ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা বছরজুড়ে

গোলাম মোস্তফা

জাতীয়

সময়ের পরিবর্তনে ডেঙ্গুর এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম নেই। বর্ষা পেরিয়ে শীতের মৌসুমেও ডেঙ্গুর আতঙ্ক কমেনি। প্রতিনিয়ত ছোট্ট মশার আক্রমণে

2024-12-28T01:37:59+00:00
2024-12-28T01:37:59+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা বছরজুড়ে
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৪, ১:৩৭ এএম 
ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা বছরজুড়ে
সময়ের পরিবর্তনে ডেঙ্গুর এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম নেই। বর্ষা পেরিয়ে শীতের মৌসুমেও ডেঙ্গুর আতঙ্ক কমেনি। প্রতিনিয়ত ছোট্ট মশার আক্রমণে অসুস্থ হচ্ছে মানুষ। এতে শারীরিক ক্ষতির সঙ্গে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পরিবার। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য চিকিৎসাব্যয় বড় বোঝা। একইসঙ্গে বেড়েই চলেছে মৃত্যুর মিছিল। তাতে অনেকের পরিবারে স্বপ্ন ভেঙে তছনছ হচ্ছে। 

বছরজুড়ে নানা পদক্ষেপ নিয়েও ঠেকানো যায়নি ডেঙ্গুর ভয়াবহতা। একদিকে বছরব্যাপীই যেমন মশার অত্যাচার যেমন ভুগিয়েছে নগরবাসীকে, তেমনি সিটি করপোরেশনকেও রেখেছে সীমাহীন চাপে। ইতিমধ্যে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছে। এবার এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৫৬৯ জনের আর আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৭৬৪ জন। বাংলাদেশে মৃতের এ সংখ্যা চলতি বছরে বিশ্বে দ্বিতীয়। এ বছর মৃত্যুতে শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিল এবং তৃতীয় অবস্থায় রয়েছে আর্জেন্টিনা। এর আগে ২০২৩ সালে বাংলাদশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), প্যান আমেরিকান স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি) তথ্যমতে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ব্রাজিলে মোট মৃত্যু হয়েছে ৫ হাজার ৯২৫ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছে ১০ কোটি ১০ লাখ ৭২ হাজার ৭৭০ জন। আর্জেন্টিনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ৪০৮ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ৪০২ জন। এ ছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশ যেমন-পেরু, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, মেক্সিকো ও কলম্বিয়া বরাবরের মতো এ বছরও ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। তবে আক্রান্তের দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দেশই এগিয়ে রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে সর্বপ্রথম ডেঙ্গুর সংক্রমণ হয় ১৯৬০ সালের দিকে। এরপর কেটে গেছে কয়েক দশক। এর মধ্যে ২০০০ সালের জুন মাসে ডেঙ্গু সর্বপ্রথম মহামারি আকারে দেখা দেয় বাংলাদেশে। সে বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ৫ হাজার ৫৫১ জন, এর মাঝে মারা যায় ৯৩ জন। এরপর কম-বেশি প্রতি বছরই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, মারা গেছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে দেশে ইতিহাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছিল। সেই বছরে মোট ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হয় মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। তার আগে ২০১৯ সালে সারা দেশে মোট ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, মারা যায় ১৬৪ জন। এর ধারাবাহিকতায় এ বছরও কোনোভাবেই যেন থামছে না এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর দাপট। শীতের সময়ও বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার গোড়াতেই গলদ রয়েছে। এ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণসহ বিভিন্ন কারণে বছরব্যাপী ভোগাচ্ছে। এ কারণে শুধু এক দফতর অন্য দফতরের ওপর দায় চাপিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছে।

তারা বলছেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের চার রকম সেরোটাইপ পাওয়া যায়। এগুলো হলো-ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭৫ শতাংশের বেশি রোগী সেরোটাইপ-২-এ আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়াও শক সিনড্রোম ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট জটিলতায় বেশি মৃত্যু হলেও এর বাইরে দেরিতে হাসপাতালে আসা, চিকিৎসা পেতে বিলম্ব, দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ এবং একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়াও দায়ী। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরবাসী এবং সরকারের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত সাত বিভাগের মধ্যে মৃত্যু ও আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। মোট ৫৬৯ জনের এ বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ৩৯০ জনের। অর্থাৎ মৃত্যুর হার ৬৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) মারা গেছেন ৫০ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১০৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মারা গেছেন ২৩৭ জন। এর পরেই রবিশাল বিভাগে ৬২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৫ জন, খুলনা বিভাগে ৩৫, ময়মনসিংহে ১৬, রাজশাহীতে ৮ জন এবং রংপুর বিভাগে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে সিলেট বিভাগে কোনো মৃত্যু নেই। আবার আক্রান্তের দিক দিয়েও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। সারা দেশে শনাক্ত হওয়া মোট ১ লাখ ৭৬৪ জনের মধ্যে এ বিভাগে মোট আক্রান্ত হয়েছে ৫৭ হাজার ৬১৯ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সিটি করপোরেশনের বাইরে ১৮ হাজার ৬৩৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২১ হাজার ১৮৪ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭ হাজার ৭৯৭ জন। এ ছাড়া রবিশাল বিভাগে ৮ হাজার ৭৪৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ হাজার ৩৮৫ জন, খুলনা বিভাগে ৯ হাজার ৯৫৪ জন, ময়মনসিংহে ৩ হাজার ৩৫৩ জন, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৮৬০ জন, রংপুর বিভাগে ১ হাজার ৫০৯ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩৩৮ জন আক্রান্ত হয়েছে।

এ বছর মৃত ও আক্রান্তদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট মৃত্যুতে নারীরা এগিয়ে। নারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৫১ দশমিক ৫ এবং পুরুষের হার ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আবার পুরুষের আক্রান্তের হার ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারীদের হার ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে বয়স বিবেচনায় সবেচয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের। এ হার ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে যথাক্রমে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সি এবং ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সিরা। আবার আক্রান্তদের মধ্যে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সিরা বেশি। তাদের হার ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর পর যথাক্রামে ২৬ থেকে ৩০ বছর এবং ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সিরা রয়েছেন।

গত ২৬ নভেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ধানমন্ডি প্রভাতী শাখার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাহ নানজিবার। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার চার দিনের মধ্যে তার মৃত্যু হয় বলে জানান তার বাবা রায়হানুল হক।

তিনি জানান, অকালে আদরের সন্তানকে হারিয়ে আমার পুরো সংসার তছনছ হয়ে গেছে। আমার দুইটা মেয়ে ছিল, তার মধ্যে রিফাহ নানজিবা ছিল বড়। হঠাৎ আমার পরিবারের ওপর এত বড় একটা ঝড় বয়ে যাবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমার পরিবারের অবস্থা এখন খুবই খারাপ, বিশেষ করে আমার স্ত্রীর অবস্থা বেশি খারাপ। পাগলপ্রায় অবস্থা তার। স্কুলে আমার মেয়ের জন্য কাঁদেনি এমন একটা বাচ্চাও পাওয়া যাবে না। সবাই ওকে খুব ভালোবাসত।

এবার ডেঙ্গুতে বেশি মৃত্যু হওয়ার বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার সময়ের আলোকে বলেন, সাধারণত ডেঙ্গুতে যারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হয়েছে তাদের মধ্যে মৃত্যুর হারটা বেশি। কারণ তারা ডেঙ্গুর শক সিনড্রোম বা হেমোরেজিকের ঝুঁকি বেশি থাকে। আবার ডেঙ্গুতে জ্বর হলে সাধারণ খাওয়ার রুচি কমে যায়। প্রচুর পরিমাণে পানিসহ পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়। কিন্তু রোগীরা সেই তুলনায় খায় না। জ্বর হলে অবহেলা করে। প্রথম ২-৩ দিন জ্বর থাকে; কিন্তু পরে আর জ্বর থাকে না। তখন রোগীরা ভাবে যে ভালো হয়ে গেছে। এর ফলে অনেকেইে হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে দেরিতে যায়। ফলে রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। যেমন শরীর ফুলে যাওয়াসহ ব্লিডিং শুরু হয়। এ সময় রক্তের প্লাটিলেটও দ্রুত কমতে শুরু করে। তখন আসলে চিকিৎসকের কিছু করার থাকে না। এ ছাড়াও অনেকে কিডনিসহ নানাবিধ জটিল রোগে ভোগেন তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে এ ধরনের রোগীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মৃত্যুও ঝুঁকি বেশি থাকে। সাধারণত জ্বর থাকা অবস্থায় ডেঙ্গু রোগী মারা যায় না বা জটিলতা শুরু হয় না। আসলে বিপদ শুরু হয় জ্বর কমার চার দিন পরে। প্রথম থেকে যদি রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সঠিক নিয়মে সেবা নিত তা হলে মৃত্যুও কম হতো।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণ নতুন নতুন ভাইরাসের বিবর্তন। ফলে এডিস মশার রোগ তৈরির ক্ষমতা বেড়ে যাচ্ছে, যা গবেষণার বিষয়। 

সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সময়ের আলোকে বলেন, ডেঙ্গু একসময় শহর বা নগরের রোগ ছিল। কিন্ত এখন এটি ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তার কারণ সারা দেশেই অপরিকল্পিত নগরায়ণের ছোঁয়া। ফলে সারা বছরই এখন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তাই মশক নিধনের কার্যক্রম শুধু মৌসুমকেন্দ্রিক চালালে ফল পাওয়া যাবে না। কাজটি সারা বছরই করতে হবে। তা না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজনন উৎস ধ্বংস করার জন্য বছরব্যাপী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আবার জনগণকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায় তা নিয়ে রাষ্ট্রকেও ভাবতে হবে। কারণ সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আবার জনগণকেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিশ্চিত করবে যেন তার বাসাবাড়ির আঙিনায় ডেঙ্গু প্রজনন বিস্তার করতে না পারে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাস্তা-ঘাট, উন্মুক্ত স্থান এবং সরকারি বেসরকারি স্থাপনায় নিশ্চিত করবে যেন সেখানে এডিস মশার প্রজনন না হয়। তাই জনগণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান যুগপৎভাবে কাজ করতে হবে।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: