ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আন্দোলনরত চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম। বৈঠক শেষে হামলাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিত করা এবং কর্মস্থল নিরাপদ করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের আশ্বাস দেন তিনি। আর ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তারা জরুরি সেবাসহ কিছু সেবা এখনই চালু করবেন। কিন্তু আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। একজন চিকিৎসকের বিপরীতে একজন নিরাপত্তা রক্ষী থাকার শর্তে সারা দেশে জরুরি সেবা চালু হবে বলে উল্লেখ করেন তারা। পরে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেনাবাহিনী ও বিজিবির নিরাপত্তায় জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু করেন চিকিৎসকরা।
দিনভর চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। জরুরি বিভাগেও চিকিৎসাসেবা মেলেনি অনেক হাসপাতালে। বিপাকে পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ তারা।
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা আবদুল হান্নান তার ছেলেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসেন। খেলতে গিয়ে মাথা আঘাত পায়। গামছা দিয়ে ছেলের মাথা থেকে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন তিনি। আবদুল হান্নান অনেক চেষ্টা করেও তার ছেলের চিকিৎসা করাতে পারেননি। তার মতো এমন অনেকেই চিকিৎসাসেবা না পেয়ে বিপাকে পড়েন। ঢাকা মেডিকেলের মতো দেশের সব হাসপাতালেই চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
রাত পৌনে ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেনাবাহিনী ও বিজিবির নিরাপত্তায় জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু করেন চিকিৎসকরা। রোগীদের জন্য টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট দেওয়া শুরু হয়। পাশাপাশি জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসারের রুমে চিকিৎসকরা অবস্থান করেন।
ইমারজেন্সি অস্ত্রোপচার কক্ষে জরুরি বিভাগের সব কয়টি বিভাগের চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিতে শুরু করেন। পরে ডা. আবদুল আহাদ বলেন, আমরা বলেছিলাম যখনই আমাদের নিরাপত্তা দেবে তখনই চিকিৎসায় ফিরে যাব। আমাদের নিরাপত্তা দিয়েছে বিধায় কাজে ফিরেছি। হাসপাতালে বর্তমানে ইনডোর ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে আউটডোর বন্ধ থাকবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হয়েছে। এখানে চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। জরুরি বিভাগের পাশাপাশি আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউসহ জরুরি স্বাস্থ্যসেবাগুলো চালু হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
শনিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর ও চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনা ঘটে। হামলার বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে গতকাল সকাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন চিকিৎসকরা। পরে সব চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনায় বসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। এরপর চিকিৎসকরা সারা দেশে কর্মবিরতির ডাক দেন। দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের সামনে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের প্রতিনিধি আবাসিক সার্জন ডা. আবদুল আহাদ। তিনি চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়দের পক্ষে কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
আবদুল আহাদ বলেন, সারা দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত হবে।
তিনি বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারী অপরাধীদের গ্রেফতার করে জনসমক্ষে বিচার না করা হয় তা হলে সোমবার রাত ৮টা থেকে আবারও কমপ্লিট শাটডাউন চলবে। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালগুলোতে যে কয়জন চিকিৎসক থাকবেন, সেই কয়জন পুলিশ বা বিজিবি অথবা যে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের থাকতে হবে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে। এটা নিশ্চিত করার পর আমরা জরুরি সেবা চালু করব। তিনি বলেন, আগামী ৭ দিন সারা দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের রুটিন সেবা বন্ধ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে চিকিৎসকদের সুরক্ষাসহ আমাদের ৪ দফা দাবি মেনে নিতে হবে। এ ৭ দিনের মধ্যে আমাদের দাবি আদায় হলে আমরা আবার আউটডোর সেবা ও রুটিন সেবা দেব।
আন্দোলনরত চিকিৎসকদের চার দফা দাবি হলো হাসপাতালের মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যেসব ব্যক্তি বা কুচক্রী মহল এ ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করা। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের গ্রেফতার করা। দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে তাদের শাস্তির আওতায় আনা। নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে অবিলম্বে দেশের সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য পুলিশের (আমর্ড ফোর্স) মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে হাসপাতালে রোগীর ভিজিটর (ভিজিটর কার্ডধারী) ছাড়া বহিরাগত কাউকে কোনোভাবেই ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়া। বিষয়টি স্বাস্থ্য পুলিশের মাধ্যমে নিশ্চিত করা। হাসপাতালে রোগীর সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা-অসংগতি পরিলক্ষিত হলে, তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ আকারে জানানো। এভাবে শাস্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।
এর আগে চিকিৎসকদের কর্মবিরতির ঘোষণার পরপরই সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ডাক্তাররা চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে মারধর, হুমকি এবং ভীতিজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের চিকিৎসাসেবা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ডাক্তাররা যদি সুষ্ঠুভাবে নির্ভয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তা হলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তিনি বলেন, কোভিডকালীন ডাক্তাররা তাদের জীবনবাজি রেখে দেশের আপামর জনসাধারণকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, বন্যাসহ সব ক্ষেত্রে তাদের অবদান প্রশংসনীয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ডাক্তাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের ছাত্র-জনতাকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। তারা এখনও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাজারও আহত ছাত্র-জনতার নিরলসভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য আমরা পুরো জাতি তাদের কাছে ঋণী। ইতিমধ্যেই এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। ডাক্তারদের হামলার বিষয়ে একটি মামলা করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনেও তিনি চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
সময়ের আলো/আরএস/