৩৯ বছর বয়সী আমানি দ্বেইমা তার ভ্রু প্লাক করাবেন। আর ১৬ বছর বয়সী তার মেয়ে আয়ার প্রয়োজন সম্পূর্ণ মেকআপ লুক। কারণ, সন্ধ্যায় ইফতারের পর তাদের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে আয়াকে একদম পারফেক্ট লুকে দেখতে চান আমানি।
আমানি বলেন, এটি আমার ভাইয়ের মেয়ের (ভাইজি) বিয়ের অনুষ্ঠান। ভাইজিকে বরের তাঁবুতে নেওয়ার আগে পারিবারিকভাবে ছোট পরিসরে একটি আয়োজন করা হয়েছে। এটি আমাদের ঐতিহ্য।
গাজা শহরের পূর্বাঞ্চল আল-শুজাইয়ার ছোট্ট একটি তাঁবুর সামনে ঝুলছে সাদা হাতে লেখা সাইনবোর্ড— ‘নূর’স সেলুন’। নীল রংয়ের পর্দায় ঢাকা তাঁবুর ভেতরে চলছে সাজসজ্জার কাজ। এটি নূর আল-ঘামারির বিউটি পার্লার। এক তরুণীর স্বপ্নের প্রকল্প। নূর নার্সিং কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন। চুল ও মেকআপের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে বেছে নিয়েছেন এই পেশা।
নূর আল-ঘামারি তিন সপ্তাহ আগে গাজা শহরের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ফুটপাথে তার ছোট্ট এই পার্লারাটির যাত্রা শুরু করেন। ইসরায়েলই হামলায় বাস্তুচ্যুতির কঠিন বাস্তবতা পার করে, তিনি ও তার পরিবার দক্ষিণ থেকে ফিরে যখন উত্তরে পৌঁছান, তখন এটিই ছিল তার একমাত্র বিকল্প।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার নূরের এই পার্লার নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেকআপ নিতে আসা আমানি ও তার মেয়ে আয়াকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান নূর। এরপর সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাজে মনযোগী হয়ে পড়েন। হাতে একটি ছোট সুগারিং পেস্ট তুলে নেন, ধীরে ধীরে তা নরম করতে থাকেন এবং দক্ষতার সঙ্গে তা হাতে মথতে শুরু করেন।
নূর জানান, পার্লারের কাজ শুরুর প্রথম থেকেই অনেক নারীর কাছে হৃদয়ভাঙা গল্প শুনেছেন তিনি। অনেক নারী তাদের পরিবার হারানোর গল্প শুনিয়েছেন। তাদের মুখে দুঃখের ছাপ স্পষ্ট, চোখে ক্লান্তির ছাপ পড়ে থাকে। তারা আসেন শূন্য হয়ে।
আলজাজিরাকে আমানি এবং নূর বলেন, যুদ্ধের মাঝখানে বিউটি পার্লারের ধারণা অদ্ভুত মনে হতে পারে। তারা মনে করেন, নিজেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে এই মুহূর্তে এমন পার্লারের কাজ অনেক সাহায্য করতে পারে।
নূর বলেন, বিভিন্ন তাঁবু, স্কুলে স্থাপিত জনবহুল আশ্রয়স্থল এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর থেকে নারীরা আমার কাছে আসেন। আমি তাদের একটি শান্তির মুহূর্ত দেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে তাদের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়। আমার প্রধান লক্ষ্য হলো, তারা যেন এখান থেকে কিছুটা হলেও হালকা ও সুখী হয়ে বের হতে পারেন।
যুদ্ধের শুরুর দিকে আমানি দ্বেইমা দেইর আল-বালাহে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। সম্প্রতি উত্তর অঞ্চলে ফিরে এসেছেন তিনি। এখানে বিউটি পার্লারে যাওয়ার বিষয়ে একদম ভাবেননি আমানি। তবে একসময়, দেইর আল-বালাহে তিনি একটি অনুরূপ পার্লার খুঁজে পান এবং সেখানে নিয়মিত যেতে শুরু করেন।
আমানি বলেন, নিজের যত্ন নেওয়া আমার মেজাজ পরিবর্তন করে। বিশেষ করে, যখন আমি আয়নায় নিজেকে দেখি। আমি সবসময় নিজেকে উপস্থাপনযোগ্য দেখাতে চাই। আমাদের চারপাশে সমস্যা কখনও শেষ হয় না। বিউটি পার্লারে যাওয়া আমাদের সমস্যা কিছুটা হলেও দূর করে।
তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, নূরের পার্লার দেখে তিনি ‘উল্লাসিত’ হন। সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের মধ্যে এই সুখবরটি ছড়িয়ে দেন।
যুদ্ধের মাঝে সৌন্দর্য
নূর মনে করেন, গাজায় যুদ্ধ বিশেষভাবে নারীদের জন্য নিষ্ঠুর ছিল। যুদ্ধ তাদের বাড়ি, নিরাপত্তা এবং নিজেদের যত্ন নেওয়ার সক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে। কারণ, তারা বেঁচে থাকার জন্য তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে দিয়েছে।
নূর আল-ঘামারি বলেন, আমি অনেক নারী দেখেছি, সূর্যের তাপে, তাঁবুতে বসবাস, কাঠের আগুনে প্রতিনিয়ত রান্না, হাতে কাপড় ধোয়ার কারণে যাদের ত্বক সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তার উপর বাস্তুচ্যুত জনবহুকল শিবিরগুলোতে তাদের কোনো গোপনীয়তা নেই। এছাড়া, হামলার ভয়, বোমা হামলা এবং সমস্ত বিভীষিকার কথা তো বলাই হয় না।
কঠিন সময়েও নূরের কাছে সব বয়সের গ্রাহক এসেছেন, যারা মনে করেন যে, নিজেদের যত্ন নেওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অনেক নারীকে দেখেছি, যারা তাদের মুখ বা ভ্রুতে একটিও অপ্রয়োজনীয় লোম সহ্য করতে পারন না। কিছু নারী প্রতিটি সপ্তাহে আমার কাছে আসেন, আর কিছু নারী নিয়মিত বা মাঝে মাঝে আসেন।
ইসরায়েলি হামলায় মা-বাবা, ভাইবোন, পরিবারের সবাইকে হারানো এক নারীর কথা স্মরণ করে নূর বলেন, তিনি তার হারানোর বেদনায় প্রায় নির্জীব হয়ে পড়েছিলেন। নূর তার জন্য গভীর বেদনা অনুভব করছিলেন। তিনি ওই নারীকে পুরোপুরি একটি সৌন্দর্যচর্চা সেবা প্রদান করেন, যেখানে থ্রেডিং, ভ্রু শেপিং, হেয়ারকাট এবং একটি ফ্রি ফেস ম্যাসাজ ও মাস্কও দিয়েছিলেন তিনি। যখন তিনি ওই নারী তার চেহারা আয়নায় দেখেছিলেন, আনন্দে তার চেহারা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
স্বপ্ন আঁকড়ে ধরার গল্প
গাজায় ঠিক তখনই ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়েছিল যখন নূর ইট-মর্টারের বিউটি পার্লার খোলার পরিকল্পনা করছিলেন। ফলে, গাজার অন্য সবার মতো তার জীবন এবং পরিকল্পনা সম্পূর্ণ উল্টে গিয়েছিল। কারণ, তার পিতা-মাতা এবং তার আট ভাইবোনকে ইসরায়েলি প্রত্যাহার নির্দেশের পর দক্ষিণে পালাতে হয়েছিল। গাজা যুদ্ধের প্রথম দুই মাস পরিবারকে সাহায্য করাই ছিল তার একমাত্র চিন্তা।
নূর বলেন, কয়েক মাসের পর যখন তারা দক্ষিণে একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে স্থানান্তরিত হন তখন নারীরা খুব করে একটা পার্লারের প্রয়োজনবোধ করত। তারা আক্ষেপ নিয়ে বলতেন, কেমন হতো, যদি এখানে কাছাকাছি একটি হেয়ারড্রেসার বা পার্লার থাকত। তাহলে আমরা একটু হলেও নিজেদের যত্ন নিতে পারতাম।
যখন নূর নিজেকে একজন বিউটিশিয়ান হিসেবে পরিচয় দিলেন, তখন নারীরা তাকে যথা শীঘ্রই একটি বিউটি পার্লার স্থাপনের জন্য তাড়া করেন। কোনোরকম যখন তিনি তাঁবুতে তার স্বপ্নের ‘নূর’স সেলোন’ স্থাপন করলেন তিনি দেখলেন, নারীরা যেন গুপ্তধন পেয়েছে!
এখন তার কাজ যুদ্ধের মধ্যে তার পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস গড়ে তোলা। যদিও তিনি প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট জন গ্রাহকের কাছ থেকে বেশি চার্জ করতে পারেন না। তিনি কেন দাম রাখতে পারেন না এমন প্রশ্নের জবাবে নূর বলে, আমি এখানে বাস করি, আমি বাস্তবতা বুঝি।
‘যুদ্ধ আমাদের বার্ধক্য বাড়িয়েছে’
নূর যখন আমানির মুখ থ্রেডিং শেষ করেন, তখন আমনি অস্থির মনে নূরকে জিজ্ঞেস করেন, নূর তার চুল রং করতে পারবেন কি না, কিন্তু নূর তা করতে পারেন না।
নূর জানান, এই এলাকায় পানি নেই। রঙ করার জন্য চলমান পানির প্রয়োজন। তাছাড়া আমার তাঁবু রাস্তায়, ধ্বংসের মধ্যে ঘেরা– এখানে পানি, বিদ্যুৎ কিছুই নেই। আমি সাধারণ সরঞ্জাম দিয়েই কাজ করি এবং শুধুমাত্র মৌলিক সেবা প্রদান করি।
নূরের বক্তব্য শুনে আমানি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। হিজাবের নিচে সাদা চুলগুলোতে আঙুল বোলাতে বোলাতে তিনি বলেন, আগে আমার কাছে কয়েকটা সাদা চুল ছিল। কিন্তু এখন, সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। এই যুদ্ধ আমাদের বার্ধক্য বাড়িয়েছে।
পরে নূর তার মনোযোগ আয়ার দিকে সরিয়ে নেন। আয়ার পোশাকের রঙ নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন, যাতে উপযুক্ত মেকআপ নির্বাচন করা যায়।
আয়ার চোখ তখন আইশ্যাডো লাগানোর কারণে বন্ধ ছিল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে আমানি বলেন, আমার মেয়েকে নিয়ে এসেছি যাতে সে একটু নিজের যত্ন নিতে পারে। এটা তার মনোবল বাড়ানোর একটা উপায়।
তিনি বলেন, আমি চাই, সে বড় হয়ে জানুক যে, যাই হোক না কেন, তাকে সবসময় নিজের যত্ন নিতে হবে। আমি চাই, তাকে কিছুটা আনন্দ দিতে। এই যুদ্ধের সময় আমরা যা দেখেছি তা ভীষণ বিধ্বংসী ছিল।
ততক্ষণে নূর আয়ার মেকআপের কাজ শেষ করেন। তিনি তার স্বপ্নের কথা উদাসীন মনে বলতে থাকেন। নূর বলেন, আমি চাই এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক, যাতে আমি আমার ব্যবসা সম্প্রসারিত করতে পারি। একটি যথোপযুক্ত পার্লার দিতে পারি এবং আরও সেবা প্রদান করতে পারি।
সর্বশেষ তিনি নারীদের কাছে একটি বার্তা দিয়েছেন। ‘যাই হোক না কেন, নিজেদের যত্ন নেন। জীবন ছোট।’