ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ। এতে কমপক্ষে দুই শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হয়েছে, আহতদের মধ্যে অর্ধশতাধিক অধিক নারী শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। আহত শিক্ষার্থীদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হলে সেখানে হামলা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সোমবার (১৫ জুলাই) বেলা সাড়ে ১২টা থেকে মিছিল নিয়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এসময় মিছিল নিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা কলেজ ও নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীরা। এসময় বেলা আড়াইটা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সেখান থেকে মিছিল নিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিকেল ৩ টা নাগাদ আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিজয় একাত্তর পৌছালে বিজয় একাত্তর হলের বিভিন্ন ফ্লোরে অবস্থানরত ছাত্রলীগের কর্মীরা ইট ও কাচের বোতল ছুড়ে মারতে থাকে। আরেকটি অংশ নিচ থেকে ইট ছুড়তে থাকে। পরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে টিএসসিতে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়। আন্দোলনকারীদের ধাওয়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটে। এসময় আন্দোলনকারীদের বিজয় একাত্তর হলের গেট-গ্লাসে ভাংচুর চালানো হয়। দু’পক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত।
পরবর্তীতে বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান শান্ত কাঠ-রড-বাঁশ হাতে ও হেলমেট পড়ে হল ফটকে অবস্থান নেন। একইসময় জিয়া হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা সংঘটিত হয়ে বেরিয়ে আসে। জসীমউদ্দিন হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ও সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে এই তিন হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে ধাওয়া দেয়। তাদের ধাওয়ায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এসময় আন্দোলনকারী কয়েকজনকে রড বাঁশ নিয়ে বেড়ধক পিটুনি দিতে দেখা যায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের।
শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে মলচত্বরের দিকে চলে যান।এদিকে আগে থেকেই মধুর ক্যান্টিনে লাঠিসোটা, স্টিলের পাইপ, হকিস্টিক, মোটা কাঠ নিয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি রাজিবুল ইসলাম বাপ্পি নেতা-কর্মীদের নিয়ে অবস্থান নেন। তারা প্রায় সবাই হেলমেট পরিহিত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা মলচত্বরে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যাডোর দিক থেকে তাদের ওপর হামলা চালান তারা। এ ছাড়াও সূর্যসেন হল, প্রশাসনিক ভবন, ভিসি চত্বর থেকে বিপুল সংখ্যক বহিরাগতরা লাঠিসোটা, স্টিলের পাইপ নিয়ে হামলে পড়লে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর। তখন তারা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।
হামলা থেকে বাঁচতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে নারী শিক্ষার্থীরা পার্কিং করা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে আশ্রয় নিলে সেখান থেকে তাদের নামিয়ে হামলা করতে দেখা যায় মহানগর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের। হামলা পরবর্তী ছত্রভঙ্গ হয়ে যান শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোড ও নীলক্ষেত এলাকায় দিয়ে বের হয়ে যান আন্দোলনকারীরা। এরপর দীর্ঘসময় ক্যাম্পাসে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় ছাত্রলীগ।
সরেজমিনে বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এসএম ছাত্রলীগ, জগন্নাথ হল ছাত্রলীগ, মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হকিস্টিক, লাঠি নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যায়। এছাড়া নীলক্ষেত এলাকায় লাঠি-হকস্টিক নিয়ে স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়।
এর কিছুক্ষণ পর রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে ছাত্রলীগের মহানগরের নেতা-কর্মী এবং বহিরাগতরা ঢামেকে যান। আহত শিক্ষার্থীদের যারা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেছেন, তাঁদের সেখান থেকে ধাওয়া দিয়ে বের করে দিয়েছেন ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে তাঁদের বের করে দেন।
এরপর ঢাকা মেডিকেলের সামনের সড়কে ছাত্রলীগ নেতা–কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
দিনভর সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর বিকেলে সোয়া ৫ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলে অবস্থান নেয় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের একাংশ। অন্যদিকে দোয়েল চত্বর-ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। সংঘর্ষ চলাকালে হলের বাইরে বিশের অধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটনা ঘটে।
সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় দোয়েল চত্বরে দেখা যায়, শহীদুল্লাহ হলের ছাদ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এ কারণে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সামনে এগোতে পারছেন না। পরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দোয়েল চত্বরে জড়ো হচ্ছেন।
সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যরা আসেন।বর্তমানে এক পাশে পুলিশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ঘিরে রেখেছে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শহীদুল্লাহ্ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাবেদ হোসেন কয়েকজন হাউস টিউটরসহ শিক্ষার্থীদেরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। এসময় শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন প্রভোস্ট। তার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ সাংবাদিকদের বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলায় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছেন। এর বাইরে অন্যান্য হাসপাতালেও আহত অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ক্ছেন।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার বিকাল ৫টায় প্রভোস্ট কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল-এর সভাপতিত্বে এ সভায় বিভিন্ন হলের প্রভোস্টরা উপস্থিত ছিলেন। রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের র কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার জন্য ৫ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব হলে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করবেন। প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানে সার্বক্ষণিকভাবে হলে অবস্থান করবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। হলসমূহে কোনো বহিরাগত অবস্থান করতে পারবেন না। যেকোনো ধরনের গুজব ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানানো হয় ও সকলকে নাশকতামূলক কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য বলা হয়। কেউ নাশতকতামূলক কাজে জড়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সময়ের আলো/জেডআই