সকাল সাড়ে ১০টা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে হৃদরোগের বহির্বিভাগ। হালিমা আক্তার নামের এক রোগী চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ঘিরে ধরেন বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির ৫-৭ জন বিক্রয় প্রতিনিধি (মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ)।
তার হাত থেকে এক ধরনের জোরপূর্বক প্রেসক্রিপশন (ব্যবস্থাপত্র) নিয়ে শুরু করেন টানাহেঁচড়া। কে কার আগে মোবাইল ফোনে ছবি তুলবেন তা নিয়ে চলে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। আবার কেউ কেউ পড়া শুরু করেন চিকিৎসক কী কী ওষুধ লিখেছেন তা। তখন কেউ একজন বলেন, আমার কোম্পানির একটা ওষুধ লিখেছে।
আরেকজন বলেন আমারও একটা লিখেছে।
অন্য আরেকজন বলেন, আমার একটাও লেখেনি।এভাবে দেখার পর প্রেসক্রিপশন ফেরত দেওয়া হলো। যা নিয়ে বিড়ম্বনা ও বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেল হালিমা ও তার সঙ্গে থাকা ছোট বোনকে।
এ সময় হালিমা আক্তার সময়ের আলোকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি একজন বয়স্ক রোগী। আমি ডাক্তার দেখে বের হতেই আমার হাত থেকে রীতিমতো ছিনিয়ে নিয়ে মোবাইলে ছবি তুলেছে। এমন করে হেনস্থা করার কোনো মানে হয়।
ডায়াবেটিস ও হরমোন বহির্বিভাগে আসা লতিফ হোসেন নামের আরেক রোগী বলেন, ডাক্তার দেখিয়ে বের হলেই মৌমাছির মতো ঘিরে ধরে। কিন্তু সেসব রোগী আসেন তাদের মধ্যে অনেক গুরুতর রোগীও থাকেন এবং অনেকেই টেনশনও থাকেন। ব্যবস্থাপত্র না দেখাতে চাইলেও বারবার অনুরোধ করে বিব্রত করতে থাকেন। যা খুবই অস্বস্তিকর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা গেছে, ঢামেকের নতুন ভবনের নিচ তলায় হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও হরমোন বহির্বিভাগ পাশাপাশি হওয়ায় এমনিতেই রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। তার ওপর চিকিৎসকের রুমের সামনে আবার স্বল্প জায়গায় দীর্ঘ লাইনে রোগীরা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সকালে চাপ কম হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ চক্রের সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে জোট বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাদের হাতে ও কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো, ব্রিফকেস ও চিকিৎসকদের জন্য আনা নানা উপহারসামগ্রী। রোগীদের বের হওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আবার চিকিৎসকের রুমে প্রবেশ করেন তারা। চিকিৎসকের সঙ্গে খোশগল্পেও মেতে ওঠেন। তাদের কলম, প্যাড ও নতুন বছরে টেবিল ক্যালেন্ডারসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দেন। বাদ যাচ্ছেন না চিকিৎসকের অফিস সহকারীরাও। তাদেরও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী দিচ্ছেন।
আর এই দৃশ্য শুধু ঢামেকের এই দুই বিভাগে নয়, পুরো হাসপাতাল জুড়েই। এ ছাড়াও একই দৃশ্য দেখা গেছে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, ডায়াবেটিসের বিশেষায়িত বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)।
হাসপাতালে ভেতরে-বাইরে থেকে শুরু করে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে, চিকিৎসকের রুমের সামনে এবং হাসপাতালে গেটের সামনে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে। কখনো কখনো তারা যখন-তখন প্রবেশ করেন চিকিৎসকের রুমে। আবার রোগীকে বের হতে দেখেই দৌড়ে কিছু না বলেই রোগীর হাত থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করেন। অনুমতি না নিয়েই ছবি তোলেন। ডাক্তাররা এসব রোগীকে প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখেছেন কি না তা দেখেন। এতে অতিষ্ঠ রোগী ও তাদের স্বজনরা।
অভিযোগ রয়েছে, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা কোনো নিয়ম না মেনেই যখন-তখন ঢুকে পড়েন চিকিৎসকের কক্ষে। চিকিৎসকদের দরজায় থাকা অফিস সহকারীদের দেন কলম ও প্যাডসহ নানা উপহারসামগ্রী।
ভুক্তরোগীদের অভিযোগ, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের দৌরাত্ম্যে নানা হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হন রোগীরা। দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা যেমন ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছেন তেমনই বিব্রত বোধ করেন। একই সঙ্গে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি লঙ্ঘিত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় দৌরাত্ম্য দিন দিনই বেড়েই চলেছে বলেও জানান তারা। অথচ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম অধিকতর উন্নয়নের লক্ষ্যে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালে প্রবেশে বিধিনিষেধসহ ১০ দফা নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত ১৮ নভেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব উম্মে হাবিবার স্বাক্ষর করা এক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে দেশের সব হাসপাতালে। নির্দেশনা প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে তাতে।
ঢামেকের শিশু বিভাগ, নিউরো সার্জারি, ইউরোলজি, চর্ম ও যৌন বিভাগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেখা গেছে রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলার জন্য টানাটানি করছেন। হরহামেশা প্রবেশ করেন ডাক্তারের রুমে ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে।
ইউরোলজির বহির্বিভাগে কথা হয় রোগী মো. মুনসুর হোসেনের সঙ্গে। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে এসেছি। ফিরে যাব। ব্যস্ততা আছে। কিন্তু বের হওয়ার পর তারা তিন-চারজন মিলে ঘিরে ধরেছে। আর ছবি তুলছে। এদের জ্বালায় ডাক্তারের কাছে এসেও শান্তি নেই।
যদিও গত ২৮ আগস্ট থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের পাশাপাশি দালালদের ঢোকা আবারও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ দুই ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রবেশ না করতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। আমরা ওষুধ কোম্পানির মালিকদের সংগঠনের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠক করে তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছি যে, কোনোভাবেই তাদের বিক্রয় প্রতিনিধিরা আর হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারবেন না। তারপরও যদি কেউ প্রবেশ করেন তা হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ, শিশু বিভাগ, অর্থপেডিক্স, দন্ত বিভাগ ও চর্ম যৌন বিভাগের চিকিৎসকের রুমের সামনে ৫-৬ জন বিক্রয় প্রতিনিধিকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পরপর চিকিৎসকের অফিস সহকারী বারবার সরে যাওয়ার তাগাদা দেন। আবার একটু পরই তাদের জড়ো হতে দেখা যায়। আর হাসপাতালে গেটের সামনে শতাধিক ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদেরও দেখা গেছে। মাঝেমধ্যে আনসার সদস্যরা বাঁশি বাজিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন আবার এসে জড়ো হচ্ছেন।
হাসপাতাল থেকে শহিদুল ইসলাম নামের এক রোগী বের হতেই তাকে ঘিরে ধরেন ৮-১০ জন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি। কিন্তু তাদের প্রেসক্রিশনের ছবি তুলতে না দেওয়ায় তর্ক করতে দেখা গেছে। পরে শহিদুল সময়ের আলোকে বলেন, আমি যৌন রোগের সমস্যার জন্য ডাক্তার দেখিয়েছি। এটি আমার গোপন সমস্যা। এটির ছবি কেন তুলতে হবে। তাই ছবি তুলতে দিইনি।
বিএসএমএমইউর বহির্বিভাগের চক্ষু বিভাগ, নাক-কান ও গলা বিভাগ, ইউরোলজি ও সার্জারি, শিশু সার্জারি, অর্থপেডিক্স, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগ, অনকোলজি বিভাগ, কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগসহ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে এবং চিকিৎসকের রুমের সামনে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ চক্রের সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে জোট বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছেন- ঘোরাঘুরি করছেন। এই দলের সদস্য সংখ্যা কমপক্ষে ৮-১০ জন। তাদের হাতে ও কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো, ব্রিফকেস ও চিকিৎসকদের জন্য আনা নানা উপহারসামগ্রী। রোগী দেখার সময়েও হুট করেই ঢুকে পড়েন চিকিৎসকের রুমে। অথচ বাইরে সারি সারি রোগী। কখনো কখনো ডাক্তারের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠছেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। আবার কেউ কেউ রোগীকে অপেক্ষায় রেখে তাদের ভিজিট সেরে নিচ্ছেন। অনকোলজি বিভাগের ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের ফাইল চেক করতেও দেখা গেছে বিক্রয় প্রতিনিধিদের। আর তাদের এই সুযোগ করে দিচ্ছেন কর্তব্যরত আনসার সদস্যসহ ডাক্তারের চেম্বারের সহযোগীরা।
ইউরোলজি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা মো. জয়নাল হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ওষুধ কোম্পানির লোক রোগী দেখার সময় ভেতরে কেন ঢুকবে? আমি দেখেছি ডাক্তার অনেক সময় তাদের বের করে দেন। রোগী দেখার সময় তারা ঢুকলে বিরক্ত হন, কিন্তু বের করে দিলে পরে আবার আরেকজন এসে ঢোকেন। এমনিতেই ডাক্তাররা রোগীদের সময় খুব কম দেন, ভালোভাবে কথা শোনেন না। তার ওপর আবার এদের অত্যাচার। তাতে করে সেবা চিকিৎসকের মনোযোগ যেমন কম তেমনই কাক্সিক্ষত সেবাও পাওয়া যায় না।
সার্জারি বিভাগের চিকিৎসা নিতে রোগী জান্নাত আরা নামের এক রোগী বলেন, কম খরচে ভালো সেবার আশায় এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন রোগীরা। টিকেট কাটা, ডাক্তার দেখানো আর ওষুধ সংগ্রহ করতে লম্বা সিরিয়ালে দাঁড়ানোসহ নানা বিড়ম্বনায় কাহিল হয়ে পড়েন রোগীরা। তার ওপর মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের বিরক্তি। যা খুবই অস্বস্তিকর।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রয় প্রতিনিধি সময়ের আলোকে বলেন, আমরা ছবি তুললে অনেকেই বিরক্ত হন-কিন্তু আমাদের ওপর ছবি তোলার একটা টার্গেট থাকে। প্রতিদিন ১০০ জনের টার্গেট পূরণ না হলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহি করতে হয়। তবে আমরা অনুমতি নিয়েই ছবি তুলি।
নামকরা ওষুধ কোম্পানির এক মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ বলেন, এখন হচ্ছে প্রতিযোগিতা ও মার্কেটিংয়ের যুগ। আর সব কোম্পানিই চায় তার ওষুধ বাজারে বেশি বিক্রি হোক। তাই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সবাই চেষ্টা করে। আবার কেউ কেউ প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে নিজের ফিল্ড ওয়ার্কের প্রমাণ রাখতে চায় তার স্যারদের কাছে। তাই চিকিৎসকরা আমাদের ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য রোগীদের থেকে তথ্য নেই। কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখলে চিকিৎসকদের বিশেষ উপহার দেওয়া হয়। এটি চিকিৎসকরাও জানেন। আর সেভাবেই আনসার থেকে শুরু করে সবাইকে আমাদেরও ম্যানেজ করেই চলতে হয়।
এসব বিষয়ে বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. রেজাউর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এখন এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। আপনি কাল অফিসে আসেন। সাক্ষাতে বিস্তারিত বলব।
সময়ের আলো/আরএস/