চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৬ হাজার ৩৫৫ জন পুরুষ ও নারী বিদেশে কর্মের উদ্দেশ্যে গেছেন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে যে গতিতে অভিবাসন ঘটেছে তা অব্যাহত থাকলে বছরের শেষে দশ লক্ষাধকি কর্মী বিদেশ যেতে পারেন। সেই হিসাবে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে (নভেম্বর র্পযন্ত) অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ কম হতে পারে বলে জানিয়েছে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)।
সংস্থাটির তথ্য মতে, চলতি বছরে স্বল্প দক্ষ শ্রমিক অভিবাসনের হার গত বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়াও প্রতারণার মাধ্যমে ভিসা বাণিজ্য করে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কর্মী পাঠানোর কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করছে রামরু।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০২৪ : অর্জন ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরু প্রতি বছরই অভিবাসন খাত বিশ্লেষণ করে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৪ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত। এ বছর ছাত্র ও সাধারণ জনগণের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি অনির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অবসান ঘটে। জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
অভিবাসনের দেশসমূহের পরিসংখ্যানে বলা হয়, বিভিন্ন সরকার ইতিপূর্বে ঢালাওভাবে প্রচার করে আসছে যে, বাংলাদেশি নারী এবং পুরুষ কর্মীরা বিশ্বের ১৬৮টি দেশে কাজ করছেন। কিন্তু বাস্তবে প্রতি বছর সিংহভাগ অভিবাসী উপসাগরীয়, অন্যান্য আরব, পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ১২ থেকে ১৩টি দেশেই অভিবাসিত হয়ে থাকেন। গত পাঁচ বছরে ৯৭ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র ১০টি দেশে। এ বছর ৯০ ভাগ বাংলাদেশি কর্মী অভিবাসিত হয়েছেন মাত্র ৬টি দেশে। এ বছরে সৌদি আরবেই গেছেন ৬০ ভাগ কর্মী (৫ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৮ জন)। মালয়েশিয়া গেছেন ১০ দশমিক ৩০ ভাগ কর্মী (৯৩ হাজার ৩৫৬ জন), কাতারে ৭ দশমিক ৫৬ ভাগ (৬৮ হাজার ৫৩০ জন), সিঙ্গাপুরে ৫ দশমিক ৭৬ ভাগ (৫২ হাজার ১৭৫ জন), ইউএইতে ৫ দশমিক ২০ ভাগ (৪৭ হাজার ১৪৩ জন) এবং জর্ডানে গেছেন ১ দশমিক ৫৪ ভাগ (১৩ হাজার ৯২০ জন)।
পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতোই এ বছরেও জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সর্বাধিক সংখ্যক নারী কর্মী সৌদি আরবে অভিবাসিত হয়েছেন (৩৫ হাজার ৫৩৮ জন)। জর্ডানে গেছেন ২ হাজার ১২৪ জন। এ ছাড়াও কাতার, যুক্তরাজ্য, ইউএই, কুয়েত, হংকং, জাপানেও নারীরা অভিবাসিত হয়েছেন। তবে হংকং, জাপান ইত্যাদি দেশে যাওয়া নারী কর্মীর সংখ্যা নগণ্য।
নারী অভিবাসন নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৫৪ হাজার ৬৯৬ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। অর্থাৎ এই সময়ের মোট অভিবাসীর ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ ছিলেন নারী কর্মী। কোভিডের সময় বাদ দিলে গত ১০ বছরে এটি নারী অভিবাসনের সর্বনিম্ন রেকর্ড। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে নভেম্বর পর্যন্ত নারীর অংশগ্রহণ ২২ শতাংশ কমেছে।
রামরুর এক গবেষণা মতে, শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তার কারণে নারী কর্মীরা ক্রমশই অভিবাসনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এ ছাড়াও ২০২৪ সালে বেশ কয়েকটি দেশে শ্রম অভিবাসন বন্ধ রয়েছে। ওমান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপসহ বেশ কয়েকটি দেশে এ বছর কোনো অভিবাসন ঘটেনি। ইতালিতে জাল কাগজপত্রের কারণে এবং সার্বিয়ার আবেদন প্রক্রিয়ার সার্ভার অকেজো হওয়ায় এই দেশগুলোতে শ্রম অভিবাসন কার্যক্রম থেমে আছে। অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে বাংলাদেশের এক গন্তব্যকেন্দ্রিক বাজার ব্যবস্থাকে বিভিন্ন বাজার বন্ধের একটি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষ-আধাদক্ষ শ্রমিক : প্রতিবেদনে দক্ষ শ্রমিকের বিষয়ে বলা হয়, বাংলাদেশ মূলত আধাদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করে। ২০২৪ সালে যারা কর্মের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন, তাদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ২৩ শতাংশ (৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৮০ জন) স্বল্পদক্ষ শ্রমিক। এ হার ২০২৩ সালে ছিল ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া অভিবাসীদের মধ্যে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ ছিলেন পেশাজীবী, ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ দক্ষ এবং ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ আধাদক্ষ শ্রমিক।
মালয়েশিয়া শ্রমবাজার বন্ধ নিয়ে প্রতিবেদন বলা হয়, ২০২১ সালে দ্বিতীয় এমওইউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের আওতায় মালয়েশিয়া শ্রমবাজার খুলেছিল তা ২০২৪-এর মে মাসে পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। বেস্টিনেট এবং এফডব্লিউসিএমএসের স্বত্বাধিকারী দাতো আমিন এবং তার বাংলাদেশি সহযোগী রুহুল আমীন যৌথভাবে যে সিন্ডিকেট তৈরি করেছিল সেটি দায়িত্বহীনভাবে উচ্চ অভিবাসন খরচ (টাকা ৫ লাখ ৫০ হাজার) নিয়ে কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে ২ ইউএস বিলিয়ন অর্থ অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করে। অথচ অভিবাসী কর্মীদের অনেকেই মালয়েশিয়া গিয়ে কাজ না পেয়ে অসহায় জীবনযাপন করে অথবা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ সরকার এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে বাংলাদেশের চারজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একই সঙ্গে মালয়শিয়া সরকারের কাছে সিন্ডিকেটের ২ হোতাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য চিঠি দিয়েছে।
রেমিট্যান্স : গত ১১ মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যা গত বছরের থেকে প্রায় ৩২ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দেখা গিয়েছে, যেসব দেশে অভিবাসন বেশি হয়েছে কিন্তু সেসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স বাড়েনি।
ডিজিটাল দুর্নীতি : প্রতিবেদন বলা হয়, অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৮ মে অভিবাসী কর্মীদের স্মার্ট কার্ড দেওয়াসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ‘আমি প্রবাসী লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ সংস্থা বিগত সরকারের আইসিটি ডিভিশন এবং ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন বাবদ ৩০০, স্মার্ট কার্ড ডাউনলোড করার জন্য ১০০, স্মার্ট কার্ড সংশোধন ফি বাবদ ২৫০ টাকা নিত। এখনও প্রাক-বহির্গমন সার্টিফিকেটের জন্য ১০০, গৃহকর্মীর ট্রেইনিংয়ের সার্টিফিকেটের জন্য ১০০, এনরোলমেন্ট কার্ডের জন্য ১০০, সাধারণ সার্টিফিকেট উত্তোলনের জন্য ১০০ টাকা নিচ্ছে। এ বাবদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত তারা কমপক্ষে ২৬২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা নিয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিবাসীদের ব্যক্তিগত তথ্য তাদের অনুমতি ছাড়াই প্রাইভেট কোম্পানির কাছে চলে গেছে।
প্রতারণার শিকার অভিবাসীদের অভিযোগ : প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতারণার শিকার অভিবাসীদের সহায়তা দিতে বিএমইটি সরেজমিন (ম্যানুয়াল) অভিযোগ নিয়ে থাকে। ২০২৪ সালে এ রকম ৪ হাজার ৯৩৪টি অভিযোগ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব অভিযোগের ৯২ দশমিক ৯১ শতাংশ পুরুষ কর্মীর এবং বাকি ৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী কর্মীর কাছ থেকে এসেছে।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, এ বছরে অভিযোগগুলোর মধ্য থেকে ১ হাজার ৬৫৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মাধ্যমে ৫ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মী এবং তাদের পরিবারকে দিয়েছে। তিনি বলেন, যেখানে একজন অভিবাসীকর্মী ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যান সেখানে কর্মীপ্রতি গড়ে ৩২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রামরুর কারিগরি সহায়তায় বিএমইটি অনলাইনেও অভিযোগ নিত। ফলে অভিযোগের সংখ্যাও থাকত অনেক। ২০১৮ সালে বিএমইটি অনলাইন অভিযোগের কাজটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে অভিযোগের সংখ্যাও কমে আসছে।
সিদ্দিকী বলেন, ২০২৪ সালে বেশ কিছু দেশে শ্রম অভিবাসন বন্ধ রয়েছে। ওমান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপসহ বেশ কয়েকটি দেশে এ বছর কোনো অভিবাসন ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, ইতালিতে জাল কাগজপত্র এবং সার্বিয়ার আবেদন প্রক্রিয়ার সার্ভার অকেজো হওয়ার কারণে এ দেশগুলোতে অভিবাসন কার্যক্রম থেমে আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে বাংলাদেশের একক গন্তব্যকেন্দ্রিক বাজারব্যবস্থাকে বিভিন্ন বাজার বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, নতুন কোনো বাজার খুললে সেখানে বাংলাদেশের এবং গন্তব্য দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ব্যাপকভাবে কর্মী পাঠানো শুরু করে। অনুষ্ঠানে রামরুর প্রোগ্রাম পরিচালক মেরিনা সুলতানাসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/আরএস/