ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন ৮৩.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। সংস্কাররূপে দলীয় ছাত্ররাজনীতি প্রত্যাশা করেন মাত্র ১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় ছাত্ররাজনীতি যে অবস্থায় রয়েছে, সেই অবস্থার পক্ষে মত দিয়েছেন মাত্র ০.২ শতাংশ শিক্ষার্থী।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিসার্চ সোসাইটির (ডিইআরএস) জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিভিত্তিক সংগঠন ডিউআরএস চলতি বছরের গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাবির ৭৮টি বিভাগ ও ১০টি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করে। যেখানে মোট অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ২২৩৭ জন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা মূলত এই জরিপটিতে অংশগ্রহণ করেছেন। এই গবেষণাটি পরিচালনার জন্য পরিমাণগত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণা পরিকল্পনা হিসেবে ক্রস সেকশনাল সার্ভে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেশনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলীয় রাজনীতি নিয়ে তাদের ধারণা, অভিজ্ঞতা এবং মতামতের বৈচিত্র্য বুঝতে সেই সামগ্রিক এবং সমন্বিত চিত্র তুলে ধরেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দলীয় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিকল্প হিসেবে ৮১.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও দলীয় ছাত্ররাজনীতির প্রশ্নে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘শুধুমাত্র ছাত্রসংসদ চান, তবে দলীয় ছাত্ররাজনীতি চান না’ বলে মতামত দিয়েছেন। ছাত্ররাজনীতির মূল প্রভাব হিসেবে ৮৭.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্ষমতার অপব্যবহারকে উল্লেখ করেছেন।
গবেষণায় বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্ররাজনীতির এ সভা-সমাবেশ, সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং মিছিল-মিটিং সমর্থন সমর্থন করেন করেন কী’– এমন প্রশ্নে ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। অর্থাৎ ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্ররাজনীতির সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং সমর্থন করেন না। ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রমের কারণে তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন।
গবেষণাটিতে বলা হয়, দলীয় ছাত্ররাজনীতি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘খুবই অসন্তোষজনক’, ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘অসন্তোষজনক’, ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘মধ্যম’, ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘সন্তোষজনক’ এবং ১ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘খুবই সন্তোষজনক’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্ররাজনীতি প্রকৃত অর্থেই জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম নয় বলে মনে করেন ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী।
গবেষণা জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ডিইউআরএস চারটি সুপারিশ প্রস্তাব করেন। সেগুলো হলো-
দলীয় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ: অধিকাংশ শিক্ষার্থী (৮৪ শতাংশ) বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেছেন এবং ৯৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্র রাজনীতি শিক্ষার পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ডাকসু পুনর্জীবিত ও সংস্কার: একটি স্বচ্ছ, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং জবাবদিহিতামূলক ছাত্রসংসদ তথা ডাকসু শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত রাখতে এবং তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়ন কমিটি গঠন: শিক্ষার মান উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়ন কমিটি গঠনের পাশাপাশি নিয়মিত ছাত্র-শিক্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা যেতে পারে।
শিক্ষা ও গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা: শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প-সাহিত্য চর্চা এবং মেধা বিকাশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান। তাদের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্ররাজনীতি ও এর কার্যক্রম শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করে এবং শিক্ষার্থীদের মূল একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
সময়ের আলো/জিকে