চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর প্রায় ৩৫ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে আসে ইসলামী ছাত্রশিবির। শিবির প্রকাশ্যে আসার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ওইদিন রাতেই প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেন প্রগতিশীল শিক্ষার্থীরা।
এরপর গত ১৯ নভেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে সামনে রেখে এক মতবিনিময় সভায় ছাত্রশিবিরের নেতাদের উপস্থিত থাকা নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সভার শুরুতে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা সাংগঠনিক পরিচয় দিয়ে কথা বলা শুরু করেন। সভায় ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পাঁচজন নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।পরিচয় পর্বের সময় ছাত্রদল কর্মী মো. শরীফ সভায় শিবিরকে কেন রাখা হলো- এমন প্রশ্ন তোলেন। শিবির থাকলে কয়েকটি সংগঠন সভায় থাকবে না বলেও জানান তিনি। তখন অন্য সংগঠনগুলোর মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় বামপন্থী, ছাত্রদলসহ কয়েকটি সংগঠন মিলে শিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে মিছিল করতে করতে বের হয়ে যায়। একই সময় প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে ‘বাকশাল ও মুজিববাদের সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর সংস্কার আন্দোলন, জুলাই গণহত্যা বিচার নিশ্চিত আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনসহ অন্যান্য ব্যানারের নেতা-কর্মীরা বের হয়ে যান।
এ বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একাংশের সভাপতি অমর্ত্য রায় বলেন, "সেদিন সভায় ছাত্রশিবির উপস্থিত থাকায় আমরা সভা থেকে ওয়াকআউট করি। যতক্ষণ না পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে তাদের দ্বারা অতীতে সংঘটিত ঘটনাগুলোর জবাবদিহি করা হবে এবং সেসবের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা শিবিরের সাথে সহাবস্থান চাই না।"
ইসলামী ছাত্রশিবির জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মুহিবুর রহমান মুহিব সময়ের আলোকে বলেন, "বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির সত্য এবং সুন্দরের সাথে থেকে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে সকল দলের সাথে রাজনৈতিক সহাবস্থানের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতি করতে চায়। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নয়, প্রতিযোগিতাপূর্ণ রাজনীতি করতে চাই। ভালো কাজে আমরা প্রতিযোগিতা করতে চাই। অতএব যেকোনো দলের সাথে আমরা কাজ করতে রাজি। যারা আমাদের সাথে রাজনৈতিক সহাবস্থানে থাকতে চায় না তাদের সংখ্যাটা খুব বেশি না। তাদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, আসেন আমরা সবাই মিলে একসাথে ছাত্ররাজনীতি করি, একসাথে এগিয়ে যাই।"
এদিকে গত ২৫ নভেম্বর (সোমবার) রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) কনফারেন্স কক্ষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এক জরুরি আলোচনা সভা আহ্বান করে। সভায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ, গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন, জাস্টিস ফর জুলাই, জুলাই গণহত্যা বিচার নিশ্চিত পরিষদ, বিপ্লবী সাংস্কৃতিক মঞ্চ, আধিপত্যবাদ বিরোধী মঞ্চ ও জাহাঙ্গীরনগর সংস্কার আন্দোলন অংশ নেয়। এ সময় সকল সংগঠন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
শিবিরের উপস্থিতি ও অন্যান্য কারণ দেখিয়ে লিয়াজোঁ কমিটিতে যোগ দেয়নি ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য বামপন্থী ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলো। এর কারণ হিসেবে অমর্ত্য রায় বলেন, "আমরা মূলত দুইটি কারণে ফ্যাসিবাদ বিরোধী লিয়াজোঁ কমিটিতে অংশ নিইনি। প্রথমত, কমিটিতে শিবিরের উপস্থিতি। দ্বিতীয়ত, আমরা মনে করি এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ঐক্যটা এত বেশি অর্থবহ না। রাজনৈতিক প্রতিবিপ্লবের আশংকাকে আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। "
এদিকে জাকসু নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় শিবিরের উপস্থিতিতে ছাত্রদলসহ অন্যান্য কয়েকটি সংগঠন সভা বর্জন করলেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্যে ছাত্রদল ও শিবিরের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের একাধিক নেতৃবৃন্দের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও কেউ ফোন ধরেননি।
সার্বিক বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার অন্যতম সমন্বয়ক তৌহিদ সিয়াম ফ্যাসিবাদী শক্তি ব্যতীত সকল সংগঠনের সহাবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলুপ্ত করতে দায়বদ্ধ। এই লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রত্যেকটি শক্তিকে সাথে নিয়ে আমরা একটা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে চাই। আমরা সেটা করতে চাই ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ সকল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থানের মাধ্যমে।"
গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, "দীর্ঘদিনের একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদফহে আমরা যখন রাজপথে ছিলাম তখন বিভিন্ন দল, বিভিন্ন মতের মানুষ আমরা এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন আমাদের পক্ষ ছিল দুটি, আওয়ামী ও আওয়ামী সমর্থক গোষ্ঠী এবং আওয়ামী বিরোধী গোষ্ঠী। বিভিন্ন মতাদর্শগত পার্থক্য ভুলে আমরা সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটাতে আমাদের সকলেরই সমান অবদান ছিল। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা চাই ক্যাম্পাসে সকল ধরণের দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বাদ দিয়ে অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের নিজেদের কথা বলার জন্য যে রাজনীতি দরকার সেজন্য সকল সংগঠনের সহাবস্থান আমরা নিশ্চিত করতে চাই। পাশাপাশি ছাত্রশিবির, ছাত্রদলের মতো ক্রিয়াশীল যে ছাত্রসংগঠনগুলো আছে তারা সবাই যেন একইসাথে এক কাতারে এসে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যেতে পারে সেজন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।"
আজিজুল হাকিম জয় নামের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী সময়ের আলোকে বলেন, প্রথমত শিবির কি রাজনীতি করে বা করতে চায় সেটা তাদের পরিষ্কার করা উচিত। শিবির সম্বন্ধে আমাদের ধারণা পরিষ্কার নয়। তাদের আদর্শ তারা প্রচার করতেই পারে কিন্তু সেটা যদি হয় হিউম্যান রাইটসের লঙ্ঘন বা মধ্যযুগীয় তাহলে সেটাকে আমরা স্বাগত জানাতে পারি না। শিবির এবং তাদের মাদার পার্টি জামায়াত তাদের অতীত ভূমিকা নিয়ে কি মনে করে সেটাও প্রশ্ন উঠে, সেটা নিয়ে তাদের কথা বলা উচিত। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগরে শিবির যেকানে নিষিদ্ধ ছিল সেটি তাদের স্পষ্ট করতে হবে। জাহাঙ্গীরনগরে তারা কি উদ্দেশ্যে রাজনীতি করতে চায় সেটা আমাদের জানা প্রয়োজন।
মোটকথা শিবিরকে আমরা স্বাগত জানাব তাদের অতীত ভূমিকার ব্যাখ্যা শুনে এবং বর্তমান নিয়ে কি ভাবছে তার উপর। তারা ভিন্নমতকে কিভাবে গ্রহণ করবে সেটাও আমরা জানতে চাই।"
উল্লেখ্য, বিগত ১৯৮৯ সালের ১৫ আগস্ট ছাত্রশিবিরের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান কবির আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছর ২৬ আগস্ট মারা যান তিনি। এ ঘটনায় ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে জাবিতে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়।
এর প্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসের সব ছাত্র সংগঠন ‘সর্বদলীয় ঐক্য’ গঠন করে শিবিরকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে। তখন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রফ্রন্ট, জাবি সাংস্কৃতিক জোটসহ ক্যাম্পাসের সব সংগঠন মিলে শিবিরের বিরুদ্ধে সেই ‘সর্বদলীয় ঐক্য’ গড়ে তোলে। এরপর ১৯৮৯ সালে জাবির ১৪২তম সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপিত দাবিসমূহে শিবির নিষিদ্ধের দাবি ছিল। ওই সিন্ডিকেটের সভার ৩ নম্বর দাবিতে তখন বলা হয়েছিল, ‘ছাত্রশিবির নামধারী সশস্ত্র ফ্যাসিস্ট সংগঠনটির রাজনীতি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিত হইবে।’
তখন এর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, "বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাবহির্ভূত বিধায় এই ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয়।"
সময়ের আলো/এএ/