মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। অনেক সময়ই মানুষ ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় অপরাধে ও পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আল্লাহর বিধানের সীমা লঙ্ঘন করে বসে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বান্দার সেসব ভুল সংশোধনের জন্য এবং স্বীয় অপরাধ থেকে মুক্তি লাভের জন্য সুযোগ করে দিয়েছেন। আর সেই মুক্তির পথ হলো তওবা। এ তওবার মাধ্যমে বান্দা আবার নিষ্পাপ জীবনে ফিরে আসে। তওবাই একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য ও মাগফিরাত লাভের অনন্য উপায়। যদি মানুষ পৃথিবীতে কোনো পাপ কাজ না-ই করে তা হলে সে আল্লাহর সামনে অনুতপ্ত হবে কীভাবে! মানুষ যেন আল্লাহর সামনে অনুতপ্ত হয়, অবনত হয় এবং সেজদায় লুটিয়ে পড়ে সে জন্যই তওবার বিধান দিয়েছেন আল্লাহ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত-আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা পাপ কাজে লিপ্ত না হতে, তা হলে আল্লাহ তোমাদের পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করে তোমাদের পরিবর্তে এমন এক জাতিকে নিয়ে আসতেন, যারা গুনাহ করবে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন এবং গুনাহ মাফ করবেন।’ (মুসলিম : ২৭৪৯)
মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য। মানুষ সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করবে, আল্লাহর গোলামিতে নিবেদিত থাকবে আল্লাহ তায়ালা এটাই চান। এমনকি কখনো গুনাহ ও পাপ হয়ে গেলেও যেন আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়ে তওবা ও কান্নাকাটি করে, পাপমুক্তি ও পরিশুদ্ধি অর্জনে কাকুতি-মিনতি করে-এ দৃশ্য আল্লাহর কাছে অনেক পছন্দনীয়। একটি সহিহ হাদিসে বান্দার তওবায় আল্লাহ কেমন খুশি হন সেই চিত্র বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয় বান্দার তওবায় আল্লাহ তোমাদের ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক আনন্দিত হন, যে ব্যক্তি বিজন মরু প্রান্তরে উট হারিয়ে ফেলেছে। যে উটের পিঠে তার সফরের পাথেয় ও খাদ্যপানীয় ছিল। উট হারানোর কারণে হতাশ হয়ে গাছের ছায়ায় এসে শুয়ে পড়ল। এমন কঠিন অবস্থায় সে হঠাৎ দেখতে পেল তার উট পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে উটের লাগাম ধরে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বলে ফেলল-ইয়া আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা আমি তোমার প্রভু! আসলে অতি আনন্দের কারণে সে এভাবে ভুল কথা বলে ফেলেছে (কোনো ব্যক্তি তওবা করলে আল্লাহ এমন আনন্দিত হন)।’ (মুসলিম : ২৭৪৭)
তওবা শব্দটি আরবি। এর আভিধানিক অর্থ হলো অনুশোচনা বা পুনরায় পাপ না করার সংকল্প। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় নিজের কৃত অপরাধের প্রতি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতে অপরাধ বা গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করাকে তওবা বলে। আর গুনাহর কাজ সংঘটিত হওয়ার পরপরই মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়াকে সালাতুত তওবা বা তওবার নামাজ বলে। তবে এই নামাজের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব। তওবার নামাজ অন্যান্য নফল নামাজের মতো করে আদায় করবে। এর জন্য পৃথক কোনো নিয়ম নেই। আর নিষিদ্ধ ও মাকরুহ ওয়াক্ত ব্যতীত যেকোনো সময় তওবার নামাজ পড়া যাবে।
আল্লাহ তায়ালা মহান করুণাময় ও দয়ালু। তিনি বান্দাকে জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য তওবার বিধান রেখেছেন। যাতে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে পাপমুক্ত হতে পারে এবং দোজখের আজাব থেকে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, আন্তরিক তওবা। আশা করা যায় তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশে ঝরনাগুলো প্রবাহিত হয়। সেদিন আল্লাহ তায়ালা নবী ও তাঁর মুমিন বান্দাদের অপদস্থ করবেন না। তাদের নুর তাদের সম্মুখে ও ডান পাশে ধাবিত হবে, তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের নুরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান’ (সুরা তাহরিম : ৮)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো।’ (সুরা নুর : ৩১)
নবীজি (সা.) তাঁর উম্মতের কেউ গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়লে তার পাপমুক্তির জন্য তওবার নামাজের নিয়ম দেখিয়ে গেছেন। এ তওবার নামাজ গুনাহ মার্জনার শ্রেষ্ঠ উপায়। কারণ উম্মতরা নিষ্পাপ নয়। তাদের মধ্যে অন্যায়, অবিচার, অপরাধ ইত্যাদি সংঘটিত হবে কিন্তু সেই অপরাধ থেকে তওবা বা তওবার নামাজের মাধ্যমে নিজের কৃত মন্দ কাজের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে। এ নামাজ হলো বান্দার পাপমুক্তির চাবিস্বরূপ। হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যখন কোনো বান্দা গুনাহ করার পর সুন্দরভাবে ওজু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যায় এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তেগফার করে তখন অবশ্যই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন’ (আবু দাউদ : ১৫২১)।
অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন কোনো গুনাহ করে ফেলে, অতঃপর সে দাঁড়িয়ে ওজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে তখন আল্লাহ তায়ালা অবশ্য তাকে ক্ষমা করে দেন। তারপর রাসুল (সা.) এই আয়াতটি পাঠ করলেন, মুত্তাকি তারাই, যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা কোনো মন্দ কাজে জড়িয়ে নিজের ওপর জুলুম করে বসলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে।’ (তিরমিজি : ৪০৮)
রাসুল (সা.) নিষ্পাপ ছিলেন এবং পাপমুক্ত জীবনযাপন করতেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এরপরও নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি সহকারে তওবা করতেন। তিনি এ জন্য তওবা করতেন যে, যাতে নবীজির পবিত্র অন্তর আল্লাহর দরবারে হাজির থাকে। আল্লাহর দরবার থেকে অন্য দিকে গাফেল না হয়। একইভাবে সাহাবারাও আল্লাহর ভয়ে তওবা করতেন। এমনকি নবীজি দৈনিক একশবার তওবা করতেন। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে মানব জাতি! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। নিশ্চয় আমি দৈনিক একশবার তাঁর কাছে তওবা করি’ (মুসলিম : ৭০৩৪)। রাসুল আরও বলেন, ‘গুনাহ থেকে তওবাকারী ওই ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনোই গুনাহ নেই’ (ইবনে মাজাহ : ৪৩৯১)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে পাপমুক্ত জীবনযাপনের তওফিক দান করুন। ভুলে কখনো পাপ কাজ হয়ে গেলে যেন তওবার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হতে পারি সে তওফিকও দান করেন।
সময়ের আলো/আরএস/