ইউরোপের ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্কের নতুন যাত্রায় অংশীদারত্ব সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) ইস্যুতে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে দুদিনব্যাপী আলোচনা শুরু হতে হচ্ছে। তার আগে ইইউর সঙ্গে ১১তম যৌথ কমিশনের বৈঠক আজ সোমবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের পিসিএ চুক্তি সই হলে দুই পক্ষের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উত্তীর্ণ হবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে আজ ১১তম যৌথ কমিশনের বৈঠক এবং মঙ্গল ও বুধবার পিসিএ চুক্তি ইস্যুতে আলোচনা শুরু করতে এরই মধ্যে ইইউর তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় পৌঁছেছে।
ইইউর প্রতিনিধি দলে ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পাওলা পামপালোনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইইউর প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন সংস্থাটির এই অঞ্চলের উপপরিচালক রাষ্ট্রদূত রেনজি কেরিঙ্ক। এর আগে রাষ্ট্রদূত রেনজি কেরিঙ্ক গত ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইইউর পক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার জানিয়েছে, ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পাওলা পামপালোনি, উপপরিচালক রাষ্ট্রদূত রেনজি কেরিঙ্ক ও বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার রোববার পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাতে দুই পক্ষের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন, বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণ (এলডিসি), বাণিজ্যিক সুবিধা (ইবিএ) এবং ১১তম যৌথ কমিশনের বৈঠক নিয়ে আলোচনা হয়।
এর আগে ঢাকায় নবনিযুক্ত ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার গত ১৫ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতে উভয়ের মধ্যে পিসিএ চুক্তি নিয়ে আলাপ হয়। উপদেষ্টা এবং রাষ্ট্রদূত উভয়েই পিসিএ চুক্তি নিয়ে সামনের দিনে আলোচনা হওয়ার বিষয় উল্লেখ করে বলেন, চুক্তিটি হলে দুই পক্ষের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে যাচ্ছে। শুরুতে দুই পক্ষের সম্পর্ক দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত ৫০ বছরে এই সম্পর্ক রাজনৈতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়।
দুই পক্ষের সম্পর্ক গত ২০২২ সালে রাজনৈতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। এই সম্পর্ক আরও দৃঢ়, অংশীদারত্ব এবং সহযোগিতামূলক পর্যায়ে উন্নীত করতে দুই পক্ষই অংশীদারত্ব সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) করতে অঙ্গীকার করেছে। পিসিএ চুক্তি মূলত দুই পক্ষের মধ্যে একটি আইনগত সমাঝোতা। যার মাধ্যমে দুই পক্ষই বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু, ইন্দো-প্যাসিফিকসহ সম্পর্কের সব বিষয়ে সহযোগিতার জন্য চুক্তি করবে। এরই মধ্যে ইইউ এই চুক্তির খসড়া বাংলাদেশকে পাঠিয়েছে। চুক্তির এই খসড়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আগামী মঙ্গল ও বুধবার ঢাকায় প্রথমবারের মতো আলোচনা শুরু হবে। পিসিএ চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মূলত মোট ৫টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গল ও বুধবার ঢাকায় প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠানের পর দ্বিতীয় বৈঠক ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত হবে। এভাবে ঢাকা ও ব্রাসেলসে পিসিএ খসড়া নিয়ে দুই পক্ষ ৫ বার বৈঠক করে খসড়াটি চূড়ান্ত করবে। এরকম বৈঠক শেষে খসড়াটি চূড়ান্ত করতে কমপক্ষে ২ বছর লাগবে।
শেষ পর্যন্ত ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশ পিসিএ চুক্তি চূড়ান্ত হলে, বাংলাদেশ হবে এশিয়ার স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে প্রথম রাষ্ট্র যারা সবার আগে ইউরোপের ২৭ দেশের জোটের সঙ্গে এই চুক্তি সম্পাদন করবে। সর্বশেষ মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড ইইউর সঙ্গে পিসিএ চুক্তি সম্পাদন করেছে। এই চুক্তি হলে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের বাজার অনেক বড় হবে। সুবাতাস পাওয়া যাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। পাশাপাশি ইউরোপের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী কার্যক্রম নিতে উৎসাহ পাবে। এ ছাড়া ইউরোপের বাজারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের আরও একাধিক বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ নিতে পারবে।
অন্যদিকে গত নভেম্বরে ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পাওলা পামপালোনির সঙ্গে বৈঠকে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও ইইউর বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি প্লাস সুবিধার পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ইইউকে জানিয়েছে যে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর যদি তৈরি পোশাক খাতের পণ্য তাদের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে থাকে তবে তা হবে অর্থহীন। তৈরি পোশাক খাতকেও শুল্কমুক্ত সুবিধার মধ্যে (জিএসপি প্লাস) যুক্ত করতে হবে। শ্রম ইস্যুতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার যে নয়টি টার্গেট আছে সেগুলো নিয়ে কথা হয়। ইইউকে বাংলাদেশের তরফে জানানো হয় যে, এই কর্মপরিকল্পনার প্রায় ৮০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। ওই সময়ে ইইউ লেবার ল ডেপ্লয়মেন্ট নিয়েও কথা বলেছে। বাংলাদেশ ইইউকে জানিয়েছে যে এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আএলও) সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ইউরোপের দেশগুলোর এই জোট বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। এই হিসেবে ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে পিসিএ চুক্তি হলে সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হবে। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহজেই বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এ ছাড়া ইইউর সঙ্গে পিসিএ চুক্তি হলে ইউরোপের মাধ্যমে অন্যান্য পশ্চিমা দেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. শহীদুল হক দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ইউরোপের এই জোট বাংলাদেশের ভালো বন্ধু। তারা ইউরোপের বাজারে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশে এখন বিশেষ সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বেরিয়ে যাবে। তখন আর এই সুযোগ থাকবে না। তখন তাদের সঙ্গে নতুন চুক্তি হবে। তার আগে পিসিএ চুক্তি হয়ে গেলে বাংলাদেশ ভালো সুবিধা পাবে।
সময়ের আলো/আরএস/