ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করলে ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রধানরা পদত্যাগ করেন। এ তালিকায় যুক্ত হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারও।
গত ২৯ অক্টোবর দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং কমিশনার জহুরুল হক ও কমিশনার মোছা. আছিয়া খাতুন পদত্যাগ করেন। ৩১ অক্টোবর তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ফলে গত এক মাস ধরে শূন্য দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ।
তাদের পদত্যাগের পর দুদকের রুটিন কার্যক্রম ছাড়া সবকিছুতেই ভাটা পড়েছে। অলস সময় কাটাচ্ছেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজধানীর সেগুনবাগিচার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নেই আগের মতো মানুষের আনাগোনা। সংস্থাটিতে যেখানে প্রতিদিন শতাধিক অভিযোগ পড়ত, এখন সেখানে তেমন কেউ অভিযোগ দিতে আসেন না। নেই দামি দামি গাড়ির ভিড়।
৫ আগস্টের আগে দুর্নীতির অভিযোগে প্রভাবশালী আমলা, সাবেক মন্ত্রী বা বড় কোনো শিল্পগোষ্ঠীর কর্মকর্তাদের তলব করা হতো দুদকে। তারা দামি দামি গাড়ি নিয়ে হাজিরা দিতে আসতেন। কিন্তু এখন আর কেউ আসছেন না। কেউ তদবির করতেও আসছেন না। দুদক চেয়ারম্যান পদত্যাগের পর সংস্থাটির পক্ষ থেকেও তেমন কোনো ব্রিফিংও করা হয় না। এতে সংস্থাটির কর্মকর্তাদেরও তৎপরতা কমে গেছে। দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও তেমন কোনো কাজ নেই। এমনকি গত ২১ নভেম্বর দুদক প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্ণ হলেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তেমনভাবে পালন করা হয়নি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের প্রায় ৩০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এ ছাড়া আমলা, মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালী ১৮০ জনের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে টাকা পাচারের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। কিন্তু চেয়ারম্যান না থাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রমও অনেকটা থেমে গেছে। যতটুকু না করলেই নয়, এমন দুয়েকজনের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। তবে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেফতারে অগ্রগতি নেই।
বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে। আলোচনায় উঠে এসেছে, গত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক মন্ত্রী, এমপি, নেতা ও আমলারা দুর্নীতির শীর্ষ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তাদের দুদকে বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। অথচ তাদের দুর্নীতির অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সংস্থাটির যে দিকনির্দেশনা দেওয়া দরকার সেটি হচ্ছে না। অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাসা ও কার্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রে তল্লাশি করার প্রয়োজন হয়। তল্লাশির ক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও দুদক কমিশনের কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো অনুমতিও পাওয়া যাচ্ছে না। এটিও দুদকের কার্যক্রমে ভাটা পড়ার কারণ।
দুদক আইন অনুযায়ী কারও বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন বা অর্থ পাচারের অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করতে হয়। অনুসন্ধানে অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা করা হয়। এ মামলা দুদকের একজন তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি, নেতা ও আমলাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। তাদের সম্পদের পরিমাণ, ব্যাংক হিসাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাসপোর্ট অধিদফতর ও ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছেও তথ্য চাওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও পরে গ্রেফতারের ব্যবস্থা নেবে দুদক। তবে এর মধ্যে শুধু মামলা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দুদকের প্রধান কার্যালয়ের প্রত্যেক কর্মকর্তার হাতে ২০-৩০টি অভিযোগ অনুসন্ধান বা তদন্তের জন্য থাকে। এতগুলো অনুসন্ধান ও তদন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে করতে গিয়ে তারা হিমশিম খান। ফলে অনুসন্ধানে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। একজন কর্মকর্তাকে একটি অনুসন্ধান বা তদন্ত শেষ করার জন্য কমপক্ষে টানা দুই মাস সময় দিতে হবে। কিন্তু দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার না থাকায় কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধের উপক্রম হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এ সপ্তাহে না হলেও আগামী সপ্তাহে আমরা চেয়ারম্যানসহ দুই কমিশনার পাব। তখন সংস্থার কাজের গতি বাড়বে।
এদিকে গত ২৯ অক্টোবর দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগের পর গত ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহবুব হোসেন।
কমিটি গঠন বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পাঠানো প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ প্রদানের জন্য দুদক আইন, ২০০৪-এর ৭ ধারা অনুযায়ী এ বাছাই কমিটি গঠন করা হলো। বাছাই কমিটির চেয়ারম্যান, কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে উপস্থিত সদস্যদের তিনজনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে দুজন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে ওই আইনের ধারা-৬-এর অধীন নিয়োগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন।
জানা গেছে, ইতিমধ্যেই নানাভাবে সার্চ কমিটির কাছে দুদক চেয়ারম্যান বা কমিশনার হতে আগ্রহীদের নাম জমা হয়েছে। কেউ সরাসরি কেউ প্রতিনিধির মাধ্যমে কেউ আবার অন্য ব্যক্তির জন্য নাম সুপারিশ করে সার্চ কমিটির কাছে প্রস্তাব করেছেন। তিনটি পদের জন্য প্রায় শতাধিক নাম প্রস্তাবাকারে জমা পড়েছে। তবে দুদক পুনর্গঠনের জন্য সার্চ কমিটি তালিকা যাচাই-বাছাই করে সংক্ষিপ্ত করছে। দ্রুতই রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবেন তারা। পরে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে না হলেও আগামী সপ্তাহে নতুন কমিশন গঠন হতে পারে বলে। তারা বলেন, সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ করছেন। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব পাঠাবেন। রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিলেই দুদকের কমিশন গঠন হবে। এরপর আবার পুরোদমে সংস্থাটির কার্যক্রম চলবে।
‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’ অনুযায়ী, কমিশন তিনজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হয়। তাদের মধ্য থেকে একজন হন চেয়ারম্যান। কমিশনারদের মেয়াদ পাঁচ বছর।
দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার নেই। তারপরও আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান। তবে যেসব কাজের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান বা কমিশনারের অনুমোদন দরকার হয়, সেগুলো আটকে আছে। তারপরও আমরা কাজ এগিয়ে রাখছি। চেয়ারম্যান বা দুই কমিশনার যোগ দিলেই দুদকের কার্যক্রমে গতি বাড়বে। চেয়ারম্যান নেই, তাই দুদকে আগের তুলনায় অভিযোগও কম জমা পড়ছে।
দুদকের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, এখন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও কমিশনার নেই। এতে অনেক কাজও আটকে আছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। তবে তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে। চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করার আগে যেভাবে সংস্থাটিতে অভিযোগ জমা পড়ত। এখন অভিযোগ তুলনামূলক কমে গেছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর সচিবালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকা আওয়ামী লীগের আমলের নিয়োগপ্রাপ্তরা পদত্যাগ করেন। এর ধারাবাহিকতায় দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারকে সরিয়ে দেওয়াসহ দুদক ঢেলে সাজানোর দাবি ওঠে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়করাও দুদকে গিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে সংস্থাটির ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সরকারের আস্থা অর্জনে দুদক শতাধিক সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দুদকের এসব কাজ লোক দেখানো বলে মন্তব্য করতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দুদকের দায়সারা ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে পদত্যাগ করেন দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার। এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ও দুই কমিশনার। পদত্যাগ করার আগে ২৯ অক্টোবর সকালে প্রতিদিনের মতো অফিসে গিয়ে তারা দাফতরিক কাজ সারেন। বিকালে তাদের দুদক সংস্কার কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল। কিন্তু দুপুর ১টার দিকে সংস্কার কমিশনের বৈঠক স্থগিতের খবর আসে কমিশনে। কার্যত এরপরই তারা পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও দুদকের কাজের সমালোচনা করে সংস্থাটিকে ঢেলে সাজানোর তাগিদ দেন। পরে দুদক সংস্কারে কমিশন গঠন করে সরকার।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ৩ মার্চ মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহকে দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। তিনি ইকবাল মাহমুদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। ওই সময় তার সঙ্গে জহুরুল হককে কমিশনার (তদন্ত) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর দেড় বছর পর কমিশনার (অনুসন্ধান) মোজাম্মেল হক খান অবসরে গেলে নিয়োগ পেয়েছিলেন আছিয়া খাতুন।
সময়ের আলো/জেডআই