শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আকর্ষণ মহাষ্টমীর ‘কুমারী পূজা’। শুক্রবার সকালে রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মঠে এ পূজার আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে রামকৃষ্ণ মিশনে এদিন নেমেছিল হাজারো ভক্ত-অনুরাগীর ঢল। ঢাকের বাদ্য, কাঁসার ঘণ্টা, শঙ্খের আওয়াজ আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হয় পূজামণ্ডপের পুরো প্রাঙ্গণ। দেশের বিভিন্ন মণ্ডপেও ছিল এ আয়োজন। সাধারণত ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের এক থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা অবিবাহিত কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করেন ভক্তরা। এদিকে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী আজ।
শ্রীরাম কৃষ্ণের কথা মতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার প্রধান উদ্দেশ্য।
রাজধানীর নারিন্দা থেকে কুমারী পূজায় আসা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী অপর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘কুমারী পূজায় কুমারীরূপে মা দুর্গার আরাধনা করা হয়। আমি প্রতি বছর কুমারী পূজায় আসি। এবারও বাবা-মায়ের সঙ্গে ভোরবেলা এসেছি।’
পূজার আয়োজকরা জানান, রামকৃষ্ণ মিশনে সকাল ৬টা ৫২ মিনিটে অষ্টমী পূজা শুরু ও ৭টা ৪১ মিনিটের মধ্যে সন্ধী পূজা শেষ হয়। আর সকাল সাড়ে ১০টায় কুমারী পূজা শুরু এবং দুপুর ১টায় শেষ হয়। এবারের মাতৃরূপী দেবী দুর্গার শাস্ত্রীয় নাম পুঞ্জিকা, আর জীবন্ত রূপের নাম সংহিতা ভট্টাচার্য। বয়স আট বছর। দুর্গাপূজার পঞ্চম তিথিতে তার জন্ম। তাকে ভোরে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তারপর সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। পরে তাকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শ উপাচারে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারদিকে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি ও দেবী স্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে। পূজা চলাকালে ওই কুমারী ভক্তদের আশীর্বাদ করেছে।
পূজার কার্যক্রম শেষে কুমারী মায়ের নাম জানান এবারের পুজোর দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বামী হরিপ্রেমানন্দ (স্বপন মহারাজ)। তিনি বলেন, দেবী দুর্গাকে সম্মান জানাতেই অষ্টমীতে আয়োজন করা হয় কুমারী পূজার। কুমারী পূজার ১৬টি উপকরণ দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতার সূত্রপাত। এর মাধ্যমে নারী জাতির প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল হবে। তিনি আরও বলেন, আধুনিক পৃথিবীতে সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট নিরসন করে অগ্রগামী হতে হলে মাতৃজাতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। জগতের অনেক স্থানে নারীকে সম্মান দেওয়া হয় পত্নীরূপে বা সহকারিণীরূপে। কিন্তু নারীর সবচেয়ে মহিমময় রূপ তার মাতৃরূপ। তাই মহাষ্টমী তিথিতে আমরা জগতের সব মাতৃজাতিকে উদ্দেশ্য করে কুমারী মাতাকে প্রণাম জানাই। তার মাধ্যমে আদ্যাশক্তিকে আমাদের প্রণাম নিবেদন করি।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই দেবী দর্শনে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সকালে অষ্টমী পূজার পুষ্পাঞ্জলি শুরু হলে ভিড় বাড়তে থাকে। ফুলে-ফলে ভরে যায় মন্দির চত্বর। বাহারি সজ্জায় সাজানো হয়েছে পুরো ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণ। পুরো মন্দিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে পুলিশ-আনসারসহ একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকেশ্বরী ছাড়াও রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান, সিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা, ভোলানাথ মন্দির আশ্রম, জগন্নাথ হল, ঋষিপাড়া গৌতম মন্দির, শাঁখারী বাজার পানিটোলা মন্দিরসহ অন্যান্য মণ্ডপে নানা অনুষ্ঠানের কারণে সারা দিনই ভক্ত-দর্শনার্থীদের সমাগম ছিল।
এদিকে পঞ্জিকানুযায়ী, আজ মহানবমী পূজা। সকাল ৭টা ৪১ মিনিট পর মহানবমী আরম্ভ ও ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে মহানবমীর বিহিত পূজা শেষ হবে। অনেকের বিশ্বাস মহানবমীর দিন হচ্ছে দেবী দুর্গাকে প্রাণভরে দেখে নেওয়ার ক্ষণ। এদিন অগ্নিকে প্রতীক করে সব দেবদেবীকে আহুতি দেওয়া হয়। অগ্নি সব দেবতার যজ্ঞভাগ বহন করে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে থাকেন। এদিনই দুর্গাপূজার অন্তিম দিন। পরের দিন কেবল বিজয়া ও বিসর্জনের পর্ব। নবমী নিশিথে উৎসবের রাত শেষ হয়। নবমী রাত তাই বিদায়ের অমোঘ পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়। এসব বিবেচনা করে অনেকেই মনে করেন নবমীর দিন আধ্যাত্মিকতার চেয়েও অনেক বেশি লোকায়ত ভাবনায় ভাবিত থাকে মন। আগামীকাল প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। এ বছর সারা দেশে ৩১ হাজার ৪৬১ মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।
সময়ের আলো/আরএস/