দুই দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন করছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। (আজ) মঙ্গলবারের মধ্যে দাবি আদায় না হলে গণছুটিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। ইতিমধ্যে অনেকেই ছুটির দরখাস্ত জমা দিয়েছেন। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীদের মঙ্গলবার আলোচনার জন্য আরইবি সভা ডাকলেও তা প্রত্যাখান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এতে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়া ও সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি উপদেষ্টা বলেছেন, কর্মবিরতি না করলে আলোচনা হবে, কর্মবিরতি করলে কোনো আলোচনা হবে না। গ্রাহকসেবা অব্যাহত রেখে আলোচনা করতে চাইলে আলোচনা হবে।
আরইবি বলছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আগামীকালও (মঙ্গলবার) আলোচনা হবে। এ অবস্থায় আরইবি সোমবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারীদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের দাবির বিষয়ে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় আলোচনা হবে। তবে সোমবার রাত ৮টার মধ্যে আন্দোলন প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই চিঠি প্রত্যাখান করেছেন আন্দোলনকারীরা। তারা বলছেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে যখনই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় ঠিক তখনই বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক দায় এড়ানো এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য এমন একটা সভা আয়োজনের প্রহসন করা হয়। বাস্তবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. আসাফউদ্দৌলা স্বাক্ষরিত আন্দোলনকরীদের সোমবার দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘পবিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণছুটি ও কর্মবিরতিসহ সব কর্মসূচি সোমবার রাত ৮টার মধ্যে প্রত্যাহার সাপেক্ষে বিভিন্ন দাবির যৌক্তিক সমাধানকল্পে বাপবি বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় পাঁচজন জেনারেল ম্যানেজার এবং দাবি-দাওয়া উপস্থাপনকারী বিভিন্ন পবিসের ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রয়োজনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গেও আলোচনার ব্যবস্থা করা হবে। সভায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে অংশগ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
এই চিঠি প্রত্যাখান করে পবিসের আন্দোলনকারীরা সোমবার রাতে বলেছেন, আরইবি-পবিস একীভূতকরণসহ অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়ন এবং সব অনিয়মিত/চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের নিয়মিতকরণের দুই দফা দাবি আদায়ে চলতি বছরের প্রথম থেকে স্মারকলিপি প্রদানসহ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল ও গ্রাহকসেবা চালু রেখে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন করে যাচ্ছেন দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী।
গত ১ মাসের জুলাই, দাবি আদায়ে টানা ১০ দিন কর্মবিরতির পর বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব, তিনজন অতিরিক্ত সচিব, আরইবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে বিদ্যুৎ ভবনে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং আরইবি-পবিস একীভূতকরণ/রিফর্ম এর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক আরইবি-পবিস একীভূতকরণ/রিফর্ম এখন সময়ের দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং গত ১ আগস্ট আরইবি, সমিতি এবং মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। একই তারিখে আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় সমিতির ১০ জনের অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্ট্যান্ড রিলিজ/সংযুক্ত/বরখাস্ত করা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক মৌখিক নির্দেশনা সত্ত্বেও আরইবি কর্তৃক তা বাতিল/স্থগিত করা হয়নি। গত ৮ আগস্ট দাবি আদায়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ২২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী লং মার্চ টু আরইবি কর্মসূচি করেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় মন্ত্রণালয়য়ের রিফর্ম কমিটির প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত আরইবি ৬টি সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের আশ^াসের প্রেক্ষিতে কর্মসূচি স্থগিত করে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।
আরইবির চেয়ারম্যান কর্তৃক পরবর্তী কর্মদিবসে কার্যবিবরণী প্রেরণের স্পষ্ট ঘোষণা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনরায় আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণের খবর পেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক গত ২২ আগস্ট পূর্বগঠিত কমিটির সভা আয়োজন করা হয়। সেই সভায় পূর্ব নোটিস ছাড়াই আরইবির সব প্রতিনিধি অনুপস্থিত থাকেন। আরইবি সভা বয়কট করলেও বিদ্যুৎ বিভাগ তার প্রেক্ষিতে কোনো ধরনের ব্যবস্থা কিংবা লিখিত নোটিস দ্বারা সভা স্থগিত বা পরবর্তী সভা আয়োজনের বিষয় স্পষ্ট করেনি।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিভাগ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন বাধ্য হয়ে গত ২৪ আগস্ট ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় বরাবরের মতো তড়িঘড়ি করে মঙ্গলবার আবার পূর্বগঠিত কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে যখনই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় ঠিক তখনই বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক দায় এড়ানো এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য এমন একটা সভা আয়োজনের প্রহসন করা হয়, বাস্তবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। এতে আন্দোলনের যৌক্তিক সমাধানে বিদ্যুৎ বিভাগ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে আরইবির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কালক্ষেপণের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এমতাবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতি আস্থার সংকট সৃষ্টি হওয়ায় মঙ্গলবারের সভায় উপস্থিত না থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এমতাবস্থায় দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কতিপয় দুষ্কৃতকারী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অপসারণ/শাস্তি নিশ্চিতপূর্বক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুই দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য আগামী ২৭ তারিখের মধ্যে দাবি আদায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টার আন্তরিক হস্তক্ষেপ এবং ছাত্র-জনতার সহযোগিতা কামনা করেন তারা। অন্যথায় বুধবার থেকে সারা দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী পূর্বঘোষণা ও প্রস্তুতি অনুযায়ী একযোগে স্টেশন ত্যাগ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য গণছুটিতে যাওয়াসহ প্রয়োজনে গণপদত্যাগ করতে বাধ্য হবেন। ফলে দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সময়ের আলোকে বলেন, তাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষে হচ্ছে আরইবি। সেখানে না হলে বিদ্যুৎ সচিব, তারপরে আমি। তাদের (আন্দোলনকারীদের) ধাপে ধাপে এগোতে হবে। আরইবি তাদের সঙ্গে আলোচনার আয়োজন করেছে।
তিনি বলেন, কর্মবিরতি না করলে আলোচনা হবে, কর্মবিরতি করলে কোনো আলোচনা হবে না। গ্রাহকসেবা অব্যাহত রেখে আলোচনা করতে চাইলে আলোচনা হবে। আর আলোচনা হবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরইবির সদস্য (প্রশাসন) ড. কেএম কামরুজ্জামান সেলিম সময়ের আলোকে বলেন, এটি নিয়ে আন্দোলকারীদের সঙ্গে সকালে মিটিং হয়েছে। আগামীকাল (মঙ্গলবার) মিটিং আছে। তিনি বলেন, আলোচনা চলছে। আশা করি সমাধান হবে। কর্মবিরতি প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক এজিএম আবদুল হাকিম, ডিজিএম মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, আমরা আরইবির ডাকা মঙ্গলবারের সভায় যাচ্ছি না। কারণ আরইবির সঙ্গে একাধিক সভা হয়েছে, কখনোই কথা রাখেনি। আরইবি আন্দোলন ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সভার নামে নাটক করছে। তিনি বলেন, গ্রাহক বা রাষ্ট্রকে বিপদে ফেলা আমাদের লক্ষ্য না। আমরা আলোচনা করতে চাই, কিন্তু যারা ফেল করছে তাদের সঙ্গে বসতে চাই না। আমরা উপদেষ্টার সঙ্গে বসতে চাই। দাবির যৌক্তিক সমাধান চাই।
সময়ের আলো/জিকে