কাশ্মিরে ঘরে ঘরে আতঙ্ক

তৌহিদুজ্জামান সোহান

আন্তর্জাতিক

কাশ্মির ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা তির তির করে বাড়ছে। সীমান্তে দুই বাহিনীর মধ্যে টানা ১০ দিন ধরে গোলাগুলি চলছে। এরইমধ্যে পাকিস্তানের

2025-05-04T03:49:56+00:00
2025-05-04T09:12:02+00:00
 
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
পহেলগামে হামলা-পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা
কাশ্মিরে ঘরে ঘরে আতঙ্ক
তৌহিদুজ্জামান সোহান
প্রকাশ: রোববার, ৪ মে, ২০২৫, ৩:৪৯ এএম  আপডেট: ০৪.০৫.২০২৫ ৯:১২ এএম  (ভিজিট : ৩০৫)
পহেলগামে হামলার পরে কাশ্মিরে ঘরে ঘরে আতঙ্ক। ছবি: সংগৃহীত
কাশ্মির ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা তির তির করে বাড়ছে। সীমান্তে দুই বাহিনীর মধ্যে টানা ১০ দিন ধরে গোলাগুলি চলছে। এরইমধ্যে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং ভারতের আমদানি নিষেধাজ্ঞা উত্তেজনার আগুনে ঢেলেছে ঘি। তবে এই উত্তেজনার মূল ভুক্তভোগী কাশ্মিরের সাধারণ মানুষ, যারা প্রতিদিন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। পেহেলগামে হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের জাঁতাকলে পিষছে নিরীহ মানুষের জীবন।

এরইমধ্যে গতকাল শনিবার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘আবদালি’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ডন। মিসাইলটি ৪৫০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এই পরীক্ষা ‘এক্স সিন্ধু’ নামক সামরিক মহড়ার অংশ ছিল, যেখানে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এই সাফল্যে সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে পরীক্ষাটি পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহতের পর চলমান সংবেদনশীল সময়ে করার কারণে তা উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।

পেহেলগামে হামলার পেছনে শুরু থেকেই পাকিস্তানকে দায়ী করছে ভারত। যদিও ইসলামাবাদ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। হামলাটি সাজানো এবং বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও বিতর্ক উঠেছে। এই ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু নদীর জল চুক্তি স্থগিত করেছে, ভিসা বাতিল করেছে এবং সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। পাকিস্তানও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছে। সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে শনিবার পাকিস্তান থেকে সব ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত। এর মাধ্যমে কার্যত দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আপাতত শেষ হয়ে গেল। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর ভারত পাকিস্তানি পণ্যের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিল। তবে এবার সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

এই উত্তেজনার সবচেয়ে বড় শিকার কাশ্মিরের সাধারণ মানুষ। নিয়ন্ত্রণরেখা-সংলগ্ন গ্রামগুলোর বাসিন্দারা প্রতিদিন গোলাগুলি ও হামলার ভয়ে বাংকারে আশ্রয় নিচ্ছেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়া নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা ফেয়ার বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে প্রতি বছর যেভাবে সামরিক উত্তেজনা চরমে ওঠে, তাতে সাধারণ মানুষের ওপর যে অসহনীয় মানসিক চাপ পড়ে, তা আন্তর্জাতিক সমাজের আরও বেশি মনোযোগ দাবি করে।’ চুরান্দা গ্রামের আবদুল আজিজের কথায়, ‘গ্রামে দেড় হাজার মানুষের জন্য মাত্র ছয়টি বাংকার আছে। দুই পক্ষই একে অপরকে হুমকি দিচ্ছে। সীমান্তে যদি উত্তেজনা বাড়ে, আমরা কোথায় যাব?’ কাশ্মির নিয়ে বহু বছর গবেষণা করা ভারতীয় সাংবাদিক মিরা বেহরাওয়ালি বলেন, ‘কাশ্মিরের শিশুরা এখন গুলির শব্দে ঘুমাতে শিখছে, আর বন্দুকের ছায়ায় বড় হচ্ছে। এটা কেবল রাজনীতির ব্যর্থতা নয়, আমাদের মানবতারও প্রশ্ন।’

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের মুজাফফরাবাদ কর্তৃপক্ষ ১০০ কোটি পাকিস্তানি রুপির জরুরি তহবিল গঠন করেছে এবং দুই মাসের খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুদ করেছে। অন্যদিকে, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের কুপওয়ারা জেলার বাসিন্দারা নিজেদের খরচে বাংকার তৈরি করছেন। পীরজাদা সৈয়দ বলেন, ‘আল্লাহ না করুন, যেন কিছু না হয়। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, যেকোনো সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।’

নিয়ন্ত্রণরেখার দুই পাশের মানুষ যুদ্ধের ভয়ে আতঙ্কিত। বন্ধ বাজার, ওষুধের অভাব, স্কুলে তালা, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা- সব মিলিয়ে এক অবরুদ্ধ জীবন। এক কাশ্মিরি মা বলছিলেন, আমার সন্তান স্কুলে যেতে পারে না, বাইরে বেরুলে যদি গুলি খায়? এই ভয়ই আজ কাশ্মিরের বাস্তবতা। তাদের জীবনে নেই নিরাপত্তা, নেই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। লিপা উপত্যকার আইনজীবী এহসান-উল-হক শামি বলেন, গোলাগুলি শুরু হলে আমরা বাংকারে আশ্রয় নিই। কিন্তু ভারী অস্ত্রের শেল সরাসরি পড়লে বাংকারও নিরাপদ নয়। তার বাড়ি ২০০২ ও ২০১৯ সালেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভারত-পাকিস্তান ইতিমধ্যে আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে এবং সীমান্তে গোলাগুলির খবর নিয়মিত আসছে। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতি শান্ত করতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে আস্থার অভাব তীব্র।

ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা কেবল রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি লক্ষাধিক মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। কাশ্মিরের মানুষ যুদ্ধের ভয়ে আতঙ্কিত, তাদের শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না, কৃষকরা জমিতে কাজ করতে ভয় পাচ্ছে। পেহেলগাম হামলার পর এই উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ভারতীয় মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক রিটা মানি বলেছেন, যুদ্ধ বা উত্তেজনার প্রথম ও প্রধান শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। কাশ্মিরের ঘরে ঘরে এখন আতঙ্ক, ক্ষুধা ও বিভ্রান্তির ছাপ- যার সমাধান কেবল সেনা দিয়ে সম্ভব নয়।



  বিষয়:   কাশ্মির ইস্যু  পহেলগাম হামলা  ভারত-পাকিস্তান  উত্তেজনা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: