গ্রামবাংলার হাজার বছরের প্রাচীনতম উৎসবের একটি নবান্ন উৎসব। বাঙালি লোক সংস্কৃতির পুরানো এ উৎসব সময়ের সাথে সাথে হারাতে বসেছে তার অতীতের রূপ, আভিজাত্য। নবান্ন উৎসবকে তাই নাগরিক জীবনে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতে প্রতিবছরের মতো এবারও পহেলা অগ্রহায়ণে রাজধানীতে আয়োজন করা হয় ‘নবান্ন উৎসব’।
‘এসো মিলি সবে, নবান্নের উৎসবে’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়।
১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উৎসব উদযাপন শুরু হয়। জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপন পর্ষদে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বছর ২৫ বছর পূর্তি হলো নবান্ন উৎসবের। ২৫ বছর পূর্তি আয়োজনটি বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী প্রয়াত হাসিনা মমতাজ এর নামে উৎসর্গ করেন আয়োজকরা।
আয়োজন নিয়ে শনিবার (১৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় কথা হয় জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক নাঈম হাসান সুজার সঙ্গে। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, নবান্ন উৎসব বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতির উৎসব। বছর ঘুরে নবান্ন উৎসব আসে ঠিকই, তবে পুরানো সে আভিজাত্য এখন আর নেই গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তো জানে না, নবান্ন কি। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের সংস্কৃতিটাকে পৌঁছে দেওয়া, নবান্ন উৎসবকে নাগরিক জীবনে পরিচিত করাই আমাদের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যে।
বিকেলে চারুকলা অনুষদে প্রাঙ্গনে দেখা যায়, নানা গান, নাচ আর কবিতার মাধ্যমে বরণ করে নিয়েছে অগ্রাহয়ণকে। শহুরে মানুষের মনে নবান্নের আমেজ দিতে খৈ, মুড়কি, মোয়া, মুরালি, বাতাসা নিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন আয়োজকেরা।
চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণেই কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দস্তাগীর চৌধুরীর সঙ্গে। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, কোলাহলের এই নগরীতে বকুল তলায় বসে পিঠা আর মুড়ি-মুড়কি খেতে খেতে ঢোলের তালে লোক সঙ্গীত শোনার মধ্যে দিয়ে মনের মধ্যে এক অন্য রকম শান্তি বিরাজ করে।
এবার অগ্রহায়ণের অনুষ্ঠানকে দুভাগে ভাগ করা হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে প্রথম ভাগের আনুষ্ঠানিকতা। দুপুর ২টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে দ্বিতীয় ভাগের পরিবেশনা।
সকাল সাড়ে ৭ টায় শিল্পী হাসান আলীর বাঁশির সুরের মূর্ছনায় শুরু হয় আয়োজন। পিঠাপুলি, বাহারি পোশাক, রঙিন সজ্জায় বাঁশির মায়াবী ধ্বনি, নাচ, গান আর আবৃত্তিতে অগ্রহায়ণের প্রথম সকালে চারুকলার বকুলতলা মুখর হয়ে উঠে। এ উৎসবে বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তি শিল্পীগণ একক ও দলীয় সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি পরিবেশন করেন। একইসাথে ছিলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবেশনাও। দিনভর নানা সংগীত, নৃত্য আর আবৃত্তির একের পর এক আয়োজনে উৎসবমুখর ছিলো চারুকলা প্রাঙ্গণ।
উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধানবিজ্ঞানী ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক নাঈম হাসান সুজা। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নবান্নোৎসব উদযাপন পর্ষদের সহ-সভাপতি কাজী মদিনা। পর্ষদের সভাপতি লায়লা হাসান চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় তার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সহ-সভাপতি মানজার চৌধুরী সুইট।
ধানবিজ্ঞানী ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, আজকে এই অনুষ্ঠানে এসে মনে হয়েছে সত্যি সত্যিই ধানের ক্ষেত থেকে উঠে আসা মানুষ। আমাদের ধানের ফলন বেড়েছে। যারা ধানের ক্ষেতে কাজ করে তারাই আসল কৃষি বিজ্ঞানী। আমাদের সমৃদ্ধির জন্য তারা সবচেয়ে বেশি কাজ করে। কিন্তু পদ্ধতিগত কারণে তাদেরকেই আমরা সুস্থ অবস্থায় দেখতে পাই না, তাদের অভাব যায় না। আমাদের এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমি অনেক আগে থেকই বলে আসছি, যে ধানের যে জাত সেই নামেই বাজারে চাল থাকতে হবে। কিন্তু বাজারে নানা নামে চাল বিক্রি করে মানুষের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে। তাই আপনাদের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে হবে যে আমি অমুক জাতের চাল চাই।
অনুষ্ঠানে উদযাপন পর্ষদের সভাপতি লায়লা হাসান তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সন্ধান, আমাদের উৎস মূলের সন্ধান-আত্মিক সম্পর্কের সন্ধান দেবার জন্য আমাদের এই প্রয়াস। সেই সাথে আমাদের কৃষক সম্প্রদায় যারা রাতদিন অপরিসীম পরিশ্রম করে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের অন্ন যোগান দেন তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদানও আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। বাঙ্গালির সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য বিবেচনা করে ১ অগ্রহায়ণকে ‘জাতীয় নবান্ন উৎসব দিবস’ হিসেবে সমাদৃত হোক, স্বীকৃত হোক এটি আমাদের একান্ত অভিলাষ।
সময়ের আলো/জেডআই