল আলুর দাম কেজিতে ২০-২৫ টাকা বেড়ে উঠেছে ৫৫ টাকার ওপরে। অন্যদিকে শিল আলুসহ অন্যান্য দেশি আলু বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭৫ টাকায়। রংপুরের আলুর ব্যাবসায়ী আলহাজ মোজাফফর হোসেনের অভিযোগ, রংপুর অঞ্চলে হিমাগারের ভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশে ১৮০-২২০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হলেও রংপুর অঞ্চলে নেওয়া হচ্ছে ৩৮০-৩৮৫ টাকা।
রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট রেজাউল ইসলাম মিলন বলেন, বর্তমানে কৃষকের কাছে আলু নেই, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি সরকার এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সারা দেশে হিমাগারে এক রেট করার দাবি জানান।
মুন্সীগঞ্জে দেড় মাসে আলুর দাম বেড়েছে ৬ টাকা: মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জুয়েল রানা জানান, মুন্সীগঞ্জে দেড় মাসের ব্যবধানে আলুর দাম বেড়েছে ৬ টাকা। এতে ভোগান্তিতে রয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। দেড় মাস আগে এক বস্তা আলু (৫৫ কেজি) পাইকারি দরে কোল্ড স্টোরেজ থেকে খুচরা ব্যবসায়ীদের কিনতে খরচ হতো ২৩১০ টাকা। কেজিপ্রতি আলুর দাম কিনতে খরচ হতো ৪২ টাকা, বিক্রি হতো ৪৫ টাকা। বর্তমানে এক বস্তা (৫৫ কেজি) কিনতে খরচ হয় ২৬৪০ টাকা। পাইকারি দরে কেজিপ্রতি খরচ হয় ৪৮ টাকা, বিক্রি হয় ৫৫ টাকা। মুন্সীগঞ্জ কাঁচা বাজারে আলু বিক্রেতা মো. আহসান উল্লাহ বলেন, আলুর দাম বাড়লে আমাদের বেশি ঝামেলা। কাস্টমারকে নানাভাবে বোঝাতে হয়। কমুক বা বাড়ুক আমাদের লাভ একই থাকে।
সময়ের আলো/জিকে