চিকিৎসা চলছে ধার-দেনায়

গোলাম মোস্তফা

জাতীয়

পেটের মধ্যে গুলি লেগেছে জাফর সরদারের। এখনও বের করতে পারেননি চিকিৎসকরা। হাত চোখ ও পেটজুড়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

2024-08-16T03:02:03+00:00
2024-08-16T07:57:24+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
চিকিৎসা চলছে ধার-দেনায়
আন্দোলনে আহতদের অনেকে ভর্তি ঢামেকে
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৪, ৩:০২ এএম  আপডেট: ১৬.০৮.২০২৪ ৭:৫৭ এএম
চিকিৎসা চলছে ধার-দেনায়
পেটের মধ্যে গুলি লেগেছে জাফর সরদারের। এখনও বের করতে পারেননি চিকিৎসকরা। হাত চোখ ও পেটজুড়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেকে) হাসপাতালের ১০১নং ওয়ার্ডের বিছানায় ব্যথায় ছটফট করছিলেন জাফর। 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, আমার কী অপরাধ ছিল, কেন আমাকে গুলি করা হলো। আমি কবে সুস্থ হবো। কখন গুলি বের করা হবে। আমি তো আর সহ্য করতে পারছি না। আমারে অন্য হাসপাতালে নিয়ে তাড়াতাড়ি গুলি বের কর। পেটের মধ্যে গুলি ঠাটাচ্ছে। পাশেই বসে তার স্ত্রী উষা খাতুন মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন আর বলছেন, অত টাহা কই পামু, যে তোমারে অন্যখানে নিয়ে চিকিৎসা করামু। ট্যাহার জন্য ওষুধ কিনবার পারছি না, পরীক্ষা করাইবার পারছি না। 

মা-বাবার এ অবস্থা দেখে তাদের চার বছরের শিশুটিও বলছে-বাবা তুমি কাইন্দো না, তুমি বালা হইয়া যাইবা। এই বলে বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট শিশুটি। তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে আহত হন জাফর। নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লায় তাদের বাসা। পেশায় তিনি রিকশাচালক। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের মতো ওই দিন তিনি রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন। রিকশা গ্যারেজে রেখে বাসায় যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরে তাকে ভর্তি করা হয় ঢামেকে।

জাফরের স্ত্রী উষা খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ। স্বামীর রিকশা চালানোর সামান্য আয়ে পাঁচ সন্তান নিয়ে কোনোমতে খেয়েপরে বেঁচে ছিলাম। এখানে ভর্তি করানোর পর এলাকার একজনের কাছ থেকে সুদে ৫০ হাজার টাকা নিয়া চিকিৎসা করাচ্ছি। সেই টাকাও শেষ। সেই সুদের ইন্টারেস্টের টাকার জন্য বারবার ফোন দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত মানুষের কাছ মাত্র ৩ হাজার টাকা সাহায্য পেয়েছি। টাকার জন্য ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিছুই করাতে পারছি না। বাসার মধ্যে ছেলেমেয়েরা না খেয়ে দিন পার করছে। কীভাবে কী করব-কিছুই বুঝতাছি না।

জাফর বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। আর কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে আর কত খরচ হবে জানি না। সুস্থ হতে পারব কি-না তাও জানি না। আমার একমাত্র সম্বল ছিল রিকশা সেটাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কীভাবে সংসার চলবে আর কীভাবে বাচ্চাগুলোকে মানুষ করব-বলেও কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

শুধু জাফরই নন ঢামেকের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডের তিন ওয়ার্ডে এখনও প্রায় অর্ধশত রোগী ভর্তি রয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় হতাহত হয়ে ঢামেকে চিকিৎসা নিতে আসেন রোগীরা। তাদের কারও বুকে, পেটে, কারও হাতে কিংবা পায়ে, কারও মাথায় গুলির জখম রয়েছে। আর আহতদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। আর নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য এ আহতদের চিকিৎসা খরচ বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। ধার-দেনা, সুদে ঋণ নিয়ে, ডিপিএস ভেঙে (মাসিক জমাভিত্তিক সঞ্চয়ী হিসাব), জমি বন্ধক কিংবা আত্মীয়দের সাহায্য নিয়ে আহতদের চিকিৎসা করাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। 

বুধবার সকালে সরেজমিনে ঘুরে এবং আহত রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংঘর্ষে আহতদের বেশিরভাগই গুলিবিদ্ধ রোগী। তাদের মধ্যে কেউ শিক্ষার্থী, আবার কেউ ভ্যান বা রিকশাচালক, শ্রমিক কিংবা দিনমজুর, পাঠাও চালক ও স্বল্পবেতনের চাকরিজীবীও রয়েছে। আহতদের অনেককেই বিছানায় কাতরাতে দেখা গেছে। আর গুলিতে ঝাঁজরা হওয়া শরীরের বিভিন্ন বীভৎসতার দেখে আহত রোগী থেকে শুরু পরিবারের সবাই এক ধরনের ট্রমায় ভুগছেন। আহতদের মধ্যে প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ হওয়ায় টাকার অভাবে ঠিকমতে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। আবার কেউ সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন আহত স্বজনকে সুস্থ করে তুলতে। ধারদেনা করে চলছে আহতদের চিকিৎসা খরচ।

তাদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকেও তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে না। কিছু রাজনৈতিক দল, এনজিও সংস্থা এবং কিছু ব্যক্তিগতভাবে সামান্য কিছু সাহায্য দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ফলে অধিকাংশ আহতের পরিবারেই চলছে নীরব কান্না। তাদের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে স্বজনদের ঋণের বোঝা দিনে দিনে ভারী হচ্ছে। এমনকি একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আহত হওয়ায় পুরো পরিবার থমকে গেছে। তাই চিকিৎসার খরচ জোগান দিতে এবং ভবিষ্যতের পথচলা ভাবিয়ে তুলছে তাদের। এ অবস্থায় সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

চিকিৎসকরা বলছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতার কারণে আহতদের অনেকের অবস্থা খুবই খারাপ। তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে কি-না সেটা নিয়ে আবার অনেকেই ভীত-শঙ্কিত। কারণ এখানে অনেকের হাতে-পায়ে বুকে, পেটে গুলি লেগেছে। আবার কারও কারও পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ফলে এ সব রোগীকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে এবং সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে। আর গুরুতর আহত হওয়া রোগীদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন যেমন বাধাগ্রস্ত হবে তেমনই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলেও মত দেন চিকিৎসকরা।

ঢামেকের ক্যাজুয়ালটি এক নম্বর ওয়ার্ডে শয্যায় শুয়ে প্রচণ্ড ব্যথায় ছটফট করে কাঁদছিলেন ক্লাস টেনের শিক্ষার্থী নিশাদ হোসেন। তার বাড়ি বরগুনা সদরে। তিনি ঢাকায় বেড়াতে এসে গত ৫ আগস্টে মধ্য বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ হন। তার ঊরুতে গুলি লাগে। আহত হওয়ার স্থান লোহার রড দিয়ে আটকানো।

তার পরিবারের সদস্যরা জানান, পচন ধরায় এবং ক্ষতস্থানের ঘা না শুকানোর কারণে এখনও গুলি ভেতরে রয়ে গেছে। ঘা না শুকালে গুলি বের করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

নিশাদ হোসেন সময়ের আলোকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের পাঁচজনের সংসার। গুলিবিদ্ধ হওয়ায় আমার পুরো পরিবার থমকে গেছে। আমি কি আবার হেঁটে স্কুলে যেতে পারব। নাকি আমার পা কেটে ফেলবে? চিকিৎসা খরচ বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এলাকার মানুষ এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ করে চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছি। যেদিন ভর্তি হয়েছি সেইদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং লোহার রড কিনতেই ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬০/৭০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এভাবে আর কতদিন চলবে। ছাত্ররা ৮/৯ হাজার টাকা সহযোগিতা করেছিল। আর কেউ কিছুই দেয়নি। সরকারের কাছে থেকে কোনো ধরনের সাহায্য পাচ্ছি না। তা হলে কি আমার চিকিৎসা হবে না। আমি সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাব?

এই রোগীর পাশের শয্যায় কাতরাচ্ছিলেন রুবেল মিয়া। তিনি মুগদা এলাকায় গত ২০ জুলাই বাসা থেকে বের হয়ে পানি আনতে গিয়েছিলেন। ওই সময় তার বুকে গুলি লাগে। তার অবস্থা খুবই খারাপ। 

রুবেলের মা ডালিয়া বেগম ছেলের এই অবস্থায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে সময়ের আলোকে বলেন, আমার ছেলে ওয়ার্কশপে কাজ করত। তার কী অপরাধ ছিল, কেন গুলি করে এই অবস্থা করা হলো। আমি তাদের বিচার চাই।

তিনি বলেন, ছেলের সামান্য আয়েই আমার সংসার চলত। এখন ছেলে যদি সুস্থ না হয় তা হলে সংসার কে চালাবে। এখানে ভর্তি হওয়ার পর ধার-কর্জ করে চিকিৎসা করাচ্ছি। একটা ডিপিএস ছিল সেটি ভেঙে ওষুধপত্র সিটি স্ক্যান করাইছি। এর মধ্যে মাত্র ১৫/১৬ হাজার টাকা সাহায্য পেয়েছি। এখন টাকার জন্য ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। আমি সরকারের কাছে সাহায্যের দ্রুত আবেদন করছি।

ঢামেকের ক্যাজুয়ালটি ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ইসরাফিল আলম। তিনি মাগুরার মোহাম্মদপুর এলাকায় ৩ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হন। 

তার মা লাকী আক্তার সময়ের আলোকে বলেন, আমার ছেলের কাঁধে ও হাতে গুলি লেগেছে। কিন্তু গুলি এখনও ভেতরে রয়েছে। কবে বের করা হবে কিছুই জানি না। ছেলের চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া সব বন্ধ। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কই পাব।

তিনি জানান, যেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েছিল শুধু সেদিনই ঢাকায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিতে হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত এক লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। আমার স্বামী ভ্যানচালক। এত টাকা দিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে ধার-দেনা করে কোনোরকমে খরচ চালাচ্ছি। তবু সুস্থ হতে পারবে কি না তাও জানি না। আর রাজনৈতিক দল ও বিভিন্নজনের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ২০ হাজার টাকা সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

ক্যাজুয়ালটি ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি উবারচালক মো. সুজন মোল্লা। তিনি ১৯ জুলাই মিরপুর-১০-এ গুলিবিদ্ধ হন। দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এখনও গুলি বের করা যায়নি। ক্ষতস্থানের জায়গা ঘা হয়ে গর্ত হয়ে গেছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ কেন গুলি চালাল। আমি আল্লার কাছে বিচার চাই। আমাদের কারও হাতে জমানো নগদ টাকা নেই। ধার-কর্জ করে চিকিৎসা চলছে। টাকার অভাবে ক্লিনিকে ভর্তি হতে পারছি না। এখানে চিকিৎসকরা ভালোভাবে দেখছেন না। ভেতরে গুলি থাকায় ব্যথায় টনটন করে। এদিক-ওদিক ঘুরলেই জান বের হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়।

তিনি বলেন, চিকিৎসার জন্য অনেক খরচ হচ্ছে। আমার হোন্ডাটাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সরকার বা অন্য কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য পাইনি। ভবিষ্যতে কীভাবে সংসার চলবে আর ছেলে-মেয়েদের কেমনে মানুষ করব কিছুই জানি না।

হাসপাতালে চিকিৎসার সার্বিক বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার আসাদুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, এখনও অনেক আহত রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাদের অনেকের অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। আর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও বিনামূল্যে সেবা দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে রোগীদের সাহায্য-সহযোগিতা করছি। 

তবে এখন রোগীর চাপ অনেক কমেছে বলেও জানান তিনি।

সময়ের আলো/আরএস



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: