বাংলাদেশের জন্য এবার ডিসেম্বর এলো এক অন্য আবহে। জুলাই জাগরণ ও পরবর্তীতে আগস্টে সেনা- ছাত্র-জনতার অভাবনীয় অভ্যুত্থানের এক নতুন পরিসরে এবার পালন হবে একাত্তরের জনযুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিজয় অর্জনের দিন, অর্থাৎ বিজয় দিবস।
এবারের ১৬ ডিসেম্বরের তাৎপর্য তাই অপরিসীম।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ৩০ লাখ শহিদ আর ২ লাখ নারীর ওপর যৌন সহিংসতার দামে কেনা আমাদের এই বাংলাদেশ। এই ভূখণ্ডের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ শামিল হয়েছিল মুক্তির স্বপ্ন আর লড়াইয়ে।
মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের পুণ্যভূমি হবে বাংলাদেশ। তবে তা হয়নি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে থাকা এসব অঙ্গীকার এমনকি সংবিধানেও জায়গা করে নিতে পারেনি। উল্টো বিগত ১৫ বছর মুক্তিযুদ্ধের একমুখী জাতিবাদী বয়ানকে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে মুক্তিযুদ্ধকে একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অর্জন আকারে হাজিরের চেষ্টা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিগত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সাম্যের বদলে দেশে ধনবৈষম্য বেড়েছে। লাখ লাখ শূন্য আয়ের মানুষের বিপরীতে জন্ম নিয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু বিলিয়নার।
ব্যাংক লুট, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার, সবমিলিয়ে মানুষের মানবিক মর্যাদা ভুলণ্ঠিত হয়েছে প্রতিনিয়ত। নাগরিকের বদলে তাকে যেন প্রজা বানিয়ে রাখা হয়েছে। মানবাধিকারকে তুচ্ছ করা হয়েছে দিনকে দিন।
বিচারিক ও বিচারবহির্ভূত হত্যা ছিল সাধারণ ব্যাপার। সবমিলিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারের কোনো পরিসরই রাষ্ট্র তৈরি করেনি। শেখ হাসিনার সর্বস্বৈরতন্ত্রী কিংবা ফ্যাসিস্ট শাসন ভর করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধকে। একে দলীয়, আরও নির্দিষ্ট করে বললে পারিবারিক সাফল্যের ইতিকথা বানিয়ে ফেলেছিল তার সরকার। অস্বীকার করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ইতিহাস আর বাস্তবতাকে। অস্বীকার করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাইরে অন্য সবার অবদানকে।
নতুন প্রেক্ষাপটে আজকে যখন বিজয় দিবস উদযাপন হবে, তখন আমরা চাই জনযুদ্ধের বাস্তবতা থেকে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার দিন শুরু হোক। সেই সময়ের সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির অন্তত সাড়ে ৭০০ কোটি আখ্যান রয়েছে; মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেই জনইতিহাসে নজর দেওয়া হোক।
মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করে বছরের পর বছর ক্ষমতায় ছিল বিগত হাসিনা সরকার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জুলাই-আগস্টে যে বিপ্লব হয়েছে, তার অঙ্গীকার বাংলাদেশকে সর্বার্থে বদলে দেওয়া। রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিধিত্ব করছে অন্তর্বর্তী সরকারে। নতুন করে সংবিধান লেখার কথা এখনও বলে যাচ্ছেন তারা।
সে কারণে জনমনে প্রত্যাশা আছে, এই অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারকে স্থান করে দেবে। বিজয় নিশান উড়ছে ঐ/ বাংলার ঘরে ঘরে... আমরা চাই এই নিশান কখনো অবনত হবে না। রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে দাঁড়িয়ে থাকবে গর্বিত বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে।
সময়ের আলো/আরএস/