দেশে বর্তমানে জনশুমারি ও গৃহগণনার ভিত্তিতে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ১৫ লাখের ওপরে। এর আগে যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’-এ চূড়ান্ত জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। এর মধ্যে জনসংখ্যা স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। আর ২০২২ সালে ছিল ১ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। জন্মনিয়ন্ত্রণে কিছুটা ধারাবাহিকতা থাকলেও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার কমছে। দেশে ২০২৩ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৬২ দশমিক ১ শতাংশ। যা ২০১৫ সালের পর এই হার সর্বনিম্ন। অথচ ২০২২ সালে এই পদ্বতির হার ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তার আগের বছর ছিল ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিবিএস তথ্য মতে, দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের অপূর্ণ চাহিদা ২০২২ সালের (১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ) তুলনায় হ্রাস পেয়ে ২০২৩ সালে হয়েছে ১৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত আট বছর ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার একই রয়েছে। অন্যদিকে বেড়েছে বাল্যবিয়ে ও কিশোরী গর্ভধারণের হার, গর্ভপাতের হার, অস্ত্রোপচার পদ্ধতিতে প্রসবের হার, স্থূল মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর অনুপাত হার এবং পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রায় ৯৪ শতাংশ দম্পতিই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা রাখেন। কিন্তু ব্যবহারের হার ৬০-৬২ শতাংশ। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার কম হওয়ার আরেকটি কারণ হলো দেশে বর্তমানে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট চলছে। জেলা-উপজেলা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীসহ মা ও শিশু স্বাস্থ্য ওষুধ সামগ্রীর সরকারি মজুদ একেবারেই শূন্য। কোনো উপজেলায় খাবার বড়ি থাকলেও ইনজেকশন নেই। কোনো উপজেলায় কনডম বা পিল থাকলেও গর্ভনিরোধক ডিভাইস (আইইউডি, ইমপ্ল্যান্ট) ইনজেকশন ও ইমপ্ল্যান্ট নেই। তদারকির অভাবসহ নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির হার বাড়ছে না।
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। বৃহৎ জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। তার মানে জনসংখ্যার মোট প্রজনন হার আগামী ১০ বছরের মধ্যেই ২ শতাংশের অনেক নিচে নিয়ে আসতে হলে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হারকে ১ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। আর এ জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, দারিদ্র্য ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দাম বাড়ার কারণে দম্পতিদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নেওয়ার প্রবণতা যেমন কমেছে, তেমনি জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। একইভাবে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়নি, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বড় বাধা হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা সেবাগ্রহীতার হার বৃদ্ধি পেলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমে, মায়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ রোধ হয়। তাই বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে পরিবার পরিকল্পনার বিকল্প নেই। কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী যথাযথভাবে বিতরণ করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়বে। এর প্রভাব হয়তো তাৎক্ষণিক বোঝা যায় না। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু এবং জনসংখ্যাও কাক্সিক্ষত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। অর্থাৎ টিএফআর বৃদ্ধি পাবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে তা ম্লান হতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস’। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উপাত্ত ব্যবহার করি, সাম্যের ভিত্তিতে সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ি’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করা হবে।
বিবিএসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের সবশেষ তথ্য বলছে, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং বরিশালে সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৭৯ শতাংশ। আর ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৬২ দশমিক ২ শতাংশ। বর্তমানে তা রয়েছে ৬২ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ বাড়েনি বরং কমেছে। একইভাবে গত কয়েক বছরে বাল্যবিয়ের হার (১৮ বছর বয়সি) প্রায় ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোতে ১৮ বছরের আগে গর্ভধারণের প্রবণতা বেশি। এ ছাড়াও গত পাঁচ বছরে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের হার খুব একটা বাড়েনি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বড় অংশই নারী। কিন্তু আমাদের দেশে পরিবার পরিকল্পনায় সাফল্য থাকলেও এখনও দক্ষিণ এশিয়ায় বাল্যবিয়ে ও কিশোরী গর্ভধারণে শীর্ষে। আর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ না করার সঙ্গে অল্প বয়সে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের শঙ্কা বাড়ে। এতে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ে। অনেক বছর ধরে বাল্যবিয়ে নিয়ে কাজ করলেও এটি নির্মূল হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিয়ে নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। কিন্তু তার আগেই করতে হবে। কারণ আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নেওয়ার প্রবেশগম্যতা ও সরবরাহ দুটি ক্ষেত্রেই সমস্যা রয়েছে। চর, হাওরসহ দুর্গম অঞ্চলে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সরকারি সেবার ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়াও সামাজিক মূল্যবোধ, দারিদ্র্য, ক্লাইমেট চেঞ্জসহ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত অল্প বয়সে বিয়ে এবং মা হওয়া। এ ছাড়া প্রজনন স্বাস্থ্য হার কমানো সম্ভব হয়নি। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্বতির হারও একটি জায়গায় গিয়ে স্থবির হয়েছে। তাই জন্মনিরোধ পদ্ধতিগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা মোকাবিলায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার কমে যাওয়ার পেছনে সরকারি সেবার মান ও মনোযোগ কমে যাওয়াকে দায়ী করে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল সময়ের আলোকে বলেন, সুস্থ জীবন পরিচালনা ও ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ড নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা জরুরি। আর পরিবার পরিকল্পনার একটি অংশ হচ্ছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো-জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সরকারের এখন কোনো মনোযোগ নেই। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভালোই ছিল কিন্তু এর পর থেকে কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ ছাড়াও অসচেতনতা, দারিদ্র্য এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দাম বাড়ার কারণে দম্পতিদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নেওয়ার প্রবণতা কমেছে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৭২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া, কিন্তু পারিনি। এখানে আর্থিক কোনো ঘাটতি নেই। প্রায়ই জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতি দেখা যায়। গত বছরের নভেম্বর থেকে এ বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে খাওয়ার বড়ি ও ইনজেকটেবল পদ্ধতির (ইনজেকশনের মাধ্যমে নেওয়া পদ্ধতি) সরবরাহ ছিল না। এই নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই এবং কারও চাকরিও যাবে না।
তিনি বলেন, জনসংখ্যা কার্যক্রম কেন মুখ থুবড়ে পড়েছে, তা ভালোভাবে অনুসন্ধান করা উচিত। কারণ জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার কমলে গর্ভপাত ও গর্ভপাতের কারণে মৃত্যু বাড়ার আশঙ্কা থাকে। দেশে ২০১৬ সালে গর্ভপাতে মৃত্যু ৬ শতাংশ ছিল, যা এখন বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি বেড়েছে। ভবিষ্যতে উন্নতি করতে হলে প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্যে নজর দিতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে প্রবেশগম্যতা ও সরবরাহ বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের সংস্থাকে এ কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে এবং সামগ্রিক কাজে নজরদারি বাড়াতে হবে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিচালক (আইইএম) ও লাইন ডাইরেক্টর মীর সাজেদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহীতার হার বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা, পরিকল্পিত পরিবার গঠন, মা ও শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, প্রসবকালীন এবং প্রসব পরবর্তী সেবাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে সরকার। কারণ টেকসই উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
সময়ের আলো/আরএস/